করোনায় আমাদের বিশ্বাসের ভাঙ্গাগড়া

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক


বিশ্ব এখন করোনাময়। করোনায় কেউ না কেউ আক্রান্ত, আতঙ্কিত—না হয় উদ্ভ্রান্ত। কিন্তু কেন এমন হয়? আমরা এখন যে যুগ পার করছি, সেটা আমাদেরই ভাষায় চরম উৎকর্ষতার যুগ, বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির যুগ। প্রযুক্তি-জ্ঞান আর প্রযু্ক্তি-শক্তিতে আমাদের বিশ্বাস যেন মাটির ধার ধারছে না। অনুভূত হচ্ছে, আমাদের বিশ্বাসও যেন নতুন-পাখায় উড়তে আগ্রহী হয়ে উঠছে দিনদিন। এর-ই মাঝে করোনার নিষ্ঠুর আক্রমন আমাদেরকে এক নতুন পরিচয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। এ পরিচয় অসহায়ত্বের—এ পরিচয় উপায়হীন হয়ে অন্ধকারে ডুবে মরবার। কিন্তু কেন? বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতার যে অহংকার আমাদেরকে কল্পনার মহাকাশে নিয়ে যেতে উদগ্রীব, তা কেন আজ ডানাভাঙ্গা পাখির মতো আছড়ে পড়ছে? মনের গহীনে কি আজ সে-প্রশ্ন জাগে না? কিঞ্চিৎ বাস্তবতায় যদি হুঁশজ্ঞান নিয়ে একটু ভাবি, দেখবো: আমরা পতিত হচ্ছি খুব দ্রুত। যে আদর্শ নিয়ে আমরা বড় হয়েছি—সে নীতিজ্ঞান নিজের কাছেই যেন অস্পষ্ট ও ম্রিয়মাণ মনে হচ্ছে আজ। রোগ-বালাইয়ের ধকল সইতে না পেরে না হয় দুনিয়াজুড়ে আমাদের শরীরী দেহ গোরস্থানে স্থান পাচ্ছে কিন্তু দেহের মূল যে নির্যাস—সেই আদর্শ আর বিশ্বাস কি আমরা বাঁচাতে পারছি?

বাল্যকালে যখন ‘আলিফ-বা’তে হাত রেখেছিলাম, ‘অ-আ, ক-খ’-তে পড়া শুরু করেছিলাম, আমাদের বিশ্বাস ছিলো: সবকিছুর খালিক ও মালিক একজন আছেন—যিনি দাতা ও রক্ষাকর্তা; তিনিই আমাদেরকে রোগাক্রান্ত করেন, তিনিই আমাদেরকে নিরাময় দান করেন। জন্মলালিত সে বিশ্বাসের যাত্রা যে শুরু হয়েছিলো—তা মহান আল্লাহর অসীম কৃপায় আজও বহমান। ছোট থেকে শিখেছি, জীবনের জন্য বিশ্বাস আর আদর্শ যেন কুরবানী না হয় বরং বিশ্বাস আর আদর্শের জন্যই জীবন টিকে থাকবে। কখনও যদি প্রয়োজন পড়ে, বিশ্বাস ও আদর্শের কাছেই জীবন পরাজিত হবে, জীবনের কাছে বিশ্বাস ও আদর্শ নয়। ধীরে-ধীরে সে শিক্ষার বাতি নিভু-নিভু হয়ে উঠলো উর্ধগামী বৈজ্ঞানিক তর্কবিতর্কের ডামাডোলে। ক্রমেই আমরা বস্তুবাদী হয়ে উঠলাম, দৃশ্যবাদ আমাদের মূল-সংবিধান হয়ে উঠলো। অদৃশ্য বা গায়েবকে বিশ্বাস করার যে গভীরতা আমরা প্রজন্মান্তরে আত্মস্থ করে এসেছি, তা কিন্তু হারাতে বসেছে কথিত ধর্মনিরপেক্ষ (মূলত নাস্তিক্যবাদী) লালনদের “চর্মচক্ষে দেখিনি যারে কেমনে ভজিব তারে”—জাতীয় আচারের বিশ্বাসভারে। অর্থাৎ, লালনের কথায়, যিনি অদৃশ্য—তাকে পুজবো কেমন করে? সেদিন যদি মু’মিনদের পক্ষে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ক্ষুরধার কলম নিয়ে লালনের ভ্রান্তির শিরোশ্ছেদ না করতেন, তবে কি যে হতো আল্লাহই জানেন। আজও মনে হয়, কিয়ামাতের কঠিন দিনে যদি মহান রব্বুল আলামীন নজরুলকে নাজাত দেন—সে হতে পারে আল্লাহর সত্ত্বার অস্তিত্ব প্রমাণে তাঁর সেই দু’লাইনের বিস্ময়কর জবাবের ওয়াসীলা। নজরুল লালনকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন—“অন্ধবধূ কি বুঝিতে পারে স্বামীর সোহাগ তার?