করোনা ভাইরাস ও খালেদা জিয়ার মুক্তি

আসাদ পারভেজ


পুরো বিশ্ব আজ করোনাভাইরাসের (COVID- 19) আতঙ্কে স্তব্ধ। এর ভয়াবহতার মুখে পড়ে মানুষ নিজ গৃহে বন্দি জীবনে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে, কোলাহল ছেড়ে জঙ্গলে কেউবা বাঙ্কারে বসতি গড়েছে। এইদিকে বাংলাদেশের মহতি সরকার ২বছর ১ মাস ১৭দিনের মাথায় বেগম জিয়াকে মুক্ত বাতাসে বিচরন করার পথ সুগম করে দিয়েছে। এতোদিন সবকিছু আদালতের এখতিয়ারে থাকার কথা বলা হলেও, আজ সরকারের বিশেষ উদ্যোগে যে বেগম জিয়ার মুক্তির ব্যবস্থা হয়েছে, তা নূন্যতম বিবেক-বুদ্ধি রয়েছে এমন সকলেই অনুভব করেন।

২০১৯ সালের নভেম্বরে মহাচীনের উহান প্রদেশে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে, যার প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে বছরের শেষ দিনে। তাই এর নামকরণ করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)।

ধারণা করা হয়, ভাইরাসটি প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। যার প্রাথমিক রূপ ছিল সার্স- করোনা, যা ৩৮৪ বার রুপান্তরিত হয়ে নভেল করোনা কোভিড- ১৯ রূপে নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে। মনুষ্যসভ্যতার আধুনিক বিকাশে চরম বিপর্যয় বয়ে আনা ছোঁয়াছে করোনাভাইরাস চীনের সাম্রাজ্য ভেদ করে শতাধিক রাষ্ট্রে ব্যাপক আঘাতের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চোখ খুলে। রোগটি ধরা পড়ার ২ মাস ১০ দিন পর ২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তারা এর নামকরণ করে কোভিড- ১৯ এবং এক মাস পরে মার্চের ১১ তারিখে একে মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেয়। স্বাস্থ্য সেবার মোড়ল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রমে এমন বেহাল অবস্থা হলে, বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম আর কেমনইবা হবে?

অতীতে অনেক ছোঁয়াছে রোগ পৃথিবীর অস্থিরতা বাড়িয়েছে, তবে কোভিড- ১৯ অপেক্ষাকৃত ভয়ানক ছোঁয়াছে ও অতিদ্রুত মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, একজন মানুষ সংক্রমিত না হয়েও ভাইরাসটি অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। মনে খটকা লাগছে, এ আবার কেমন কথা? বিষয়টি বোঝার জন্য বলছি, ধরুণ বিদেশ ফেরত একজন আক্রান্ত মানুষের সাথে জনৈক হিমুর হ্যান্ড শেক হলো। তারপরে হিমু আপনার সাথে হ্যান্ড শেক করলেন। অতপর আপনি নিজ হাত দিয়ে নাক, চোখ ও মুখ স্পর্শ করলেন আর হিমু পরবর্তী সময়ে হাত ধূয়ে নিল। তাতেই সর্বনাশ যা হবার হলো, আপনার দেহে কোভিড- ১৯ প্রবেশ করার ভয়ানক ঝুঁকি তৈরি হল।

করোনাভাইরাসের অনেক প্রজাতি আছে, কিন্তু এর আগে ছয় প্রজাতির ভাইরাস মানব দেহে সংক্রমিত হতো বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল। ২০০২ সালে চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স নামক ভাইরাসটি একধরনের করোনাভাইরাস। এবারের নতুন ভাইরাসে মানুষ সংক্রমিত হবার পর থেকে এর সংখ্যা দাঁড়ালো সাত-এ। নতুন এই ভাইরাসের মূল নাম হলো কোভিড- ২০১৯ (এনসিওভি) বা নভেল করোনাভাইরাস।

