ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম


সূর্যের কিরণে হাতের ধারালো ছুরিটি ঝিকমিকিয়ে উঠলো। বিশ্ববীণাতারে বেজে উঠলো পরম আশ্চর্য আর গভীর রহস্যের সুর। পরাজিত শয়তানের পাংশুটে কিম্ভূত চেহারায় জ্বলে উঠলো লজ্জা আর অপমানের আগুন। আকাশের নীলিমায় সত্যানন্দের মাদলধ্বনি। বাতাসের প্রবাহে রাশি রাশি পুলকের হিল্লোল। অবিনাশী সৌন্দর্যের মৃদু ঝংকারে মরুভূমির উচ্ছল বিয়াবানে মুগ্ধতার শিহরণ। খোদার প্রতি নিজের প্রিয়তমকে উৎসর্গের মৌতাতে বালু আর বাতাসের সায়রে অপার্থিব সম্মোহন। সূর্যের দীপ্র হাসি থেকে শুনা যাচ্ছে দৃপ্ত ঘোষণা- দেখো পৃথিবীবাসী, প্রেম বিশ্বাস আর উৎসর্গের অভূতপূর্ব দ্যোতনা। দেখো মহান আল্লাহর নিকট প্রিয় বন্ধুর কৃতার্থ ও পরিতৃপ্তময় নযরানা।

স্বপ্নযোগে মহান আল্লাহ প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম আ. কে আদেশ করেছিলেন তাঁর প্রিয়তমকে আল্লাহর তরে উৎসর্গ করার জন্য। জীবনের দীর্ঘ নব্বই বছর পর বহু কামনা আর আকুতির মাঝে যে সন্তান কোলে আসে পৃথিবীতে তারচেয়ে প্রিয় বস্তু আর কী হতে পারে? খোদা তা’আলা সেই প্রিয়তমকে উৎসর্গ চাচ্ছেন! ইবরাহীম আ. বিন্দুমাত্র বিব্রত ও উৎকণ্ঠিত হলেন না। প্রিয়তমকে জানালেন তাঁর প্রতি খোদা তা’আলার আদেশের কথা। শিশু ইসমাইল আ. এর চেহারায় উদ্ভাসিত হলো সৌভাগ্যের অমল ধবল কান্তি। তাঁর হৃদয়োদ্যানে যেন উৎসারিত হলো কৃতার্থম্মন্যতা আর মোহমুগ্ধতার শুভ্র, স্বচ্ছ, সুবিমল জলধারা। উদ্গ্রীব কণ্ঠে বললেন আপনাকে যা বলা হয়েছে তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। নব্বইয়োর্ধ জ্ঞানবৃদ্ধ প্রজ্ঞাপ্রবর ইবরাহীম আ. শিশুপুত্র ইসমাইল আ. কে নিয়ে হেঁটে চলেছেন কুরবানির উদ্দেশ্যে। নিরুদ্বেগ, নিশ্চিন্ত। ইসমাঈল আ. চেহারায়ও সুপ্রসন্নতার জালওয়া। প্রিয়তমের গলায় ছুরি চালিয়ে ইবরাহীম আ. আল্লাহর প্রতি তার প্রেম ভালোবাসা ও বিশ্বাসের একটি বিরল দুরতিক্রম্য দৃষ্টান্ত ভাস্মর করে রাখলেন পৃথিবীবাসীর জন্য।

আল্লাহর কী সাধ যে বৃদ্ধ ইবরাহীম আ. বুক খালি করে তাঁর প্রিয়তমকে নিয়ে নিবেন? তিনি তো শুধু পরীক্ষা করতে চেয়েছেন তাঁর প্রতি খলীল ইবরাহীম আ. এর ভালোবাসার গভীরতা ও অভিজ্ঞান কেমন! ইবরাহীম আ. সফল হলেন পরিপূর্ণভাবে সেই অগ্নিপরীক্ষায়। আর আল্লাহ তা’আলাও অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। ইসমাঈল আ. কে মুক্ত করে দিলেন আর তার পরিবর্তে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে তা কুরবানি করার আদেশ করলেন। সেখান থেকেই শুরু হলো কুরবানির ধারা।

সেই প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্যও দ্বার উন্মোচন করলেন তার প্রিয়ত্ব অর্জন করার। আমাদের উপরেও আরোপ করলেন কুরবানির বিধান। তবে সন্তান কুরবানির মতো অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে নয়, হালাল পশু দ্বারা প্রতীকী কুরবানির মাধ্যমে। সেই কুরবানীতে যার অনুভব যতো গভীর ও অর্থময়, যতো ইখলাস ও তাকওয়াপূর্ণ হবে সে ততো উচ্চ পর্যায়ে উত্তীর্ণ হবে। সেখানে কোনভাবেই গৃহীত হবে না লৌকিকতা ও বড়ো বড়ো, দামি দামি পশু কুরবানির সামাজিক হীন প্রতিযোগিতা। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলাই কুরআনে বলে দিয়েছেন: আল্লাহ তাআলার কাছে তাদের কুরবানির পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না, বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে। সূরা হজ্ব–৩৭

যারা অনুভবশীল এবং অনুভবের সাথে কুরবানি করেন, কুরবানির পশু ক্রয় করতে গিয়ে তাঁরা দর কষাকষি করাটাকে মনে করেন নিজের ও সন্তানের জন্য অপমান ও অমর্যাদার কাজ। কারণ এটি তো সেই পশু যাকে কুরবানি করা হবে তাঁর সন্তানের পরিবর্তে। এরপর কুরবানির পশু এনে তারা বাড়িতে রাখেন সন্তানের সমাদরে ও মর্যাদায়। সন্তানের মতো গুরুত্ব দিয়ে করা হয় তার সেবা যত্ন। কুরবানির দিন তারা হয়ে পড়েন যুগপৎ আনন্দ বেদনায় ব্যাকুল বিহ্বল। তাঁদের চেহারা হয়ে উঠে দারুণ উদ্দীপনা ও উৎকণ্ঠায় মহিমান্বিত। চেখের মধ্যে বাঁধভাঙা অশ্রুর ঢল নেমে আসে যখন পশুটির গলায় ছুরি চালানো হয়। অনিচ্ছাকৃতভাবেই সশব্দে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন। যেন ছুরি চালানো হচ্ছে স্বয়ং তার সন্তানের গলায়। আর কুরবানির পর উদ্ভাসিত হয় তাদের চেহারায় তৃপ্তি ও বিরহের মিশ্রণে এক অনির্বচনীয় দ্যুতি।

এমন অনুভব ও ইখলাসসম্পন্ন কুরবানির মাধ্যমেই সাদৃশ্য স্থাপিত হয় হযরত ইবরাহীম আ. এর কুরবানির সাথে। আর এমন না হলে তা হয় না প্রকৃত কুরবানী। হয়ে যায় কসাই ও জবাইয়ের নিয়ম নীতি!


লেখক- মুত্তাকী বিন মুনির

শিক্ষার্থী