গোটা বিশ্বকে যেভাবে কাশ্মীরে পরিণত করলেন সৃষ্টিকর্তা: ঐশ্বরিক শাস্তি?

রশিদ আহমেদ


কোভিড-১৯কে কেন্দ্র করে পৃথিবীর দেশে দেশে যে লকডাউন চলছে, তাতে কাশ্মীরের অনেক মানুষ উৎফুল্ল। এটা এ কারণে নয় যে, কাশ্মীরের মানুষ হৃদয়হীন, মানুষের দুর্ভোগের ব্যাপারে সহানুভুতিহীন এবং অন্যের দুঃখ দেখে তারা পুলক অনুভব করে। বরং তারা খুবই সংবেদনশীল, সহানুভুতিশীল এবং মানবতার জন্য তাদের অনেক ভালোবাসা রয়েছে। লকডাউনে থাকতে কেমন লাগে, এই ধারণাটা বিশ্বের মানুষকে জানাতে পারায় তারা এই পুলক অনুভব করছে।

শ্রীনগরের রাস্তাঘাটে এবং সামাজিক আলোচনায় অনেকটা ব্যাঙ্গ ও অভিযোগের সুরে এই কথাটা বারবার উঠে আসছে যে, “কাশ্মীরের লকডাউন নিয়ে সারা বিশ্বের নীরবতার কারণে পুরো বিশ্বই এখন কাশ্মীরে পরিণত হয়েছে”।

কাশ্মীর নিয়ে নীরবতার কারণে ঐশ্বরিক শাস্তি?

করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে চার মাস ধরে লকডাউনের মধ্যে থাকার যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে কাশ্মীরের মানুষ, সেটার কারণে কাশ্মীরের বহু মানুষ মনে করছে যে, “কাশ্মীরের জনগণের যন্ত্রণার ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকার কারণে এটা একটা ঐশ্বরিক প্রতিশোধ”। “কাশ্মীরের জনগণের প্রতি কোন ধরনের সহানুভুতি না দেখিয়ে তাদের দুর্দশায় সায় দিয়েছে” বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দোষী মনে করে তারা।

মানুষকে রক্ষায় লকডাউন বনাম মানুষকে দমনের জন্য লকডাউন?

কোভিড-১৯ লকডাউনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির বিষয়টি ব্যাখ্যা করার কিছু নেই। বিশ্বের মানুষ এখন খুব ভালো করেই জানে যে, লকডাউন আরোপ করা হলে মানুষের স্বাস্থ্য, সম্পদ আর স্বাধীনতার কি অবস্থা হয়।

চলমান লকডাউন নিয়ে একটি বিষয় অস্বীকার করা যাবে না। এ সময়টাতে মানুষের উপকারের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তথ্যের প্রবাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। সরকার জনগণের খোঁজখবর নিচ্ছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য জিনিস নাগরিকদের দেয়া হচ্ছে। বহু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের সাহায্যের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা নিয়েছে। এরপরও মানুষের দুর্দশা অবর্ণনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।

কাশ্মীর: শাস্তির জন্য লকডাউন

এখন সেই অঞ্চলের মানুষের যন্ত্রণা আর দুর্ভোগের কথা ভাবুন, যাদের উপর লকডাউন আরোপ করা হয়েছে শাস্তি হিসেবে। কাশ্মীরে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ, কারফিউ জারি, অবরুদ্ধ জনগণের ব্যাপারে কারো সমবেদনা নেই, যেখানে সেখানে বাড়ির পাশে, শহরের স্কয়ারে, রাস্তার কোনায় বেসামরিক মানুষকে গুলি করে মারা হচ্ছে।

২০১৯ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের অবস্থাটা এ রকমই গেছে, যখন ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়।

যেভাবে পাঁচ মাস ধরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে দর কষাকষি হয়েছে

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর যখন ইসলামিক পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের সাথে যুক্ত হয়েছিল, তখন ভারত ও কাশ্মীরের নেতৃবৃন্দের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে জম্মু ও কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছিল।

এই সংযুক্তির শর্তাদিতে একমত হতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আর কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর পাঁচ মাস (মে থেকে অক্টোবর, ১৯৪৯) সময় লেগেছিল। বিশিষ্ট সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ এ জি নুরানি তার ‘আর্টিক্যাল ৩৭০: অ্যা কন্সটিটিউশনাল হিস্টোরি অব জম্মু অ্যাণ্ড কাশ্মীর’ শীর্ষক লেখায় দুই নেতার মধ্যে বিনিময় হওয়া সবগুলো যোগাযোগ বার্তাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন।

আগস্ট ২০১৯: নবায়িত সন্ত্রাসের রাজত্ব

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত অঞ্চল হলো কাশ্মীর। যদিও কোন সরকারী হিসেব নেই, তবে বেসরকারী হিসেব অনুযায়ী বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থায় আট লক্ষাধিক সেনাকে জম্মু ও কাশ্মীরে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

ভারত সরকার জানতো যে, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়া হলে সেটা ব্যাপক অজনপ্রিয় হবে, এবং এটাকে কেন্দ্র করে সড়কে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। এ জন্য উপত্যকা জুড়ে অতিরিক্ত ২০০ কোম্পানি সেনা এখানে মোতায়েন করা হয়, যাতে যে কোন ধরনের ভিন্নমতকে দমন করা যায়।

২ আগস্ট সংবিধান সংশোধের তিন দিন আগে, অমরনাথ যাত্রা বাতিল করা হয় এবং দেশী বিদেশী সকল পর্যটককে উপত্যকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

সারা উপত্যকায় বড় ধরনের ষাঁড়াশি অভিযান চালানো হয় এবং রাজনীতিবিদ, যুবক, ধর্মীয় নেতা, সমাজ কর্মী, ব্যবসায়ী, আইনজীবীসহ প্রায় ১০ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়।

এমন একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল য়ে, রাস্তায় বিক্ষোভ দমন করতে সশস্ত্র বাহিনীকে সব ধরনের কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে ‘গুলি করে মানুষ মারতেও’ তাদের কোন বাধা নেই।

নীরবতার কণ্ঠস্বর

এবং যখন মনে হয়েছে যে একটা রক্তপাতের সময় সামনে অপেক্ষা করছে, কাশ্মীরের মানুষ তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছে এবং সরকারের সব পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে দিয়েছে। সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য তারা নীরবতাকে বেছে নিয়েছে। কিছু কিছু সময় নীরবতা কণ্ঠস্বরের চেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে। অন্তত এই ক্ষেত্রে, সেটা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। একটা চরম প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে আচরণ করতে হয়, সে ব্যাপারে সাধারণ কাশ্মীরীদের পরিপক্কতা আর প্রজ্ঞাটাও এখানে উঠে এসেছে।

গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আবেগপ্রবণ ইস্যুগুলোতে রাস্তায় নেমে আসার জোরালো ইতিহাস রয়েছে কাশ্মীরীদের। ২০০৮ সালে বনভূমির জমি অমরনাথ শ্রিন বোর্ডকে বরাদ্দের প্রতিবাদে হাজার হাজারর মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং এ সময় প্রায় ৬০ জন নিহত হয় এবং শত শত মানুষ আহত হয়। ২০১০ সালে বন্দী অবস্থায় কাশ্মীরের তিন যুবককে হত্যার প্রতিবাদে যে বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।

কিন্তু এবার উপত্যকার মানুষ পুরোপুরি ভিন্নভাবে – নীরবতা অবলম্বন করে সরকারের পরিকল্পনা পাল্টে দিয়েছে।

“ও যো সামঝে থে তামাশা হো গা

মেই নে চুপ রেহ কে পালাট ডে বাজি”

(তারা ভেবেছিল যে, পুরো দিনটাই তাদের হবে। কিন্তু নীরব থেকে আমি পরিস্থিতি উল্টাদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছি)।

নীরবতার মাধ্যমে যেভাবে পরিস্থিতি পালটে দিয়েছে কাশ্মীরীরা

এই পদক্ষেপে সবাই মানসিক আঘাত পেয়েছে কিন্তু এর পরও চুপ থাকার পেছনে দুটো প্রধান কারণ রয়েছে।

প্রধান কারণ হলো তথ্য/যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর লকডাউন। তথ্যের প্রবেশ ও নির্গমণ বন্ধ করে সরকার সংবাদের সকল উৎসগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে এবং সেটুকুই শুধু প্রকাশিত হচ্ছে, যেটুকু সরকার চাচ্ছে। ইন্টারনেট, টেলিফোন এবং তথ্যের অন্যান্য উৎসগুলো মৃত হয়ে পড়েছে এবং রাস্তায় নজিরবিহীন কারফিউ বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। এমনকি কাছাকাছি থাকা প্রতিবেশীরাও একে অপরের নিরাপত্তার খোঁজ-খবর নিতে পারছে না।

পুরো উপত্যকাকে এখন একটা বড় কারাগার মনে হবে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। এ সময় একটা সম্মিলিত প্রজ্ঞা কাজ করেছে এবং কেউ কিছু করতে চায়নি, বিশেষ করে যেখানে তথ্যের প্রবাহ ও যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। কারণ এ অবস্থায় যা-ই করা হোক, সেটা কেউ জানবে না। কাশ্মীরের এই নীরবতাই তাকে বেশি দিয়েছে, যেটা হয়তো অন্যভাবে অর্জন করা যেতো না।

এটা বিশ্বের নজর কেড়েছে এবং ভারত সরকার পিছু হটেছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি, চীন ও ফ্রান্স (আংশিকভাবে), মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং ওআইসির কাছে ভারত সরকার কাশ্মীরের লকডাউন নিয়ে বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখিন হয়েছে।

কাশ্মীরকে ফিলিস্তিনে রূপান্তরের পরিকল্পনা

কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, কাশ্মীরের জনগণ সাধারণভাবে ভারতের পদক্ষেপের ব্যাপারে উদাসীন। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর যে মানসিক আঘাত তারা পেয়েছে, তাতে তাদের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে। মানুষের মনে সাধারণভাবে এই অনুভূতি জন্মেছে যে, দিল্লীর ক্ষমতাসীনরা কাশ্মীরের জনসংখ্যার চেহারা বদলে দিতে চায়। তাদের অভিন্ন ধারণা হলো ‘আরেকটি ফিলিস্তিন তৈরি হচ্ছে এখানে’।

এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে। ভারত সরকার তিন লক্ষাধিক পশ্চিম পাকিস্তানী শরণার্থীকে জম্মুর অধিবাসী ঘোষণা করেছে – যাদের সবাই হিন্দু। তাছাড়া কাশ্মীরে প্রায় সাত থেকে আট লাক নিরাপত্তা কর্মী এবং ছয় লক্ষাধিক অভিবাসী শ্রমিক রয়েছে। এমন আশঙ্কাও রয়েছে যে, এদের অনেকেই নতুন আইনে এখানকার স্থানীয় হিসেবে গণ্য হবে।

ভারত সরকার একই সাথে জম্মু অ্যাণ্ড কাশ্মীর প্রপার্টি রাইটস টু স্লাম ডুয়েলার্স অ্যাক্টের নামও বদলে দিয়েছে এবং সেখানে ‘স্থায়ী বাসিন্দার’ যে উল্লেখ ছিল, সেটা মুছে দিয়েছে। ফলে অস্থানীয় বস্তিবাসীরাও এখানে সম্পদের অধিকার পেয়ে গেছেন।

এই সব কিছু মিলিয়ে কাশ্মীরের জন্য একটা অস্বস্তিকর ভবিষ্যতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সাউথ এশিয়ান মনিটর