চীন বলছে, রোগটির বিস্তার মার্কিনরা করেছে তাদের দেশে আর মার্কিনরা বলছে এটি চায়নাভাইরাস। তবে সন্দেহ থেকেই যায়, এটি কি প্রাণী থেকে সৃষ্ট নাকি কোনো দেশের অপকর্মের ফসল। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে, ১৪৯২ সালে কলম্বাস মার্কিন মুল্লুক থেকে স্পেনে যৌন ছোঁয়াছে রোগ সিফিলিস, ফ্রান্সের সম্রাট অষ্টম চার্লস ১৪৯৫ সালে ইতালি থেকে রেঁনেসা জীবাণু ফ্রান্সে, ভাস্কো দা গামা ১৪৯৭ সালে ভারতে নিয়ে আসে একই সিফিলিস। এছাড়া নীতিহীন মার্কিনরা বিংশ্ব শতাব্দির ৬০’এর দশকে কলেরা জীবাণুর মাধ্যমে জীবাণু যুদ্ধের বিস্তারের জন্য ব্যাপক গবেষণা করেছিল ঢাকার মহাখালীর সিয়েটা কলেরা ল্যাবরেটরিতে (আইসিডিডিআরবি)। এই শতাব্দির প্রথম দশক থেকে সার্স- করোনাভাইরাস বিষয়ে গবেষণা চলছিল মার্কিন ও চীনের উহানের গবেষণাগারে। জনশ্রুতি আছে, জীবাণু যুদ্ধে ভাইরাস ব্যবহার করে যুদ্ধ জয়ের নেশায় এর উপযোগিতা দ্রুত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করা ছিল উভয়ের মূল লক্ষ্য। তাই এখনই বলা যাচ্ছে না, মূল সমস্যা কোথায় লুকায়িত।

রেসপিরেটরি (শ্বাসযন্ত্রের) লক্ষণ বাদেও সাধারণত জ্বর ও শুকনো কাশির মাধ্যমে প্রথমে রোগটির উপসর্গ মানবদেহে দেখা দেয় এবং পরে শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যার মাধ্যমে ফুসফুসে আক্রমণ করে এটি বিপদের চরম পরিণতির জানান দেয়। গবেষকদের ধারণা ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ২৪দিন পর্যন্ত স্থায়িত্ব হতে পারে, তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে তা ১৪দিন।

বিপদের এমন দিনে আপনার কিংবা সরকারের করণীয়- জাতিকে রাজনৈতিকভাবে কিংবা ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত না করে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। জনগণের নব্বই শতাংশের অধিক মুসলমান হওয়াতে আলেম-ওলামায়ে কেরাম এসময়ে সবচাইতে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন। নানা ফেকরায় বিভক্ত হওয়ার পরও এখনি সময় ওলামায়ে কেরাম মিলিতভাবে কাজ করার। মনে রাখতে হবে, আমাদের মূল পরিচয় আমরা মুসলমান।

হাজারো সমস্যা থাকার পরও পুরোজাতিকে কোয়ারেন্টিনের অধীনে নিয়ে আসার সংগ্রামে নামতে হবে, আপনি নিজেকে কোয়ারেন্টিনের আওতায় নিলে অপরজন উৎসাহিত হবেন। কোয়ারেন্টিন হলো, সুস্থ বা আপাত সুস্থ ব্যক্তিদের আলাদা হয়ে ১৪দিন জীবন-যাপন করা। এমতাবস্তায় কারো মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে তাকে আইসোলেশনে নিয়ে যেতে হবে। আইসোলেশন মানে, কারো মধ্যে যখন জীবাণুর উপস্থিতি ধরা পড়বে বা ধরা না পড়লেও তার মধ্যে উপসর্গ থাকাতে, তাকে আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পদ্ধতি।

কোয়ারেন্টিন নিজ নিজ বাড়িতে কিংবা সরকারের নিয়ন্ত্রণে করা যায়। তবে নিয়ন্ত্রিত কোয়ারেন্টিন একটি দেশের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, যা আমাদের মতো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রথম দিকে সরকার আশকোনার হজ ক্যাম্পে নিয়ন্ত্রিত কোয়ারেন্টিন করতে গিয়ে তা গণ কোয়ারেন্টিন করে ফেলে, যা আরও বেশি বিপদ ডেকে আনে। এক্ষেত্রে জাপানের উপকূলে থাকা ডায়মন্ড প্রিন্সেস নামে একটি প্রমোদ জাহাজের কথা বলা যায়। জাহাজটিতে সবাই শুরুতে আক্রান্ত না হলেও গণ কোয়ারেন্টিনে রাখার কারণে পরে সবাই আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

