ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীকে নিয়ে কটাক্ষ; আইনি নোটিশ পেয়ে ক্ষমা চাইলেন জ ই মামুন

ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘কটাক্ষ’ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আইনি নোটিশ ও তীব্র সমালোচনার চাপে ক্ষমা চেয়েছেন সাংবাদিক জ. ই. মামুন।

এটিএন বাংলার সাংবাদিক জ. ই মামুন শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘গালি’ হিসেবে উল্লেখ করে স্ট্যাটাস দেন।

মামুন তার নিজস্ব ফেইসবুক আইডিতে স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘এখন কাউকে গালি দিতে হলে বলা যাবে- তুই একটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।’

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এমন কি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক এক মহাপরিচালক জ. ই. মামুনের লেখার নিন্দা জানিয়ে স্ট্যাটাস দেন।

রোববার উকিল নোটিশ পাঠান জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুজন দত্ত। রোববার সন্ধায় ক্ষমা প্রার্থনা করেন জ. ই মামুন।

এদিন আইনজীবী গোলাম মহিউদ্দিন আহমেদ স্বপনের মাধ্যমে ছাত্রলীগ নেতা সুজন দত্ত উকিল নোটিশ পাঠান। ওই নোটিশে আগামী ১০ দিনের মধ্যে জ. ই মামুনকে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে স্ট্যাটাসটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় প্রচলিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে ইউনির্ভাসিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ট্রেজারার ও মাউশির সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর ফাহিমা খাতুন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে জ. ই মামুনের লেখার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ওই লেখায় তিনি জ. ই মামুনকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে উল্লেখ করেন। ফাহিমা খাতুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য র. আ. ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর স্ত্রী।

এদিকে জ.ই. মামুনের কাছে পাঠানো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুজন দত্তের নোটিশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে তুলে ধরে বলা হয়, উনার এই স্ট্যাটাসের কারণে অনাকাঙ্খিত পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কারও কোনো ক্ষতি হলে দায়ভার তাঁকেই নিতে হবে।

নোটিশ পাওয়ার পর তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংসদ সদস্যগণের সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চাইতে হবে। পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৩২ লাখ মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে হবে।

মাউশির সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর ফাহিমা খাতুনের স্ট্যাটাসে বলা হয়, ‘ওস্তাদ আল্লাউদ্দিন খাঁ, ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অদ্বৈত মল-বর্মণ, ব্যারিস্টার আব্দুল রসুলের স্মৃতিবিজড়িত ব্রাহ্মণবাড়িয়া আমার বাড়ি বলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি, গর্ববোধ করি। জানাজার লাখো মানুষ দেখে যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে গাল দেন, তাদের আমি ভদ্র ও প্রগতিশীল ভাবতে পারছিনা। কেননা জানাজায় শুধু এলাকার মানুষ নয়, আশে পাশের জেলা থেকেও মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্ররা সমবেত হয়েছিল। করোনায় এর প্রভাব ভয়াবহ হবে, সন্দেহ নেই। তাই অবশ্যই এটি নিন্দনীয়। কিন্তু এর দায় লকডাউনে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর নয়। হয়তো আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এত বড় জমায়েত হওয়ার আগে উৎস মুখে আটকে দিতে পারত। তবে আবারও বলছি অন্যত্র হলেও এমনটিই ঘটত। তাই যে বা যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে গাল দিচ্ছেন, তাদের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমি মনে করি, সাংবাদিক জাতির বিবেক। তাঁকে কিছু বলার আগে এই বিষয়টি অবশ্যই ভাবতে হবে। একজন জ.ই মামুন পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে গাল দিতে পারেন না।’

রোববার সন্ধায় জে.ই মামুন তার ফেইসবুক স্টেটাস দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। নিচে জ.ই মামুনের স্টেটাসটি তুলে ধরা হলো-

‘ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাঃ

করোনা ভাইরাস নিয়ে দেশের এই ঘোর বিপদের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গতকাল একজন ইসলামি চিন্তাবিদের জানাজাকে কেন্দ্র করে যে বিপুল জনসমাগম ঘটেছে, তা আমার মতো প্রতিটি সচেতন নাগরিককে উদ্বিগ্ন করেছে। বিষয়টি জানা এবং ভিডিওসহ ছবি দেখার পর আমি প্রকৃতই ঘটনার আকস্মিকতায় এতটা ক্ষুব্ধ এবং হতাশ হয়ে পড়েছিলাম যে, কি বলবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই রাগে দুঃখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শব্দটিকেই একটি গালি হিসেবে মন্তব্য করেছিলাম। কিন্তু আমার ভেতরে ওই জেলার প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই বা সেখানকার একজন মানুষের সঙ্গেও কোনো ঝগড়া বিবাদ নেই। বরং দু’বছর আগেও সেখানকার পুলিশ সুপারের আমন্ত্রণে ওখানে প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদের এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এসেছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অদ্বিতীয় ছানামুখী অনেকের মতো আমারও ভীষণ প্রিয়। আমি জানি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব থেকে শুরু করে বহু কৃতি মানুষের জন্মস্থান। আমার সাংবাদিকতা জীবনের খুব শুরুতে, সম্ভবত ৯৩/৯৪ সালে হবে, এক কিশোরী ধর্ষণের রিপোর্ট করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েছিলাম। সেই সময় স্বপ্নাহার ধর্ষণ মামলা বাংলাদেশে অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তারপর থেকে বহুবার বহু উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েছি, সেখানকার মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছি।

কিন্তু পাশাপাশি এটিও সত্যি যে সেই প্রগতিশীল আধুনিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি অন্ধকার পিঠও আছে। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, কূপমন্ডুকতা এবং হিংসা বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়াকেও গ্রাস করেছে। যার প্রমান দেশের মানুষ গতকাল দেখেছে, আমিও দেখছি।

বস্তত আমার কোনো অঞ্চল বিদ্বেষ যেমন নেই, তেমনি অঞ্চল প্রীতিও নেই। আমি বাংলাদেশের সন্তান কিন্তু বিশ্ব নাগরিক হিসেবে নিজেকে চিন্তা করি। কালকের ঘটনার বীভৎসতা আমাকে ওই স্যাটায়ার বা প্রহসন করতে উৎসাহিত করেছে। একদিন পরে এসে দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেকে এটাকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে আমাকে এবং আমার পরিবারকে পর্যন্ত কুৎসিত এবং অশ্লীলতম ভাষায় আক্রমন করেছেন, কেউ কেউ আমাকে হত্যা করতে চেয়েছেন এবং অনেকে আহত করার হুমকিও দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে ব্যাপারটা আমার কাছে চরম অস্বস্তির পর্যায়ে চলে গেছে। আমার বোঝা উচিত ছিলো, সমস্যাটা কোনো বিশেষ এলাকার নয়, গোটা জাতির। সেজন্যেই কবিগুরু শতবর্ষ আগে বলে গেছেন- “রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।” ব্রাহ্মণবাড়িয়া তাই তার বাংলাদেশের বাইরে নয়। আমরা সবকিছু ব্যক্তিগতভাবে নিতে পছন্দ করি, আমরা নিজের দেশ বলতে শুধু জেলা বা উপজেলাকে বুঝি, আমরা নিজের এলাকাকে, নিজের সন্তানকে, নিজের ধর্মকে, নিজের বুদ্ধিকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করি। আমরা রসিকতার জবাবে অশ্লীলতা, গালাগাল বুঝি। এগুলো আমার জানা। তবু নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া মানুষদের কাছে ক্ষমা চেয়ে আমার বক্তব্য প্রত্যাহার করলাম। সবার মঙ্গল হোক।’