করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে একযোগে আযান; ইসলাম কী বলে?

পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের মতো প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বাংলাদেশেও আক্রান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার কথা সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এ ভাইরাস থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও মহান আল্লাহ তায়া’লার নিকট দুআ, কান্নাকাটি এবং তাওবা ইস্তেগফার না করে কতিপয় মানুষ একের পর এক গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

বর্তমান মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে গুজব ছড়ানো খুবই সহজ। আজকাল ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ব্লগগুলোয় গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

কদিন আগে জনৈক ব্যক্তির স্বপ্নের প্রেক্ষিতে গভীর রাতে থানকুনি পাতা খাওয়ার গুজবের পর গতকাল বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ দিবাগত রাতে নতুন করে ছড়িয়েছে সকল মসজিদে একযোগে আযানের গুজব। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে গতরাত ১০ টায় পুরো দেশের বিভিন্ন জায়গায় একযোগে আযান দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় মহিলারাও আযান দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন জায়গায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হয়েছে “আযান দিলে এবং রং চা খেলে করোনা ভাইরাস থাকবে না। কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবে না। আরো নানান কথা…

আযান যেহেত ইসলামের একটি বিধান, তাই আযানের এ গুজবের পর মহামারির সময়ে সমষ্টিগতভাবে আযান দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে কিনা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ অনলাইন-অফলাইনে জোরদার তর্কবিতর্ক চলছে।

আযান ইসলামের বিধান। তবে এর নির্ধারিত স্থান ও হুকুম বর্ণিত রয়েছে। যেমন-
★ ফরজ নামাজের জন্য আজান দেওয়া সুন্নাত।
★ তাহাজ্জুদের জন্য আযান দেওয়াও প্রমাণিত।
★ নবজাতকের ডান কানে আযান ও বাম কানে ইক্বামত দেওয়া সুন্নাত।
★ জঙ্গলে ভয় পেলে আযান দেওয়ার কথা বর্ণিত আছে।
★ ভূত দেখলে বা পেশ হলে আযান দেওয়ার কথা বর্ণিত আছে।
★ মানুষ জ্বীন দ্বারা আক্রান্ত হলে, জ্বীনের বীভৎস রূপ পরিদৃষ্ট হলে আযান দেওয়া যায়, যাতে আযান শুনে সে পালিয়ে যায়। কেননা, মন্দ জ্বীন ও শয়তান আযান শুনলে বায়ু ছাড়তে ছাড়তে ভেগে যায়। জ্বীনের আছর বন্ধ করতে আযানের কথা বর্ণিত আছে। উল্লিখিত স্থান ছাড়া আযান দেওয়া শরীয়তে প্রমাণিত নয়।

এবার আসা যাক মূল আলোচনায়। করোনা ভাইরাস বা এ ধরনের মহামারী থেকে বাঁচতে আযান দেওয়া ইসলামি শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি আছে কিনা?
এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করলে জানা যায় যে, মহামারী ইত্যাদি থেকে বাঁচতে সমষ্টিগতভাবে আযান দেওয়া হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খোলাফায়ে রাশেদিন এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়। ইসলামি শরীয়তে এভাবে সমষ্টিগত আযানের কোনো নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না। এর কোনো ভিত্তি নেই। তাই সুন্নাত,মুস্তাহাব বা সওয়াবের কাজ মনে করে এভাবে আযান দেওয়া ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী কাজ।

মহামারির সময়ে তাওবা, ইস্তিগফার, দুআ-দরুদ পড়ার কথা হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে। মহামারির সময় সমষ্টিগত আযানের ব্যাপারে আল্লামা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. ফাতওয়ায়ে রশীদিয়ার ১ নং খন্ডের ১৪৫ নং পৃষ্ঠায় লিখেন-

طاعون وبا وغیرہ امراض کے شیوع کے وقت کوئی خاص نماز احادیث سے ثابت نہین ہے نہ اسوقت اذانیں کہنا کسی حدیث میں وارد ہواہے اس لئے اذان کو یا نماز جماعت کو ان موقعوں میں ثواب یا مسنون یا مستحب جاننا خلاف واقع ہے