কিভাবে নিজেকে করোনাভাইরাস থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করব— গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র, জনসমাগমস্থল, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও লিফট ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। করমর্দন ও কোলাকোলি পরিহার করে মুখে সালাম বিনিময় করতে হবে। পয়ঃনিষ্কাশনের পর এবং খাবারের আগে ও পরে সাবান বা অ্যালকোহল জাতীয় কিছু দিয়ে হাত ভালোভাবে ধূয়ে নিতে হবে, খেয়াল রাখতে হবে আঙুলের খাঁজ যেন পরিষ্কার থাকে, এরপর হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। হাত দিয়ে অহেতুক মুখমন্ডল চুলকানো যাবে না। একান্ত প্রয়োজন হলে হাত পরিষ্কার করে তারপর চোখে, মুখে ও নাকে হাত দিতে হবে। মুখমন্ডলে টিস্যু একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হবে। অন্যের মুখনিসৃত জলীয় পদার্থ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।
দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সুষম খাবার খেতে হবে। ধুমপান ও মদ্যপান পরিহার করতে হবে। খাবার ভালোভাবে সিদ্ধ করে এবং ডিম পোচ করে না খেয়ে ভালোভাবে ভাজি করে খেতে হবে। যেখানে সেখানে হাঁচি-কাশি না দেওয়া ও কফ-থুতু না ফেলা। হাঁসি-কাশি যাদের তারা মাস্ক ব্যবহার করবে এবং হাঁসি-কাশির সময় টিস্যু ব্যবহার করবে। অসুস্থ হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে সুস্থরা ১ মিটার বা ৩ ফুট দূরে থাকতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে আসার পর ভালোভাবে পরিষ্কার হতে হবে। মাস্ক ব্যবহারকারীরা খেয়াল রাখবে, তা খোলার সময় যেন মাস্কে হাত না লাগে এবং তা খুলতে হবে পেছন দিক থেকে।

মনে রাখতে হবে, সুস্থ কোনো মানুষের মাস্ক ব্যবহার করার প্রয়োজন নাই। কেননা, এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না, বরং তা হাঁচি-কাশি ও জীবাণুযুক্ত হাতের স্পর্শে বেশি ছড়ায়। তাই গণহারে রাস্তাঘাটে মাস্ক পরে চলাফেরার কোনো দরকার নাই। তবে মাস্ক তাদের জন্য পরা আবশ্যক, যারা মেডিকেল কর্মী এবং কোভিড- ১৯-এ আক্রান্ত এবং এমন রোগিদের কাছাকাছি যদি কেউ থাকে কিংবা ফ্লুর মতো কোনো লক্ষণ দেখা দেয়। মাস্ক একবার ব্যবহার করে ঢাকনাসহ ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে।

এখন পর্যন্ত (২৬ মার্চ- ২০) ভাইরাসটি ১৯৫টি দেশের জনগণকে ব্যাতিব্যস্ত করে, যেখানে ৫ লক্ষ ১০হাজার জনের বেশি মানুষের দেহে জীবাণু প্রবেশ ঘটিয়ে প্রায় ২২ হাজার জনের জীবন প্রদীপ নিবিয়ে দিয়েছে। আইইডিসিআর-এর মতে, এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মাত্র ৪৪জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ৫জন মারাও গেছে। ইতালি ফেরত এক নারীর বাবার মৃত্যু হয়েছে, যে আবার বিদেশে চলেও গেছেন।

দেখা যাচ্ছে, রোগটির উৎপত্তিরস্থল চায়না ভাইরাসটিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও গোটা ইউরোপ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বর্তমানে (২৫.০৩.২০) চীনে ৮১,৪৯৬জন আক্রান্তের বিপরীতে মৃতের সংখ্যা ৩,২৭৬জন, অপরদিকে ইতালিতে ৫৯,১৩৮জন আক্রান্তের বিপরীতে মৃতের সংখ্যা ৫,৪৭৬জন, যার মধ্যে শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৬২৭জন। যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত ৩৫২৪১ মৃত ৪৭৩, স্পেনে আক্রান্ত ৩৩০৮৯ মৃত ২২০৬, জার্মানীতে আক্রান্ত ২৬২২০ মৃত ১১১, ইরান আক্রান্ত ২৩০৪৯ মৃত ১৮১২, ফ্রান্সে মৃত ৬৭৬, দক্ষিন কোরিয়াতে মৃত ১১১, সুইজারল্যান্ডে মৃত ১১৮, যুক্তরাজ্যে মৃত ৩৩৬। বিশ্বের ৩৫ দেশে একদিনে মারা গেছেন ১৩শ’ ৬৫জন, আক্রান্ত ৩০ হাজারের অধিক। ইতালি, স্পেন, পর্তুগালসহ পুরো ইউরোপ লকডাউনের মধ্যে ভূতড়ে পরিবেশের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ইরান দিশেহারা হয়ে পড়েছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও মালয়শিয়াতে বেশি আক্রান্ত।

