হেফাজত আন্দোলন : আল্লামা বাবুনগরীর গ্রেফতার ও জেল জীবনের অজানা স্মৃতি

জুনাইদ আহমদ


৫ ই মে গভীর রাতে তাহাজ্জুদের সময় নামাযরত, জিকিরত নবীপ্রেমিক তৌহিদী জনতার উপর ইতিহাসের নিকৃষ্টতম বর্বরতা চালিয়েছিল আওয়ামী প্রশাসন।গুলির মুহুর্মুহু আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল মতিঝিলের শাপলা চত্বরের আকাশ-বাতাস।

ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সাথেই স্টেজে ছিলেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহু।নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে তিনি কোথাও যেতে রাজি হননি। চতুরদিক থেকে যখন বুলেটের বুক কাঁপানো আওয়াজ আসছিলো তখনো আল্লামা বাবুনগরী স্টেইজেই। আগ থেকেই ওজু করে পবিত্র অবস্থায় ছিলেন তিনি। মৃত্যু হলে শাপলা চত্বরেই হবে, প্রয়োজনে শাহাদাত বরণ করবেন কিন্তু নেতাকর্মীদের রেখে নিজে কেথাও যাবেন না। আহ! উম্মাহর কি দরদি একজন নেতা। হ্যাঁ! প্রকৃত একজন নেতা এমনি হওয়া চাই। যিনি নিজের নিরাপত্তার উপর কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববেন।

শাপলা চত্বরের অবস্থা মুহুর্তের মধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করলো । বুলেটের আঘাতে শাপলার জমিনে লুটিয়ে পড়ছিল নবীপ্রেমিকদের দেহ। প্রায় কোটি মানুষের বিশাল জমায়েত ,চাইলেই কি মুহুর্তের মধ্যে স্থান ত্যাগ করা যায়? জল কামান,বুলেট ও লাঠিচার্জে দিকবেদিক ছুটতে হয়েছে নবীপ্রেমিকদের।

এ পরিস্থিতিতে কিছু নেতাকর্মী আল্লামা বাবুনগরীকে স্টেইজ থেকে নামিয়ে একটি মসজিদে নিয়ে গেলেন।যাওয়ার পথে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলেন আল্লামা বাবুনগরী । এক সাক্ষাৎকারে হুজুরকে বলতে শুনেছি-হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে যাওয়ার পর দৌড়াদৌড়ির মধ্যে প্রায় দেড়’শ থেকে দুই’শ মানুষ আল্লামা বাবুনগরীর গায়ের উপর দিয়ে অতিক্রম করেছিল। তখন আল্লামা বাবুনগরীর দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। প্রাণ বের হয়ে যাবার উপক্রম। তিনি কালেমা পড়ছিলেন…। আল্লাহ তায়া’লার অশেষ রহমতে তিনি বেঁচেছিলেন সেদিন।

সামান্য পথ অতিক্রম করার পর বিদ্যুতের বিশাল এক তার ছিড়ে আল্লামা বাবুনগরীর গায়ে পড়লো। হায়, মসিবতের পর মসিবত। পুরো শরীর কারেন্ট হয়ে গেলো।যেই আল্লামা বাবুনগরীকে ধরছিল তাকেই কারেন্ট শক করছিল। এই মহা বিপদেও আল্লাহ তায়া’লা গায়েবী নুসরত করেছেন,বাঁচিয়েছেন।

আল্লামা বাবুনগরীর উভয় হাটুতে তখন বেশ জখম।গায়ের কাপড় ছিড়া, চোখে ছিল না চশমাও। দেড়শ থেকে দুইশ মানুষ কারো গায়ের উপর দিয়ে অতিক্রম করলে সেই মানুষটার অবস্থা কী হয় তা সহজেই অনুমেয়।

যাক, কোনোমতে আল্লামা বাবুনগরীকে একটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখান থেকে নেওয়া হলো হসপিটালে। তখন বাইরের পরিস্থিতি খুবই নাজুক। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আল্লামা বাবুনগরীকে এ্যাম্বুল্যান্সে লালবাগ মাদরাসায় নিয়ে গেলেন কর্মীরা।দেশবাসীর সামনে সে রাতের বাস্তবচিত্র তুলে ধরে সাংবাদিক সম্মেলন করতে চাইলেন তিনি। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হলো না।

৬ মে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম আসার উদ্দেশ্যে লালবাগ মাদরাসা থেকে বের হলেন তিনি। প্রায় ২০০ গজ অতিক্রম করার পর ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হলো আল্লামা বাবুনগরীকে। ডিবি পুলিশ আল্লামা বাবুনগরীকে তার বহন করা গাড়ি থেকে নামিয়ে তাদের (ডিবির) গাড়িতে উঠিয়ে নিলো।

বয়োবৃদ্ধ এ মুহাদ্দিসকে রিমান্ডের পর রিমান্ড দেওয়া হলো। হেফাজত আন্দোলনে কেবলমাত্র বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া-সাল্লাম এর ইজ্জত রক্ষায় আল্লাহ তায়া’লার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য-ই ত্যাগ তিতিক্ষা করেছিলেন তিনি। তাই আজও জেল জীবন,রিমান্ড ইত্যাদি বিষয়ে মুখ খুলে তেমন কিছুই বলেন না আল্লামা বাবুনগরী।

একদিন কথা প্রসঙ্গে জেল জীবনের স্মৃতিচারণ করে বড় আফসোসের সাথে আল্লামা বাবুনগরীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছিলেন- গ্রেফতার হওয়ার পর আমার শারীরিক অবস্থা বিশেষ করে পায়ের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছিলো। দাঁড়াতে খুবি কষ্ট হতো। দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারতাম না। তাই জেলখানায় একদিন বসে নামায পড়ার জন্য আমি একটি চেয়ার চেয়েছিলাম।কিন্তু! সেদিন নামাযের জন্য একটি চেয়ার দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছিল-আপনি আসামি। আসামির জন্য আবার চেয়ার কিসের ? আহ!

স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এসব ত্যাগস্বীকার করেছেন। তাই হয়ত আল্লামা বাবুনগরী জেল জীবনের দুঃখ কষ্ট বলেন না। বললে জানতে পারতাম যে, ওই বন্দিশালায় আল্লামা বাবুনগরী কতই না জুলুম সহ্য করেছেন! না জানি কত অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন জগদ্বিখ্যাত এ মুহাদ্দিস।

হেফাজত আন্দোলনে তার সকল ত্যাগ তিতিক্ষা আল্লাহ তায়া’লা কবুল করুন এবং সুস্থতার সহিত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহুকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন, আমীন।