অর্থঃ মহামারি ইত্যাদি রোগ ছড়িয়ে পড়লে নির্দিষ্ট কোনো নামায বা আযান দেওয়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ জন্য এসময়ে বিশেষ পদ্ধতিতে আযান বা জামা’আত সহকারে নামায পড়াকে সওয়াবের কাজ বা সুন্নাত,মুস্তাহাব মনে করা শরয়ী বাস্তবতার পরিপন্থী।

وبا کے وقت اذان دینا شرعاً
ثابت نہیں _ اس کو سنت یا مستحب سمجھنا درست نہیں _”
(احسن الفتاوی :375 /1)

অর্থঃ মহামারির সময় আযান দেওয়ার শরয়ী কোনো ভিত্তি নেই।এমন সময় আযান দেওয়াকে সুন্নত বা মুস্তাহাব মনে করা ঠিক নয়। (আহসানুল ফাতওয়া ১/৩৭৫)

অনেকের প্রশ্ন, আযান দেওয়া ভালো কাজ। করোনা ভাইরাসের এই নাজুক পরিস্থিতিতে আযান দিলে সমস্যা কোথায়? এ প্রশ্নের জবাব একেবারেই সহজ। আর তা হলো-ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। মানব জীবনে করণীয় বর্জনীয় সবই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন। মন যা চায় তা করলে সেটা ইবাদাত হবেনা। বরং একজন মুসলমানের প্রত্যেকটা কাজ হতে হবে আল্লাহ তায়া’লার হুকুম এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ত্বরীক্বা মতো। কোনো একটা কাজ ইবাদাত বা সওয়াবের হওয়ার পূর্ব শর্ত হলো- সেটা আল্লাহর হুকুম এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ মোতাবেক হতে হবে। মহামারী ইত্যাদির সময় এভাবে আযান দেওয়া রাসুলুল্লাহ সা. থেকে প্রমাণিত নয় তাই আযান ভালো কাজ হলেও এই সময়ে ইসলামের বিধান,সওয়াবের কাজ বা সুন্নাত মুস্তাহাব মনে করে তা দেওয়া যাবেনা। নামায ভালো কাজ তবে নিষিদ্ধ সময়ে কেহ নামায পড়লে সওয়াবের জায়গায় গুনাহ হবে। মহামারি ইত্যাদি আজ নতুন নয়। সাহাবায়ে কেরামের সময়েও বিভিন্ন মহামারি দেখা দিয়েছে। যদি আযান দেওয়া ইসলামের বিধান বা রাসুলুল্লাহর সুন্নাহ হতো তাহলে সাহাবায়ে কেরাম থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যেতো। কিন্তু তা পাওয়া যায়না।

★ গুজব বড় গুনাহ; এর থেকে বেঁচে থাকা উচিত:

মূলত গুজব হল, যার কোনো ভিত্তি নেই। মিথ্যা খবর অপ-প্রচার করে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মিথ্যা তো তারাই বানায় যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যাবাদী’ (সূরা নাহল, আয়াত-১০৫)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়’ (সহিহ মুসলিম)।

মিথ্যা কথা বলা,প্রচার করা বড় গুনাহ।
মিথ্যা সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ  ‘মিথ্যাবাদীদের উপর অভিসম্পাত।’ (আল-ইমরান-৬১) ‘আল্লাহ তায়ালা মিথ্যুক অপচয়ীকে সুপথ দেখান না।’ (মুমিন : ২৮) আল্লাহ তায়া’লার লা’নত বা অভিশাপের চেয়ে বড় বিষয় আর কি হতে পারে!

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহামারি থেকে বাঁচতে বেশি বেশি এই দুআ পড়তে বলেছেন, করোনা ভাইরাসের এই নাজুক পরিস্থিতিতেও আমরা এ দুআ বেশি বেশি পড়তে পারি-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ، وَالْجُنُونِ، وَالْجُذَامِ، وَمِنْ سَيِّئِ الأَسْقَامِ. (رَوَاهُ أَبو داود بإِسنادٍ صحيح)

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুযামি,ওয়া সাইয়ি ইল আসক্কাম’।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেত, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সমস্ত দুরারোগ্য ব্যাধি হতে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫৫৪)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার তাওফিক দান করুন!

লেখক- জুনাইদ আহমাদ ও মাওলানা ইন’আমুল হাসান ফারুকী।