অপরদিকে দেখা যাচ্ছে, রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, মানিকগঞ্জ, বরগুনা, গোপালগঞ্জ, ছাগলনাইয়া, চুয়াডাঙ্গা, মুন্সিগঞ্জ, ঝালকাঠি, মিরসরাই, রাঙ্গুনিয়া-কাপ্তাই, সিরাজদিখান, পটুয়াখালী, গাইবান্ধা, বগুড়া, ফরিদপুর, জয়পুরহাট, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, নওগাঁ, কিশোরগঞ্জ, যশোর, টাঙ্গাইল, শ্রীমঙ্গল ও নেত্রকোনাসহ দেশের নানা জায়গায় বিদেশ ফেরত ও তাদের স্বজনদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হলেও তাদের অনেকেই নিয়ম মানছেন না, যার ফলে দেশে মহামারি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেকে ধারণা করছেন, সরকার মুজিব শতবর্ষ পালন করতে গিয়ে রোগটি নিয়ে যে গাফিলতি করেছে, তার খেশারত জনগণকেই দিতে হবে।

জাতিকে বাঁচানোর স্বার্থে বর্তমান পরিস্থিতে বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে ধর্ম ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে যথপোযুক্ত সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে। যারমধ্যে অন্যতম হলো পুরো দেশকে লকডাউন করা। লকডাউন করার মূল লক্ষ্য হলো— জনসাধারণকে জনসমাগম থেকে দূরে রাখা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, কারাগারে যারা আছেন, তাদের জন্য কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা কি কিংবা গরীবদের জন্য ব্যবস্থা কি? যদি তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে এই রোগ প্রতিরোধ করা যাবে কি? এই বিষয়ে আমাদের সরকারসহ বিশ্বসরকারগুলোরও দুর্বলতা রয়েছে। এমন সময়ে রাজনীতি ভুলে সবাই একসাথে কাজ করতে হবে।

একজন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে দেশের নানা পত্রিকায় বেগম জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে আবেদন জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছিলাম। সেসব আবেদনে বলেছিলাম, বেগম জিয়ার মুক্তির ব্যবস্থা করে দিলে জনতার কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার যেমন গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, তেমনি দেশেরও ভালো হবে। আজ বেগম জিয়া মুক্ত জীবনে। এতে হাজারো প্রশ্নের পরেও পেইজ বুক দুনিয়ায় বিএনপি’র নেতা থেকে কর্মীরা আপনাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন।

তাই অবলীলায় বলতে পারি, বিশ্ববরেণ্য একজন আলেমের দুআ পরকালে আপনার উপকারে আসবে। তাই বলছি, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে শর্তসাপেক্ষে মুক্ত করে দিলে রবের দরবারে ও আমজনতার মনে আপনি বড় হয়ে যাবেন।

বিগতদিনগিলোতে বিশ্বযুদ্ধসহ অসংখ্যযুদ্ধ পৃথিবীকে হুমকির মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু বিনাযুদ্ধে এইপ্রথম বিশ্বকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে করোনাভাইরাস। যা থেকে বাঁচার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ঔষধ বের হয়নি। একমাত্র মহান আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া নিশ্ববাসীর কিছুই করার নেই। এমন সময়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকার প্রধানরা লকডাউনের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশকে বিচ্ছিন্ন করে নিচ্ছে। যার প্রধান লক্ষ জনগণকে পৃথকীকরণ করা। যাকে বলে কোয়ারেন্টিনে ব্যবস্থা।

কোয়ারেন্টিন বিষয়ে নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিঁনি বলেন, ‘যদি তোমরা শুনতে পাও যে, কোনো জনপদে প্লেগ বা অনুরূপ মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তবে তোমরা তথায় গমন করবে না। আর যদি তোমরা যে জনপদে অবস্থান করছ তথায় তার প্রাদুর্ভাব ঘটে তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৬৩; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৩৮, ১৭৩৯)। নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে সংক্রমন (ছোঁয়াছে রোগ) প্রতিরোধে বিচ্ছিন্নকরণ (কোয়ারেন্টিন) ব্যবস্থার কিংবা লকডাউনের নির্দেশনা প্রদান করেন।

দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অন্যতম একজনের কাছে ফোন করে অনুরোধ করলাম, সরকারকে তিনি যেন পরামর্শ দেন পুরোদেশকে লকডাউন করার জন্য। বিজ্ঞ নীতিনির্ধারক বলেন, সরকারের উপরি মহলে এই বিষয়ে একধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে সমালোচকদের ভয়ে একটু সময় নিচ্ছেন। বললাম, এমন দিনে সমালোচকদের ভয় পেলে চলবে না। তবে, লকডাউনের কারণে দেশে একধরণের অস্থিরতা বিরাজ করতে পারে। অতিরিক্ত মজুদের নেশায় দোকান-পাটে মানুষের ঝটলা বাঁধবে। এতে দ্রব্য মূল্যের দাম স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে এবং ভাইরাসটি সংক্রমনে পথ খুঁজে পাবে। তা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিম গঠন করে বাজার মনিটরিং করতে হবে। জাতীয় মসজিদের খতিব ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সম্মিলিত টিম গঠন করে ধর্মীয় বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, নির্দেশনাবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কোনো কাজেই আসেনি। তাই একটি নির্দিষ্ট গাইড লাইনের মধ্য দিয়ে লকডাউন করতে হবে। মসজিদ বন্ধের আগে সিনেমা হল ও মার্কেটগুলো বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে এই সময়ে ব্যাংক, এনজিও এবং ব্যক্তিপ্রদত্ত অর্থের ওপর সুদ, দোকান ও বাসাভাড়াসহ নানা ব্যয় মালিকদের পক্ষ থেকে মওকুফের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে নিয়োজিত প্রায় ৯০ হাজার ডাক্তার ও কয়েক স্বাস্থ্যকর্মীর (নার্স এবং এতদ সংশ্লিষ্ট সকল) প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক পিপিই’র (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) ব্যবস্থা করতে হবে। রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় কিট বিদেশ থেকে আমদানীসহ গণস্বাস্থ্য হাসপাতালকে তৈরির পথ সুগম করে দিতে হবে এবং লকডাউন সফল করতে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চলমান রাখতে হবে।

আল্লাহ পাক কুরআনে এরশাদ করেন- আসলে তোমার প্রতিপালকের বাহিনী (কত প্রকৃতির বা কত রূপের কিংবা কত ধরনের) সম্পর্কে একমাত্র তিঁনিই জানেন (সূরা মুদাসসির, আয়াত ৩১-এর শেষাংশ)। তাই এই রোগকে আল্লাহর পাঠানো এক বাহিনী হিসেবে মেনে নিতে হবে। কেননা আমরা তাঁর পথ থেকে সরে গিয়ে অনেকটাই গাঁ বাসিয়ে দিয়েছি মাস্তিতে। এটি তাঁর পক্ষ থেকে গজব, যা মানবজাতির জন্য একটি সর্তকবার্তা। কুরআন ও হাদিসের ভাষ্যমতে মহামারি পৃথিবীতে আল্লাহর একটি শাস্তি। নবি সা. ইরশাদ করেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা আগের লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস- ৪০১৯)।

এখনই সময় মুমিনরা তাদের ইমানকে খাঁটি করার আর যারা তাঁর প্রতি নড়বড়ে তাদের ফিরে আসার। সহীহ বুখারির ৫৭৩৪ নং হাদিসের আলোকে (আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত) বলা যায় যে, আল্লাহ নাফরমানের জন্য শাস্তি স্বরূপ আর ইমানদারের জন্য রহমত স্বরূপ প্লেগ পাঠান। তবে এই রোগে বান্দা যদি ধৈর্য ধারণ করে আপন শহরে অবস্থান এবং বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না, তাহলে তার মৃত্যু পাবে শহীদের মর্যাদা।

আমরা খেয়াল করলে সহজে বুঝতে পারব যে, বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্ব আজ এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য যা যা বলছে, তার সবকিছুই ইসলামের জীবন বিধানের নির্দেশায় আছে। চায়নিজরাসহ বিশ্বের অনেক দেশ মুসলিম নারীদের হিজাব পরার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, অথচ আজ তারা মুখ ঢেকে চলছে।

এমন বিপদের সময় মহান রবের কাছে প্রার্থনা করতে হবে। তাইতো দুআগুলো পড়ি- আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল বারসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুযামি, ওয়া মিন সায়্যিইল আসক্বাম। অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ধবল, কুষ্ঠ ও উম্মাদনাসহ সব ধরনের কঠিন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে রক্ষা চাই। (আবু দাউদ- ১৫৫৪)।

আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন মুনকারাতিল আখলাক্বি ওয়াল আমালি ওয়াল আহওয়ায়ি, ওয়াল আদওয়ায়ি। অর্থাৎ- হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার কাছে খারাপ চরিত্র, অন্যায় কাজ ও কুপ্রবৃত্তির অনিষ্টতা এবং অসুস্থতা ও নতুন সৃষ্ট রোগবালাই থেকে পানাই চাই। (তিরমিযী)

হে মহান আল্লাহ আমাদের সরল পথে দেখাও।

লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক