দুর্নীতি, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | রাষ্ট্রচিন্তক ও গবেষক


অতীত ইতিহাসটা দেখলে প্রমাণিত হয়, শাসকদল হিসাবে আওয়ামী লীগ কখনও দুর্নীতিমুক্ত ছিলো না। যে যুগটাকে আজকের সরকার-প্রধান শেখ হাসিনা দেশের স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করেন, অর্থাৎ, তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল–সেটার দিকে তাকালেও দেখা যায় দুর্নীতিতে ভারাক্রান্ত দেশের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে খোদ শেখ মুজিবুর রহমানেরই তীব্র বিষোদগার। তাঁর ভাষণে তিনি যেমন তার দলকে ‘চাটার দল’ বলেছেন; ‘চোরের দল’ বলেছেন তেমনি আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দেয়ার কথাও বলেছেন। ১৯৭৩ সালের ১লা জুলাই দৈনিক পূর্বদেশের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয় কুষ্টিয়ার এক জনসভায় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের তীব্র হুঙ্কার। কিন্তু এত্তোসবেও দুর্নীতি দূর করতে পারেননি তিনি। কারণ, দুর্নীতিবাজরা ছিলো তাঁরই আশেপাশে। ঐ সময়ের সেরা ও আলোচিত দুর্নীতিবাজ গাজী গোলাম মোস্তফার কথা প্রবীণদের মনে থাকার কথা। অথচ এ গোলাম মোস্তফাই ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের কাছের মানুষ। তাকে কে ভাগাবে? এসব দলীল-দস্তাবেজ থেকে দেখা ঐতিহাসিকভাবে শাসকদল হিসাবে আওয়ামী লীগ দুর্নীতিপরায়ন।

এবার শেখ হাসিনার শাসনে আসছি। তার শাসনামলের দুর্নীতি নিয়ে বিরোধীদল বিএনপি’র অভিযোগ অনেক আগের। কিন্তু শেখ হাসিনা কখনোই ওগুলোকে পাত্তা দেননি। উল্টো তিনি বিএনপি’র বিরুদ্ধেই দুর্নীতির পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন। অবশ্যই বিএনপি’র শাসনে দুর্নীতি ছিলো কিন্তু আওয়ামী লীগও তো সেটা থেকে পবিত্র ছিলো না। এখন শেখ হাসিনার কথিত শুদ্ধ অভিযান থেকে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বিএনপি’র অভিযোগ ভিত্তিহীন ছিলো না। শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের মতো দুর্নীতিবাজরা যে শেখ হাসিনার আশেপাশে অবস্থান নিয়েছে, তা এখন পরিস্কার। তবে শুদ্ধি অভিযানের পরিধি কতোটুকু প্রশস্ত হবে, তা এ মহূর্তে বলা মুশকিল। এখন খবর প্রকাশিত হচ্ছে, খোদ মন্ত্রীসভাতেও দুর্নীতিবাজদের অবস্থান। তাই যদি হয়, শেখ হাসিনা কি পারবেন বহু পুরনো দিনের বৃক্ষের গোড়ায় কুড়াল চালাতে? ভু্লে গেলে চলবে না, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার কারণেই শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীদিবাজরা একট্টা হয়ে গিয়েছিলো গোপনে এবং সরকার পরিবর্তনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলো। এখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও তার কাছের দুর্নীতিবাজরা একাট্টা হয়ে ষড়যন্ত্র করবেন–তা আশি ভাগ নিশ্চিত। এসব কি শেখ হাসিনা সামাল দিতে পারবেন? চীনের সাথে শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় যোগাযোগে ভারত ভীষণ ক্রুদ্ধ। ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলো, স্বার্থের প্রশ্নে ভারত অত্যন্ত নির্মম। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ইসলামাবাদে ইসলামী দেশগুলোর সম্মেলনে যোগ দেয়া, ১৯৭৪ সালে ঢাকায় ভুট্টোকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া ও সাহায্যের জন্য মার্কিন বলয়ে যোগাযোগের কারণে ভারত শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয় এবং ১৯৭৫ সালে মুজিব হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করে। ঠিক এক-ই ভাবে আজকে শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযানে যে গোপন ষড়যন্ত্রকারী দল তৈরি হচ্ছে, ভারত যে তাকে কাজে লাগাবে না, সেটার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? বরঞ্চ বলা যায়, ভারত উপরে যাই বলুক, যাই দেখাক, ষড়যন্ত্র করবেই। ভারতের ঐতিহাসিক খাসলত অন্তত সেটার-ই ইঙ্গিত দেয়।

তাই এখন বলতে হয়, বর্তমানের শুদ্ধি অভিযান শেখ হাসিনার জন্য বাঁচা-মরার চ্যালেন্জ। হয় তাকে যুদ্ধ করে বাঁচতে হবে, নয় তো মরতে হবে। আমরা চাই, শেখ হাসিনা শেষতক জয়ী হোন, দেশ ও জাতির দুশমন দুর্নীতিবাজদের মুখোশ খসে পড়ুক; দেশ দুূনীতিমুক্ত হোক, জনগণ শান্তি পাক। জালিমরা শাস্তি পাক, মাজলূমরা বিচার পাক।