মুনির আহমদ


বামপাড়ার মুসলিম নামধারী কিছু সেক্যুলার আছেন, যারা মুসলমানদের কুরবানীর সময় আসলেই শিবসেনা-বিজেপির সাথে সুর মিলিয়ে কুরবানী বিরোধী নানা বক্তব্য নানা কায়দায় দিতে শুরু করেন। বছরের কোন একটা দিনও এদের ডিশে মাছ-মাংস ছাড়া না চললেও কুরবানী আসলে এদের পশুপ্রেম অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। এদের কেউ কেউ তখন পশু কুরবানীর পরিবর্তে মনের পশু জবাইয়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে থাকেন।কেউ কেউ কুরবানীর পশু জবাইকে গুরুত্বহীন করতে চেয়ে মনের পশু জবাইকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেও বয়ান দেন।

শিবসেনা ও বিজেপীর দেশীয় এজেন্টগুলার মুসলিম নাম হওয়ার কারণে বিভ্রান্ত হয়ে ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞ আধুনিক শিক্ষিত কতিপয় মুসলমানকেও কুরবানীর পশুর পাশাপাশি মনের পশুকেও জবাই করার কথা বলতে শোনা যায়। তাদের কেউ কেউ এমনও বলে থাকেন যে, কুরবানীর পশু জবাইয়ের চেয়েও মনের পশু জবাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

মনের পশু শুধু কুরবানীর দিনে নয়, বরং ইসলামে একজন মুসলমানকে সারা বছরই সবসময় মনের পশু তথা নফসকে নিবৃত্ত রাখতে বলা হয়েছে। তাছাড়া পবিত্র কুরবানীর পশু কুরবানীর মধ্য দিয়ে মনের পশু জবাইয়ের যে কথা সেক্যুলারকুল বলে থাকেন, সেটারও তো চমৎকার অনুশীলন মুসলমানদের পশু কুরবানীতে হয়ে থাকে।

যেমন- কুরবানীর পশুর মাংসের দুই তৃতীয়াংশ মানে হাজার হাজার টাকার মাংস একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির খেয়াল অন্তরে পোষণ করেই দ্বিধাহীনভাবে গরীব-মিসকীন ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অকাতরে বণ্টন করার সময়ই মনের পশু তথা লোভ, হিংসা ও ঘৃণার জবাই হয়ে যায়। পাশাপাশি দুস্থ ও অসহায়দের প্রতি মানবিকতাবোধের হাত প্রসারণ, আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত করা এবং সামাজিক সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য, মানুষের প্রতি দয়াদ্রতা, সহযোগিতামূল মানসিকতার চমৎকার প্রশিক্ষণও এই পশু কুরবানীতেই অর্জিত হয়ে থাকে।

মনের পশু বলছে কুরবানীর পশুর মাংস তো বেশীর ভাগই বিলানো হয়ে যায়, তো ভাঙ্গাচোরা, দুর্বল ও কমদামি একটা পশু কুরবানী দিলেই তো চলে। না, সেখানেও মনের পশুর কুরবানী আছে। যেমন- হাদীসে বলা হয়েছে, মোটাতাজা ও সুন্দর পশু কুরবানী দিতে। এর দার্শনিক দিক, যাতে গরীব মানুষরা অন্ততঃ এই একটা দিন ভালমানের মাংস আহার করার সুযোগ পায় এবং তাদের মনে যেন প্রফুল্লতা আসে।

কুরবানীর পশুর মাংস লুকিয়ে বিক্রি করে দেবেন, মনের পশুর সেই চাহিদারও সুযোগ রাখা হয়নি। বলা হয়েছে, এমনটা করা হলে কুরবানী হবে না। এমনকি কুরবানীর পশু জবাইয়ে সহযোগী শ্রমিকদেরকেও বদলা হিসেবে কুরবানীর মাংস দিয়ে বিদায় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। পশুর চামড়া বিক্রি করে টাকা পকেটে পুরবেন, মনের পশুর এমন চাহিদাকেও নিবারণ করে বলা হয়েছে, এটা গরীবদের হক; চামড়া বিক্রির টাকা তোমার জন্য নয়।

চাঁদাবাজি করে, চুরি করে, ডাকাতি করে, ঘুষের টাকা দিয়ে কুরবানীর পশু সংগ্রহ করে কুরবানীর পর গরীবদের মাঝে মাংস বিলিয়ে মহৎ সাজবেন ও দায়িত্ব থেকে খালাস পাবেন, সেই সুযোগও নেই। বলা হয়েছে, কুরবানীর পশু ক্রয়ের অর্থে সামান্যতমও অবৈধ অর্থ মিশ্রিত হলে কুরবানী হবে না। কুরবানীতে শরীকদেরকে সামান্যতমও ঠকালে কুরবানী হবে না। এসব বিধির মধ্যদিয়ে পবিত্র কুরবানীতে সৎকর্মের, সৎচিন্তার ও সৎথাকার সুন্দর চর্চাও হয়ে থাকে। এই রকম শত শত মানব কল্যাণকর দিক রয়েছে মুসলমানদের পশু কুরবানীর বিধানে।

অন্যদিকে সেক্যুলার পাড়ার পান্তা ইলিশ উৎসব দেশের কোটি কোটি গরীব-কৃষক ও গ্রামীণ সমাজকে শামিল করে না। বরং ভয়ানক শ্রেণী বৈষম্য তৈরি করে। তাদের পান্তা-ইলিশ উৎসব গরীব-কৃষকদেরকে তাদের অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
কিন্তু ইসলামের ঈদুল ফিতরে ফিতরা-যাকাত ও নতুন কাপড় এবং ঈদুল আযহার কুরবানীর মাংস বিলানোর মধ্য দিয়ে সমাজের উঁচু-নীচু সবাইকে আনন্দোৎসবে একই কাতারে নিয়ে আসে। বরং গরীব, নিঃস্ব ও এতীমরা অন্ততঃ এই একটা দিন ভুলে থাকে যে, তারা সমাজ বিচ্ছিন্ন বা অসহায়।

দেশের কোটি কোটি গরীব-বিত্তহীন-অসহায় মানুষ কেন একদিন ছেলেপুলেদের নিয়ে মজা করে খাবে ও আনন্দ করবে, এইটাই সেক্যুলারকুল সহ্য করতে পারছে না। সুতরাং গরীব-কৃষকদেরকেও বিত্তশালীদের কাতারে নিয়ে আসার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হোক। এভাবে মূলতঃ সেক্যুলাররা শুধুই ইসলামবিদ্বেষী নয়, বরং তারা গরীব ও কৃষকের স্বার্থবিরোধীও।


লেখক: নির্বাহী সম্পাদক মাসিক মুঈনুল ইসলাম,
দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।