কী ঘটতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে? (দ্বিতীয় পর্ব)

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

[দ্বিতীয় অংশ]

আগেই বলেছি, তালিবানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি বানচালে অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হলো ভারত, এও বলেছি, ভারতের পেছনে আছে ইহুদীবাদী ইসরাঈল। শেষ পর্যন্ত পেরে উঠতে না পেরে ভারত আশরাফ ঘানীকে চুক্তি না মানতে প্ররোচিত করে। ২৮শে ফেব্রুয়ারী অর্থাৎ, চুক্তি স্বাক্ষরের আগের দিন ভারতের বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা কাবুলে উড়ে যান মি.ঘানীর সাথে দেখা করতে। সাথে ছিলেন, সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজায়ী। অন্তরঙ্গ সেই বৈঠকের দু’দিনের মাথায় (১লা মার্চ) আশরাফ ঘানী বলে বসলেন: তার সরকার তালিবান বন্দীদের মুক্তি দেবে না। এতে তালিবানের প্রতিক্রিয়া ছিলো পরিস্কার। তালিবান বললো, তারা চুক্তি করেছে আমেরিকার সাথে, কাবুল সরকারের সাথে নয়।সূতরাং তালিবান-বন্দীর মুক্তি নিশ্চিত করবে আমেরিকা। এর মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফোনে সরাসরি কথা বললেন তালিবানের রাজনৈতিক প্রধান মোল্লা আব্দুল গনী বারাদারের সাথে। ট্রাম্প তাঁকে আশ্বস্ত করেন। তালিবান জানে, ট্রাম্পের ইশারা ছাড়া ঘানী কিছুই করার ক্ষমতা রাখেন না।ওয়াশিংটনে বসে ট্রাম্প ঘানীকে চমৎকার এক কথা শোনালেন। তাতেই ঘানী আর তার গডফাদারদের আসন কেঁপে উঠলো। ট্রাম্প বললেন: মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তান ত্যাগের মাস কয়েক পরেই তালিবান ক্ষমতায় বসবে। ঘানী বুঝে ফেললেন ট্রাম্পের কথা। পরদিনই ঘানী ঘোষণা করলেন, আপাতত দেড় হাজার তালিবান বন্দীকে মুক্তি দিচ্ছে তার সরকার। বাকিদের মুক্তি দেয়া হবে আন্তঃআফগান আলোচনার সময়। তালিবান বুঝলো, গোপনে আমেরিকা ও ঘানী সরকার তালবাহানার আশ্রয় নিচ্ছে। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোন তালবাহানা নয়, সব বন্দীকে একসাথে ছাড়তে হবে চুক্তি মেনে। অন্যথায় যা হবার তাই হবে। তালিবান জানে এসবের পেছনে ভারতের ইন্ধন সক্রিয়। তবে তালিবান এখনই ভারতকে শায়েস্তা করবে না, করবে ক্ষমতা গ্রহণের পর।

তালিবান-মার্কিন চুক্তি নিয়ে ভারতের অস্বস্তি এখন আর লুকোবার নয়। সাম্প্রতিককালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যাপিমন জ্যাকব সাউথ এশিয়ান মনিটরে Fail-safe exit for America, but a worry for India শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। অর্থাৎ, ‘আমেরিকার নিশ্চিত-নিরাপদ প্রস্থান, কিন্তু ভারতের জন্য উদ্বেগ’। সেখানে তিনি লিখেন– The recently negotiated peace deal between the United States and the Taliban is unlikely to bring peace to Afghanistan, is geopolitically disadvantageous for India, and has serious implications for our national security. The terms of the deal, the manner in which it was negotiated as well as the geopolitical context in which it was stitched up indicate that it was more about providing an honourable exit route for the US’s Trump administration from its military campaign in Afghanistan than about ending violence in the country. (যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে সম্প্রতি যে শান্তি চুক্তি হয়েছে, সেটা আফগানিস্তানে শান্তি আনবে বলে মনে হয় না, ভূরাজনৈতিকভাবে এটা ভারতের স্বার্থের বিরোধী এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার উপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। চুক্তির যে সব শর্ত, যেভাবে চুক্তিটা নিয়ে দর কষাকষি হয়েছে এবং যে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, সেগুলো মিলিয়ে দেখলে মনে হয়, আফগানিস্তানে সহিংসতা বন্ধ করার কোন বিষয় এখানে নেই, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনকে নিরাপদে তাদের সামরিক প্রচারণা গুটিয়ে বিদায় হওয়ার একটা সুযোগ করে দেয়া হয়েছে এখানে।) প্রবন্ধের আরও পরের দিকে তিনি মন্তব্য করেন– The only state that seems to be on the losing end, unfortunately, of this unfolding game of chess and patience in Afghanistan is India. It did not have to be this way: if the earlier Taliban regime was anti-India, it was also because India had militarily supported the Northern Alliance that kept up the military pressure against the Taliban. Today’s Taliban does not share the same animus for New Delhi. New Delhi, therefore, could have rejigged its approach to Taliban this time around. However, it put all its eggs in the Ashraf Ghani basket, even on the eve of the signing of the peace deal in Doha. New Delhi also, for most intents and objectives, adopted a puritanical approach to the Taliban, neither reaching out to the Taliban nor exploiting the fissures within it; one, because it did not want to irk the elected government in Kabul and two, because it adopts a moralistic approach to dealing with extremist groups in general not a smart diplomatic strategy. This moralistic attitude, also a diplomatically lazy one, I would say, that be it Pakistan or Afghanistan, India would only talk to the legitimate government in that country, is a self-defeating position. The world is not that perfect, nor are states all that uniform, created in the shape and image of the Westphalian forefather. Smart statecraft, therefore, is dealing with what you have and making the best of it. (আফগানিস্তানে দৃশ্যপট পরিবর্তনের মধ্যে একমাত্র যে দেশটি ক্ষতির শিকার হতে যাচ্ছে, সেটি হলো ভারত। তালেবানদের ভারত বিরোধী হওয়ার কারণ হলো শুরুর দিকে তালেবানদের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার জন্য নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সামরিকভাবে সহায়তা করেছিল ভারত। তবে আজকের তালেবানরা নয়াদিল্লির প্রতি একই রকম শত্রুপ্রবণ নয়। নয়াদিল্লি তাই তালেবানদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতে পারতো। কিন্তু এমনকি দোহা চুক্তির শেষ মুহূর্তে এসেও ভারত তার সকল সমর্থন আশরাফ ঘানিকে দিয়ে এসেছে। নয়াদিল্লি একই সাথে তালেবানদের সাথে অতিনৈতিকতাবাদী একটা আচরণ করে এসেছে। তারা তালেবানদের কাছাকাছিও হয়নি, বা তাদের ভেতরের শক্তিগুলোর অপব্যবহারও করেনি। কারণ তারা কাবুলের নির্বাচিত সরকারকে উত্তক্ত করতে চায়নি। তাছাড়া সাধারণভাবে চরমপন্থী গ্রুপগুলোর মোকাবেলার ক্ষেত্রে একটা নৈতিক অবস্থান নিয়েছে তারা। কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে যেটা মোটেই স্মার্ট নয়। এই নৈতিকতাবাদী অবস্থানটা এক ধরনের কূটনৈতিক আলসেমি, এবং পাকিস্তান বা আফগানিস্তান যে দেশই হোক, সেখানে ভারতকে শুধু বৈধ সরকারের সাথে কথা বলতে হবে, যেটা আসলে নিজেদের জন্য এক ধরনের পরাজয়। বিশ্ব এতটা আদর্শিক নয়, দেশগুলোও ঐক্যবদ্ধ নয়।) এখান থেকে চুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

এখানে আরেকটি বিষয় পাঠকদের জেনে রাখা জরুরী। তা হলো, আফগানিস্তানে যে পটপরিবর্তন অত্যাসন্ন, তা ভারত আগে থেকেই আঁচ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তালিবানের আলোচনা শুরু হয় ২০১৮ সালে। বিষয়টি যখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে যাচ্ছে বলে মনে হয়, তখন-ই ২০১৯ সালে ভারতের গোয়েন্দাসংস্থা ‘র’-র প্রধান সামন্ত কুমার গোয়েল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মুদির সাথে সাক্ষাৎ করে যতো শীঘ্র সম্ভব বিশেষ ধারা বাতিল করে কাশ্মীরকে ভারতের একীভূত করে নিতে পরামর্শ দেন ( Hindustantimes, 5 July)। ভারতের আশঙ্কা হলো, তালিবান ক্ষমতায় আসলে পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে এবং তাতে কাশ্মীরের পরিস্থিতি ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এসব মাথায় রেখে ভারত সার্বিকভাবে তালিবানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছে এবং ঘানী সরকারকে ব্যবহার করছে। পাশাপাশি ভারত ঘানীর প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ’র সাথেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কারণ, মি.আব্দুল্লাহ আহমদ শাহ মাসুদের উত্তরাঞ্চলীয় জোটের লোক হওয়ার সুবাদে ভারতের সাথে পুরনো সম্পর্ক রয়েছে। হতে পারে, আশরাফ ঘানীকে দিয়ে না হলে ভারত মি.আব্দুল্লাহকে ব্যবহার করবে।

