কী ঘটতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে?

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী


[প্রথম অংশ]

প্রথম কথা

বলাবাহুল্য, গত ১৯শে ফেব্রুয়ারী কাতারের রাজধানী দোহায় দীর্ঘ ১৯ বছরের প্রান্তে এসে তালিবান ও হানাদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। চুক্তির শিরোনামে লেখা ছিলো—Agreement for Bringing Peace to Afghanistan between the Islamic Emirate of Afghanistan which is not recognized by the United States as a state and is known as the Taliban and the United States of America February 29, 2020. এরপরের উপশিরোনাম হলো: A comprehensive peace agreement is made of four parts: বলা হচ্ছে, একটি ব্যাপকভিত্তিক শান্তিচুক্তির মৌলিক অংশ হবে চারটি। অংশ চারটি হলো:

1. Guarantees and enforcement mechanisms that will prevent the use of the soil of Afghanistan by any group or individual against the security of the United States and its allies.

2. Guarantees, enforcement mechanisms, and announcement of a timeline for the withdrawal of all foreign forces from Afghanistan.

3. After the announcement of guarantees for a complete withdrawal of foreign forces and timeline in the presence of international witnesses, and guarantees and the announcement in the presence of international witnesses that Afghan soil will not be used against the security of the United States and its allies, the Islamic Emirate of Afghanistan which is not recognized by the United States as a state and is known as the Taliban will start intra-Afghan negotiations with Afghan sides on March 10, 2020, which corresponds to Rajab 15, 1441 on the Hijri Lunar calendar and Hoot 20, 1398 on the Hijri Solar calendar.

4. A permanent and comprehensive ceasefire will be an item on the agenda of the intra-Afghan dialogue and negotiations. The participants of intra-Afghan negotiations will discuss the date and modalities of a permanent and comprehensive ceasefire, including joint implementation mechanisms, which will be announced along with the completion and agreement over the future political roadmap of Afghanistan.

চার শর্তের প্রথমটিতে কেউ যেন মার্কিন ও তার মিত্রদের (যারা আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে) বিরুদ্ধে কোন প্রকার আগ্রাসন চালাতে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে না পারে, সে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় শর্তে বলা হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সকল বিদেশী সৈন্য, জনবল ও যাবতীয় সরঞ্জাম প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা। তৃতীয় শর্তে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে সকল বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণার নিশ্চয়তা এবং মার্কিন ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা বিঘ্নে আফগানিস্তান যে ব্যবহৃত হবে না, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে এমন ঘোষণার নিশ্চয়তা এবং ২০২০ সালের ১০ই মার্চে আন্তঃআফগান আলোচনা শুরু করা। চতুর্থ শর্তে বলা হয়েছে, আন্তঃআফগান আলোচনা ও সমঝোতায় একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির প্রসঙ্গ থাকবে এবং আন্তঃআফগান আলোচনার পক্ষগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির তারিখ ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবে। সাথে থাকবে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ পথচিত্র ও কৌশল নিয়ে সবপক্ষের চুক্তি ও ঘোষণা।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই বিভিন্ন আলামত দেখে পর্যবেক্ষকেরা আশঙ্কা করতে থাকেন, চুক্তির বাস্তবায়ন হয় তো অতো মসৃন হবে না। এর কারণ, ভেতরের ও বাইরের ষড়যন্ত্র। স্মরণ রাখা দরকার, যে পক্ষগুলো তালিবানকে মানতে নারাজ এবং সাথে-সাথে আফগানিস্তানকে নিজস্বার্থে ব্যবহার করতে উদগ্রীব—তারা বরাবরই আফগানিস্তানের কোন প্রকার চুক্তিভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে বানচাল করার ফিকির করে এসেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো, ভারত, ইরান ও ইসরাইল। ইসরাঈল যদিও আফগানিস্তানের প্রতিবেশী নয়, কিন্তু ভারতের সাথে গভীর সম্পর্কের কারণে ভারত ইসরাঈলের ছায়াশক্তি হিসাবে কাজ করে। ২০০২ সালে তালিবানের ক্ষমতা থেকে সরে যাবার পরপরই ভারত অলিখিত মার্কিন মিত্র হিসাবে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। ইতোমধ্যে ভারত আফগানিস্তানে ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে তাদের প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে, বিপরীতে প্রতিবেশী পাকিস্তানকে চাপে রাখতে। তা’ছাড়া, কাবুলে তাদের বিভিন্ন স্তরের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা রয়েছে। এমন কি ভারত মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে তালিবানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুপ্ত-হামলা ও অপারেশন চালানোর পরিকল্পনা করে রেখেছে। ভারতের এমন ফন্দির পেছনে রয়েছে ইসরাঈলের গোপন সহায়তা। তবে তালিবানের কাছে এসব বিষয় মোটেও অজানা নয়। তাই, ওসব মুকাবিলার পরিকল্পনা তালিবান আগে থেকেই নিয়ে রেখেছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকা ও ভারত মিলে কাবুলে ব্ল্যাকওয়াটারদের (১৯৯৭ সালে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধে ভাড়াটিয়া সৈন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান) একটি প্রধান অফিস গড়ে তোলে। পরিকল্পনা হয়, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর তালিবানের উপর বিভিন্ন হামলা চালাতে এসব ব্ল্যাকওয়াটার সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। তড়িৎ সে-খবর পৌঁছে যায় তালিবানের কাছে। তালিবান বেশি দেরি না করে গত বছরের (২০১৯) ২রা সেপ্টেম্বর ব্ল্যাকওয়াটারের ভবনটি ঘেরাও করে বিধ্বংসী হামলা চায় এবং তাদের কমান্ডার শফীকুল্লাহসহ ৩০ জনকে হত্যা করে। সাথে একজন মার্কিন প্রশিক্ষকও নিহত হয়, যে একজন ঠিকাদারের পরিচয়ে অবস্থান করছিলো। এ ঘটনার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (৭ সেপ্টেম্বর) তালিবানের সাথে শান্তিচুক্তি বাতিল করেন। ষড়যন্ত্রকারী-শক্তি বুঝতে পারে তালিবানের সাথে অপকৌশল নিয়ে আগানো সমূহ কঠিন। ইরান এখানে আরেকটি ফ্র্যাক্টর। প্রথম থেকেই ইরান আফগানযুদ্ধ নিয়ে একটা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর থেকে ইরান আফগান জিহাদে বিভিন্ন পক্ষের মাঝে মতভিন্নতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে এসেছে। ইরান জানতো, আফগানিস্তান একটি সুন্নী-প্রধান দেশ; জয়ী হলে সুন্নীরাই জয়ী হবে। বলা প্রয়োজন, সে-সময় ইরানে খোমেনীর নেতৃত্বে শিয়া বিপ্লব চলছিলো। ইরানের অভিপ্রায় ছিলো, কোনক্রমেই যেন ইরানের পার্শ্ববর্তী সুন্নী নিয়ন্ত্রিত কোন স্থিতিশীল রাষ্ট্র না থাকে। তাই, তৎকালীন সোভিয়েত য়ুনিয়নের সাথে ইরান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক স্বার্থে। ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত য়ুনিয়নের শোচনীয় পরাজয়ের পর ১৯৯২ সাল অর্থাৎ তালিবানের আগমন পর্যন্ত বিভিন্ন মুজাহিদ-গোষ্ঠীর মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হয়—তাতে ইরান প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে উস্কে দিতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। এরপর তালিবানের আবির্ভাব হলে ইরান তালিবানের বিরুদ্ধে আহমদ শাহ মাসুদের (২০০১ সালে আল কায়েদার হাতে নিহত হন) উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে সমর্থন দিয়ে তালিবান সরকারকে অস্থিতিশীল করে রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। পরবর্তীতে টুইন টাওয়ার হামলার পর ইরান তালিবানবিরোধী উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে সমর্থন দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে রাজি করায় এবং উক্ত শক্তিত্রয় আহমদ শাহ মাসুদকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে থাকে। এর সাথে যোগ দেয় গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ারের দল যা পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনপুষ্ট ছিলো। ২০০২ সালে আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা চালালে সেই উত্তরাঞ্চলীয় জোট ইরান, ভারত ও আমেরিকার সরাসরি সমর্থনে কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়। সামনের আলোচনার জন্য উপরের তথ্যগুলো আশা করি সবার মনে থাকবে।

ভেতরের কথা


এবার আমরা মূল-বিষয়ে আসতে পারি। বলেছিলাম, সম্পাদিত তালিবান-আমেরিকা চুক্তি নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা। ২০১৮ সালে আমেরিকা যখন বুঝতে পারে, আফগানযুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়—প্রথম তালিবানের সাথে সমঝোতার প্রস্তাব দেয় (জুলাই)। এর জন্য তারা আফগান বংশোৎভূত মার্কিন নাগরিক জালমে খলীলজাদকে নিয়োগ দেয় (সেপ্টেম্বর, ২০১৮)। তালিবান মার্কিন অবস্থানকে বুঝতে দেরি করেনি। তাঁদের এক কথা—সবার আগে সকল বিদেশী সৈন্যকে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে হবে। এবং সম্ভাব্য সমঝোতার প্রথম শর্ত হবে এটাই। আমেরিকা দীর্ঘ আলোচনা করেও তালিবানকে তার অবস্থান থেকে নড়াতে পারেনি। এর জন্য আমেরিকা তালিবানকে কাবুলের কারজায়ী ও পরবর্তীতে আশরাফ ঘানীর সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে বলে। কিন্তু তালিবান বিষয়টির কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে কাবুল সরকারের সাথে কোন প্রকার আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায়। তালিবানের যুক্তি ছিলো, কাবুল সরকার মূলত আমেরিকার অধীন একটি বিভাগ। সূতরাং, আলোচনা বা চুক্তি হলে ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের সাথে হবে, ক্ষমতাহীনপক্ষের সাথে নয়। কাবুল সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব ছিলো মূলত একটি রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ফাঁদ। বিষয়টি তালিবান সহজে বুঝতে পারে এবং উল্টো সরাসরি চুক্তি করে আমেরিকাকে ফাঁদে আটকে ফেলতে সক্ষম হয়। এতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকমহল হতবাক হয়ে যায়। কাবুল সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে প্রথমত মার্কিন ও তার মিত্রদের উদ্দেশ্য ছিলো, তালিবানের শক্তি ও সামর্থ্য পরীক্ষা করা। তারা ভেবেছিলো, দেড় যুগের এ যুদ্ধে তালিবান ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, সঙ্গতকারণে কোন প্রকারে পরিত্রাণ পেতে তারা মার্কিন প্রস্তাবে সাড়া দেবে এবং মার্কিন পছন্দমাফিক একটি চুক্তি দিয়ে তালিবানকে নাস্তানাবুদ করা যাবে। কিন্তু তালিবান ছিলো সর্বদা সজাগ। তারা বিষয়টি বুঝতে পেরে কাবুল সরকারের সাথে কোন কথা বলতে অস্বীকার করে এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেয়: তালিবান আরও আঠারো বছর হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। এরপর আমেরিকা আরও একটি ফাঁদ পাতে। তারা প্রস্তাব দেয়, চুক্তিপূর্ব একটি যুদ্ধবিরতির। কিন্তু তালিবান তাও প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিনীরা মনে করে, তালিবান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হবার কারণ: তাদের চেইন অব কমান্ডে সমস্যা আছে, তাই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত নয়। সেটাকে পরীক্ষা করতে আমেরিকা প্রস্তাব দেয় সাত দিনের এক যুদ্ধবিরতির। আমেরিকার অভিসন্ধি টের পেয়ে তালিবান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। আমেরিকা জানিয়ে দেয়, তালিবান সাত দিনের যুদ্ধবিরতি সফল করতে পারলেই চুক্তি হবে, নয় তো নয়। শুরু হলো যুদ্ধবিরতি, যথারীতি স্থানীয় সময় ২১শে ফেব্রুয়ারী , শুক্রবার দিবাগত রাত বারোটা থেকে ২৮শে ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাত বারোটা পর্যন্ত। আমেরিকা ভেবেছিলো, যেহেতু তালিবানে বিভিন্ন দল রয়েছে, তাই কেউ না কেউ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করবে। এতে তালিবানের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হবে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—ওয়া লিল্লাহিল ইযযাতু ওয়া লিরসূলিহী ওয়া লিল মু’মিনীন….। অর্থাৎ,–এবং সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর রসূলের জন্য এবং মু’মিনদের জন্য কিন্তু মুনাফিকরা সে কথা বোঝে না। বিশ্ব দেখলো, তালিবানের বিস্ময়কর চেইন অব কমান্ড। লঙ্ঘন তো দূরে থাক, পুরো সাত দিনে একটি বুলেটও বেরোয়নি তালিবানের বন্দুকের নল থেকে। এরপরও মার্কিনীরা চুক্তি নিয়ে তালবাহানা করার চিন্তা করে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তালিবান যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি বার্তা পাঠায়: ২৯ তারিখ চুক্তি না হলে আর কোন কথা নয়; এক নির্ধারণী-যুদ্ধ শুরু হবে। তাঁরা সাফ জানিয়ে দেয়, এ ভয়াবহ যুদ্ধে একটি বিদেশী সৈন্যও জিন্দা দেশে ফিরে যেতে পারবে না। আফগানিস্তান থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, তালিবান এমন ‍যুদ্ধের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো। তারা অত্যন্ত প্রশিক্ষিত এমন ৬,০০০ মুজাহিদ তৈরি করে রাখে যাঁরা একযোগে প্রতিটি বিদেশী ঘাঁটিতে আক্রমন করবে। খবরটি ২৯শে ফেব্রুয়ারীর আগে ওয়াশিংটন পৌঁছালে প্র্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্ধারিত দিনেই চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দেশ দেন।
(চলবে)

Leave a Reply