/দেখিবে আবার ঘুচিলে তাহার আঁখির অন্ধকার।” নজরুল বলেছিলেন: লালন, আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিন; চক্ষুবিহীন বধূ কি বিনা দর্শনে তার স্বামীর সোহাগ বুঝতে সক্ষম? যদি সক্ষম হয়, তবে বান্দা কি তার সৃষ্টিকর্তাকে না দেখেই তাঁর অস্তিত্ব ও মমতাকে স্বীকার করবে না? দেখে নিও, এ পৃথিবীর পরে পরকাল যখন আসবে, সবাই যখন তাদের ওপারের দৃষ্টি ফিরে পাবে, অবশ্যই তাদের অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তাকে দেখতে পাবে। এই হলো কুরআন-বর্ণিত ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস গায়েবের প্রতি নিশর্ত আত্মসমর্পণের দৃষ্টান্ত। ইসলামে এ বিশ্বাসের স্তর অসীমে বিস্তৃত। একজন মু’মিন জীবনের সকল স্তরে উক্ত বিশ্বাসে দায়বদ্ধ।

একবার এক নাস্তিকের সাথে দেথা হলো ইমাম আযম আবূ হানিফা রহ.-র সাথে। নাস্তিকটি ইমাম আযম রহ.কে বললেন, এ পৃথিবীর যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, সেটা কী করে বুঝবো? ইমাম আযম রহ. বললেন: তুমি কি কখনও সমুদ্রে সফর করেছো? নাস্তিক বললো, হ্যা, করেছি। ইমাম আযম রহ. তাকে তার সফর-বৃত্তান্ত বলতে বললেন। নাস্তিক এবার বলতে লাগলো: একবার আমি এক সমুদ্র-সফরে ছিলাম। মাঝপথে আমাদের জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে ভেঙ্গে যায়। এ সময় আমি জাহাজের একটি ভাঙ্গা তক্তা ধরে ভেসেছিলাম। পরে বেঁচে যাই। ইমাম আযম ইমাম আবূ হানিফা রহ. তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা বলো তো! যখন তুমি নির্জন গভীর সাগরের বুকে ভাসছিলে তখন কি তোমার অন্তরে এমন ধারণার জন্মেছিলো যে, কোন অদৃশ্য-শক্তি তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে? নাস্তিক সাথেসাথে জবাব দিলো, অবশ্যই! সেদিন আমার অন্তরে এমন ধারণা বারবার উদিত হয়েছিলো। এবার ইমাম আযম আবূ হানিফা রহ. বললেন, যে গায়েবী বা অদৃশ্য-শক্তির কথা তুমি বললে; যে শক্তি তোমাকে সেদিন সমুদ্রে ভাসিয়ে রেখেছিলো বলে তোমার অন্তর তোমাকে বারবার বোঝাচ্ছিলো—সেটাই মূলত সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব যা তুমি বেঁচে যাবার পর অস্বীকার করছো। ঘটনাটি আমি শুনেছি, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলিমে দ্বীন মাওলানা ইহতিশামুল হক থানভী রহ.-র বাণীবদ্ধ বয়ান থেকে । এখানে দু’টো বিষয় বিচার্য: এক, প্রকাশ্যে আল্লাহর অস্তিত্বে অস্বীকার এবং দুই, অসহায় অবস্থায় আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার। মানুষ যখন সহায়হীন হয়ে পড়ে; কেউ তাকে সাহায্য করার থাকে না তখন অন্যসময় যতো যুক্তিই সে প্রদর্শন করুক, তার অন্তর ঠিক-ই আল্লাহর অস্তিত্বের দিকে তাকে নিয়ে যায়। কারণ, মানুষের সাধারণ জ্ঞান যাকে আরবীতে ‘আকল’ বলে অভিহিত করা হয়—তা কোন সময়ে গুনাহর ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পথভ্রষ্ট হতে পারে; ভুল বার্তা দিতে পারে কিন্তু অন্তর বা ‘কলব’ কখনও পথভ্রষ্ট হয় না; ঠিক-ই সে সঠিক সময়ে সঠিক পথনির্দেশনা দিয়ে যায় যদিও মানুষ সেটা মুখে স্বীকার করে না। খুব সম্ভবত বছর খানিক অগে হবে, খবরে এসেছিলো: একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট মাঝপথে বিপদের সম্মুখীন হলে অমুসলিম যাত্রীরাও ‘আল্লাহ!..আল্লাহ!’ বলে সজোরে চিৎকার করে ওঠে। কে তাদেরকে ‘আল্লাহ!’ শব্দ উচ্চারণ করালো? এ প্রশ্নের উত্তর কি খুঁজতে ইচ্ছে করে না? কিন্তু চরম বিপদ আর অসহায় অবস্থায়ও যে-সব বদনসীব আল্লাহর কথা মুখে নেয় না—তাদের বিচার কী হবে?

এবার আসুন, করোনাক্রান্ত বাংলাদেশের কথা বলি। আওয়ামী লীগ নাস্তিক্যবাদী বাম দলগুলোকে নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটাকে ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলারাইজ করতে উঠেপড়ে লাগে। সংবিধান থেকে উৎসব করে সরানো হয়, ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’—এ দুই পবিত্র-বাক্যকে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের গায়েবের প্রতি বিশ্বাসের প্রতিফলন হিসাবে অস্তিত্বশীল। দেশকে সেক্যুলারাইজ করতে গিয়ে তারা শিক্ষাব্যবস্থাসমেত সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও বে-দ্বীন বা ধর্মহীন শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রবর্তনে লিপ্ত হয়। ফলে, সাধারণ-শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীদের মননে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি হয়। বিভক্তি দানা বেঁধে উঠে জাতির গভীরে। প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হলো, কুখ্যাত শাহবাগীগোষ্ঠী আর শাপলার চেতনাবাহী সৈনিকের দল। আজও সে লড়াই চলছে জাতির স্তরে-স্তরে। এ লড়াইয়ের এক চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে সম্প্রতি হানাদার করোনার কল্যাণে। আমার মনে হয়, করোনা কিন্তু সবদিক দিয়ে নেতিবাচক নয়, ক্ষেত্রবিশেষে ইতিবাচকও বটে। শারীরিকভাবে হয়তো করোনা আমাদের ক্ষতির কারণ কিন্তু আত্মিক ও আদর্শিকভাবে আমাদের সহজাত চিন্তার জগতটাকে নেড়েচেড়ে সঠিক অবস্থানে স্থিতিশীল করে দিচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, বন্যায় মানুষের ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-ফসল নষ্ট হয় বটে, কিন্তু জমিতে যে উর্বর পলিমাটির আস্তরণ দিয়ে যায়, তা পরের মৌসুমে দ্বিগুণ ফসল নিশ্চিত করে। যাক, সে কথায় একটু পরে আসছি। আজকের লেখার শিরোনাম করেছি বিশ্বাসের ভাঙ্গাগড়া নিয়ে। আগে ভাঙ্গারটা বলি, তারপর গড়ারটা বলবো।

এ বছরের জানুয়ারীর শুরুর দিকে করোনা হাঁটতে শুরু করে গণচীনের উহান রাজ্য থেকে। জানুয়ারীর ১৩ তারিখে করোনা চীনের মাটি থেকে হানা দেয় থাইল্যান্ডে; ১৬ তারিখ হাত দেয় জাপানের দিকে। চীনে বসে ধ্বংসলীলা চালাতে-চালাতে করোনা ফেব্রুয়ারী মাসের ১ তারিখ দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, আরব আমিরাত—এসব দেশের দিকে। ফেব্রুয়ারীর ১৪ তারিখ করোনা পা রাখলো আফ্রিকার দেশ মিসরে; ১৯ তারিখে গেলো ইরানে; ২০ তারিখ গেলো দক্ষিণ কোরিয়ায়; ২১ তারিখ ইতালি ও ইসরাঈলে, মার্চের ২ তারিখ সৌদি আরবে—এভাবে করতে-করতে করোনা গত মার্চের দ্বিতীয় সপ্তায় পা রাখলো আমাদের সোনার বাংলায়। ফিরিস্তিটা এজন্য দিলাম যেন বিস্তারের একটা ধারণাচিত্র মাথায় থাকে। জানুয়ারীর গোড়া থেকে শুরু হওয়া করোনার এ আক্রমন বাংলাদেশে ঢুকেছে মার্চের শুরুর দিকে। এখন প্রশ্ন হলো, জানুয়ারী থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যখন ভাইরাসটি বাইরের দুনিয়ায় তাণ্ডব চালাচ্ছিলো—এ দু’মাস বাংলাদেশ সরকার কী করছিলো? এতো খতিয়ান দেয়া তো সম্ভব নয়, তবে দু’একটি চিত্র তুলে ধরছি। সংবাদ মাধ্যমের দিকে তাকালে পাচ্ছি, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে চীনে প্রথম করোনা ভাইরাস দেখা দেয়। সে-সময় ৫৬টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৮৭ হাজার মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিদের বেশির ভাগ চীনের নাগরিক। গত ৬ মার্চ প্রথম আলো “করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সতর্ক থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের” শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করে। তাতে নিউইয়র্কে প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশী চিকিৎসকের সংবাদ-সম্মেলনের বরাতে বলা হয়: সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ মুহূর্তে ভাইরাসটির মাধ্যমে দেখা দেওয়া স্বাস্থ্যঝুঁকি গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা এরই মধ্যে এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। যেহেতু ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে খুব সহজে ছড়ায় এবং এর কোনো প্রতিষেধক এখনও নেই, তাই সতর্ক হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ভাইরাসটি এরই মধ্যে আমেরিকাসহ মোট ৬০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আরও ভয়ের কারণ নিউইয়র্কে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশ্বের রাজধানী খ্যাত নিউইয়র্কসহ আমেরিকার মোট দশটি অঙ্গরাজ্যে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন ডা. ফেরদৌস খন্দকার। ৮ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন,—“ করোনা মোকাবিলার সক্ষমতা আছে, উদ্বেগের কিছু নেই।” আশা করি, পাঠক এবার বুঝতে পারছেন। সংবাদ-মাধ্যমের খবর অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, চীনে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তির সময় জানুয়ারীর গোড়া থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত পুরো দু’মাস সরকারের মূল এজেন্ডা ছিলো দু’টো: এক, মুজিব বর্ষ পালন ও দুই, মুদির সফর। এ সময় মন্ত্রী-পাতিমন্ত্রীদের কণ্ঠে “শেখ হাসিনার মতো নেত্রী থাকতে করোনা নিয়ে ভয় নেই”, “আওয়ামী লীগ করোনার চেয়েও শক্তিশালী” ইত্যকার কথাবার্তাও শোনা যায়। অবশেষে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ক’দিন আগে বলে বসলেন: করোনা মোকাবিলা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কেন? সংবিধানে ঠেসে রাখা তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতা আর ন্যাকা সেক্যুলাদের হাজার বছরের বাঙ্গালি সংস্কৃতি কি আজ আর কোন কাজে আসলো না? যা মানুষের প্রয়োজনে কাজে লাগে না, তা নিয়ে এতো হৈ-হল্লা না করে ফেলে দিলেই তো হয়। তাই না? হায় খোদা! কী আজব খেলা তোমার। যারা জাতীয় সংসদে বসে সেক্যুলার বাংলাদেশ গড়তে তোমার উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের কথা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো—তাদের তুমি সেই সংসদেই কী আজব শাস্তি দিলে! গত ১৮ই এপ্রিল, শনিবার জাতীয় সংসদে করোনা চলাকালীন এক সংক্ষিপ্ত অধিবেশন বসে। সেখানে ডেপুটি স্পীকার জনাব ফজলে রাব্বী মিয়ার পরিচালনায় সম্মিলিত মুনাজাত ও তাওবা পরিচালনা করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। সংবাদ-মাধ্যমের ভাষ্যানুসারে সেখানে বলা হয়,–“মোনাজাত পরিচালনা করেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তুমি বলেছ, বান্দাদের তুমি হাওস করে পয়দা করেছো। ব্যক্তিগত কোনো কারণে কিংবা আমাদের কোনো পাপের কারণে বাংলাদেশের ওপর করোনা নামে গজব দিয়েছ। আজকে আমরা তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করছি, কমপ্লিট সারেন্ডার করে তোমার কাছে তওবা পড়ছি। আল্লাহ তুমি বলেছ, আমি বান্দা সৃষ্টি করেছি তাদের দোয়া কবুল করার জন্য। আমরা তোমার কাছে দোয়া করছি, ফরিয়াদ জানাচ্ছি। আমরা তোমার কাছে তওবা করছি। আল্লাহ আমাদের তুমি মাফ করে দাও। সাথে সাথে তুমি বাংলাদেশের ওপর যে গজব নাযিল করেছ সেই গজবকে তুমি তুলে নাও। সারা বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছে । বিশ্ববাসীকে তুমি হেফাজত কর। বাংলাদেশের ওপর তুমি তোমার খাস রহমত বরকত নাযিল কর।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘তোমার হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। করোনাভাইরাস নামে যে আজাব-গজব দিয়েছ তার হাত থেকে তুমি আমাদের রক্ষা কর। সারা বিশ্বকে রক্ষা কর। ওই আবাবিল পাখির মুখে একটা ছোট্ট কংকর দিয়ে তুমি কাবাঘর রক্ষা করেছিলে। আমাদের মতো ধর্মপ্রাণ মুসলমান পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে কম আছে। এই ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দোয়া তুমি কবুল কর।”(জাগো নিউজ ২৪ ডট কম, ১৯.০৪.২০) আসলে উপরের তথ্যগুলো বাহ্যত অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও এ জন্য তুলে ধরলাম যে, দেশে কোন পরিস্থিতিতে কী ঘটছিলো, তা যেন স্পষ্ট হয়।

বলেছিলাম, বিশ্বাসের ভাঙ্গনের পর্বের কথা। শাসকদলের সাংবিধানিক বিশ্বাস যেদিন আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের পরিবর্তে বে-দ্বীন ধর্মনিরপেক্ষতাতে প্রযুক্ত হয়, সেদিনই বিশ্বাস-ভাঙ্গনের সাংবিধানিক পর্ব শুরু। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তদের ফাঁদে পড়ে শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল সংবিধানকে জঞ্জালমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে যেভাবে পবিত্র-কালাম: ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ বাদ দিয়ে সংসদে উল্লাস প্রকাশ করেন, তা আমাদের মর্যাদাসম্পন্ন ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। গরু একটি পাঁচপদী প্রাণী—লিখে দিলেই গরুর পা পাঁচটি হয়ে যায় না। তেমনি ষোল কোটি মুসলমানের নামে ‘সেক্যুলার’ লিখে দিলেই আমরা সেক্যুলার হয়ে যাবো না, যেতে পারি না। ২০১৭ সালের ১১ই মার্চ তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের আখড়া প্রাঙ্গণে গৌরপূর্ণিমা তিথি ও দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ধর্মীয় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলে বসলেন: বাংলাদেশ এখন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ষোল কোটি মুসলমানের দেশে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলার সাজা কী হয়েছিলো, তা এখন আর কারও অজানা নয়। আমাদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ বানাতে রাষ্ট্র সকল শক্তি প্রয়োগ করেছে; হিন্দু-সংস্কৃতির আদলে তথাকথিত মঙ্গল-সংস্কৃতি পালনে ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য করানো হয়েছে—তারপরও মানুষকে সেক্যুলার করা যায়নি। এখানেই আমাদের স্বতন্ত্রতা রক্ষার গৌরব আর সেক্যুলারচক্র ও কথিত বাঙ্গালি সংস্কৃতির কলঙ্কিত পরাজয় নিহিত। এর সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ, সম্প্রতি করোনার কারণে দেশের মসজিদগুলোতে মুসল্লী নিয়ন্ত্রণের যে সরকারি সিদ্ধান্ত দেয়া হয়, তা উপেক্ষা করে যুবক-পৌঢ়-বৃদ্ধ সকলে মহান আল্লাহর দরবারে নিজেদের বিশ্বাসের জানান দিতে কাতারে-কাতারে হাযির হন। যারা যেতে পারেননি, তাঁরা বাড়িতে-গৃহে-ছাদে যেখানে পেরেছেন নামায পড়ে আল্লাহর প্রতি নিজেদেরকে সমর্পণ করেছেন। কই, তাঁরা তো কেউই কথিত বাঙ্গালি বা সেক্যুলার সংস্কৃতি পালনে মঙ্গলযাত্রায় যাননি। এটাই আমাদের বিশ্বাসের গড়ন আর অভেদ্য সৌধ। এই সৌধের প্রভাবে আজ কথিত সেক্যুলার সংসদে মহান আল্লাহর কাছে তাওবা ও মুনাজাত ধ্বনিত হলো; সংবিধান থেকে বাদ গেলেও জাতীয় সংসদ হয়ে রইল আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাম্প্রতিক এক নযীর। বাংলাদেশ লালনদের সেক্যুলার ও নাস্তিক্যবাদী বিশ্বাসকে ছুঁড়ে ফেলে ফিরে এলো কবি নজরুলের একত্ববাদী বিশ্বাসের জায়গায়। এ জন্য অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীসহ অংশ গ্রহণকারীদেরকে মুবারকবাদ জানাই। আল্লাহ তাঁদের সবাইকে ভুলপথ ছেড়ে সত্যপথে ফিরে আসার তাওফিক দিন।

না বলতে চেয়েও বাস্তবতা বোঝাতে বলতে হচ্ছে, করোনার শুরুর দিন থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সরকার ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ এক অবস্থানে। মন্ত্রী মহোদয়গণ পর্যন্ত আল্লাহ-খোদার নামটিও মুখে আনেননি। কেউ বলেননি, আসুন আমরা আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে তাওবা করি। সরকার তখন মুজিব-বর্ষ আর গুজরাটের কসাই খ্যাত নরেন্দ্র মুদির সম্ভাব্য মেহমানদারি নিয়ে রণক্লান্ত। অবশেষে করোনা যখন বাংলাদেশের দরোজায় কড়া নাড়বার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, সরকারের মতি যেন ফিরে এলো। ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সরকারের হম্বিতম্বি ভেদ করে মানুষ বুঝে গেলো, কোন প্রস্তুতিই নেয়া হয়নি। সে-সময় যদি সরকার বর্ষ পালন আর মুদি নিয়ে বিভোর না হয়ে জাতির সম্ভাব্য বিপদ-চিন্তায় বিভোর হতো, তবে চিত্র ভিন্ন হতে পারতো। আল্লাহর নির্দেশিত আসমানী নির্দেশনা বাদ দিয়ে কেবল মানব-রচিত বিজ্ঞাননির্ভরতা আমাদেরকে স্বস্তি দিতে পারেনি। বিজ্ঞানকে অস্বীকার নয় বরং আল্লাহর কালামের অধীন থেকে যে বিজ্ঞান আমাদেরকে পথ দেখাবে—সে বিজ্ঞান আমাদের অলংকার। যা হোক, শেষ পর্যন্ত সরকারের বোধোদয় হলো বলে আমাদের শেষ মুহূর্তের স্বস্তি।

আজ আমার করুণা হয় সে-সব কথিত সুশীল ও সেক্যূলার বুদ্ধিজীবিমহলের জন্য, যারা সুযোগকে সদ্ব্যবহার করে ক্ষণেক্ষণে সরকারকে মৌলবাদ ও ইসলামপন্থীদের আন্দোলন দমনে দেশে সেক্যুলার সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর ‍উস্কানি দিয়েছেন—আজ তারা কোথায়? জাতীয় সংসদের তাওবা ও মুনাজাত অনুষ্ঠান কি তাদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে? কেন তারা আজ সংসদে মৌলবাদী কাণ্ডের নিন্দা করে বিবৃতি প্রসব করছেন না? কারণ, তারাই তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মদীনার সনদ নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিলেন। মনে আছে সে-কথা? তবুও তাদের জন্য দোয়া করতে ভুলবো না, জীবন-সায়াহ্নে হলেও তারা শিক্ষাবিদ মরহুম আবুল ফজলের মতো তাওবা করে মূলধারায় ফিরে আসবেন, আল্লাহ তাদেরকে ইসলামেরই ছায়াতলে কবূল করে নেবেন।

পরিশেষে বলবো, করোনা মানুষকে আক্রান্ত করেছে, মরণছোবলে ছিনিয়ে নিয়েছে কিন্তু বিশ্বাসের যে পলি মাটি পরতে-পরতে বিছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, তাতে ইসলামের শাশ্বত-বিশ্বাসের প্রতি; মহান আল্লাহর সর্বশক্তিমান সত্ত্বার প্রতি যে আত্মসমর্পণের আবেগ তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছে—তা সেক্যূলার ও নাস্তক্যবাদী বিশ্বাসের মনগড়া সৌধ ধংস করে তাওহীদবাদী কেন্দ্র পানে মানবজাতিকে মুক্তির নির্দেশনার এক বিস্ময়কর অভিযাত্রা। এভাবেই যুগেযুগে, কাল থেকে কালান্তরে ইসলাম আর তার বিশ্বাসের অগ্রযাত্রা সকল বাধা ছিন্ন করে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশে সেক্যুলার মানস বারবার পরাজিত হবে, জয়ের আসনে আসীন থাকবে ‍শুধু ইসলাম।