এখন কী হতে পারে?
————————-
এখন আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবার মাঝে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। চুক্তি সম্পাদন, বন্দীমুক্তিতে ঘানীর অস্বীকৃতি আবার আংশিক সম্মতি, পূর্ণমুক্তি ছাড়া তালিবানের প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি বিষয় আফগানিস্তানকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? তবে কি আবারও যুদ্ধ হবে? না কি তালিবান বন্দুকের জোরে কাবুলের ক্ষমতা দখল করবে? এখানে একটি বিষয় বুঝতে হবে, আর তা হলো, চুক্তির পর তালিবান এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে বলা যায়। কারণ, সবদিক বিবেচনায় বল এখন আন্তর্জাতিক বিশ্বের কোর্টে। মূলত, আমেরিকার সাথে চুক্তি করে তালিবান আন্তর্জাতিক বিশ্বকে এক পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন দু’টো: তালিবান আজ হোক কাল হোক ক্ষমতায় আসছেই। এখন বহির্বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে: তারা কোন পথ বেছে নেবে? তারা কি তালিবানের চুক্তিভিত্তিক ক্ষমতায় আসাকে বেছে নেবে, না কি চুক্তির বাইরে গিয়ে বন্দুকের জোরে তালিবানের ক্ষমতায় আসাকে বেছে নেবে? আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য নিরাপদ হলো চুক্তির মাধ্যমে তালিবানকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া যা তালিবানের কাছেও পছন্দনীয় বলে মনে হয়। কারণ, সম্পাদিত চুক্তিটি উভয়পক্ষের জন্য ফলদায়ক ও নিরাপদ। কথা হচ্ছে, এখন যদি কোন কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্ব চুক্তি নিয়ে গড়িমসি করে, তাতে তালিবান অবশ্যই লাভবান হবে। কেননা, যুদ্ধ করেই যদি তালিবানকে কাবুল দখল করতে হয়—তাতে তালিবান বহির্বিশ্বে প্রতিপক্ষ কর্তৃক চুক্তি লঙ্ঘনের কথা বলে অবস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। সে-সময় তালিবানপ্রশ্নে আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। যুদ্ধ করে তালিবান ক্ষমতায় এলে, তালিবানের ওপর শর্তের কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না—এ বিষয়টি বহির্বিশ্বকে মনে রাখতে হবে। এর ওপর হচ্ছে, আমেরিকার সৈন্য যতোক্ষণ পূর্ণভাবে আফগানিস্তান না ছাড়ছে ততোক্ষণ চুক্তি নিয়ে গড়িমসি করলে প্রধান ক্ষতিটা হবে আমেরিকারই। আমেরিকা সে-কথা বিলক্ষণ বোঝে। তাই আমেরিকা নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবার ভুল করবে বলে মনে হয় না। এখন আমাদেরকে দেখতে হবে, চুক্তির শর্তানুযায়ী আন্তঃআফগান আলোচনা শুরু হচ্ছে কি না। এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। এখানে আমেরিকাকে মূল-ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ, তালিবান বলে দিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ৫০০০ বন্দীকে না ছাড়লে, তাঁরা আলোচনায় যাবে না। আশরাফ ঘানীকেও মনে রাখতে হবে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে তার পরিণতি নজিবুল্লাহর মতও হতে পারে।

আরেকটি বিষয় এখানে বিচার্য; তা’হলো, তালিবান এখন দেশের সত্তর শতাংশেরও বেশি ভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে। পক্ষ হিসাবে তারা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। এ অবস্থান ধরে রেখেই তালিবান চুক্তি করে। তাই, যে কোন আলোচনায় তাদের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে সমাধান খুঁজতে হবে। এর কোন বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। যারা মনে করছেন, বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতায় গেলে তালিবান আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে না, তারা ভুল করবেন। কারণ, এখন আর আর নব্বইয়ের দশক নয়। ভূ-রাজনীতি, ভূ-অর্থনীতি, ভূ-সমরনীতি ও ভূ-বাণিজ্যনীতি ইত্যাদিতে আফগানিস্তান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিশ্ব সে-কথা ভালোই বোঝে। অন্তত হলফ করে বলা যায়, চুক্তির বাইরে গিয়েও যদি তালিবান ক্ষমতায় আসে, তবে পাকিস্তানের পর তালিবানকে স্বীকৃতি দেবে চীন। আর চীনের পথ ধরে রাশিয়াসহ অনেকেই সেই কাতারে হাজির হবেন বলা যায়। ধরে নেয়া যায়, আগামী পরিবর্তিত বিশ্বে তালিবান শাসিত আফগানিস্তান হবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের এক ব্যালেন্স-পাওয়ার। সময়েই সে-প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

পরিশেষে বলতে হয়, তালিবান-মার্কিন চুক্তিটি আগামী বিশ্বকে স্থিতিশীল করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের উচিৎ হবে, ষড়যন্ত্রকারীদের ফাঁদে পা না দিয়ে সম্পাদিত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা। তা’হলে, অস্থিতিশীল দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলসহ পুরো বিশ্ব উগ্রবাদ থেকে রক্ষার পথ খুঁজে পাবে।
(সমাপ্ত)

Leave a Reply