পার্বত্য শান্তি চুক্তির আজ ২২ বছর পূর্তি

ডিসেম্বর ২, ২০১৯ বিশেষ প্রতিবেদন

আজ থেকে ২২ বছর আগে সংঘাতময় পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্পাদিত হয়েছিল শান্তিচুক্তি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শান্তি পাহাড়ে আজও অধরা। প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হচ্ছে পাহাড়। গত ছয় বছরে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ও উপদলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক ও জাতিগত বিরোধে খুন হয়েছেন ৩২১ জন।

দীর্ঘ সশস্ত্র লড়াইয়ের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে বাংলাদেশ সরকারের শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। চুক্তি সইয়ের ২২ বছর পূর্তি আজ।

তবে চুক্তির মূল ধারাগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে বেড়েছে অবিশ্বাস, টানাপোড়েন আর শঙ্কা। পাহাড়ের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে নানা হতাশা ও উৎকণ্ঠা। সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি নেই বলেও অভিযোগ তাদের। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সইয়ের দুদশক পেরিয়ে গেলেও, চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অভিযোগ পাহাড়িদের।

পার্বত্য চারটি আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএএসএস-মূল), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) এর কাছে চার হাজারের বেশি অস্ত্র রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে একটি জাতীয় দৈনিকে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৫৪টি রকেট লঞ্চার, ৬৪১টি এসএমজি ও বিভিন্ন ধরনের রাইফেল ৫৯৪টি ও চার শতাধিক দেশি পিস্তল ও বন্দুক। এ ছাড়া হাত বোমা ও মর্টার শেল রয়েছে কয়েকশ’।

গোয়েন্দাদের দাবি জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) কাছে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে। এ সংগঠনগুলো বছরে ৪০০ কোটি টাকার ওপরে চাঁদা তোলে। ঠিকাদারি ব্যবসা, জিপ চালানো, নৌকা, ট্রলার, বনের কাঠ, পাথর উত্তোলন থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে চাঁদা তোলা হয়। পাহাড়ে বিভিন্ন সংঘাতে গত ছয় বছরে ৩২১ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ২০৭ জন এবং বাঙালি ১১৪ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৫৪ জন, ২০১৫ সালে ৬৯ জন, ২০১৬ সালে ৪১ জন, ২০১৭ সালে ৩৩ জন, ২০১৮ সালে ৬৮ জন এবং ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৫৬ জন খুন হয়েছেন।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১৮ সালে। সে বছরের ৩ মে ইউপিডিএফের (মূল) হামলায় জেএসএস (সংস্কার) সমর্থক নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা নিহত হন। একদিন পর শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে ইউপিডিএফ (মূল) হামলা চালিয়ে ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাসহ পাঁচজনকে হত্যা করে।

জানা যায়, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের প্রাক্কালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ি জনগণের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচিতির স্বীকৃতি সম্পর্কিত কতিপয় দাবি পেশ করেন। পাহাড়ি জনগণের দাবি মেনে নিতে সরকারের ব্যর্থতার ফলে তাদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যোগ হয় শান্তি বাহিনী নামে একটি সামরিক শাখা।

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড জনসংহতি সমিতির ইতিহাসে এক সঙ্কটময় অবস্থার সূচনা করে। লারমা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে শান্তি বাহিনী সামরিক দিক থেকে অধিকতর সংগঠিত হয়। এর সদস্য সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। এরূপ অভিযোগ রয়েছে যে, শান্তি বাহিনী ভারতের ত্রিপুরায় ঘাঁটি স্থাপন করে সেখান থেকে অভিযান পরিচালনা করে। ১৯৭৭ সালে তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি সাঁজোয়া বহরের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ হামলার পর সেনাবাহিনী ঐ অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে ২৪তম ডিভিশনের জিওসির অধীনে আনা হয়। এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।

বিশ শতকের আশির দশক থেকে জনসংহতি সমিতি জুম্ম জাতীয়তাবাদ নামে পাহাড়ি জনগণের একটি নতুন পরিচিতি তুলে ধরে। এতে দাবি করা হয় যে, পার্বত্য এলাকার ১৩টি পৃথক জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে জুম্ম জাতি গঠিত। সংখ্যাগরিষ্ঠের কর্তৃত্বের মোকাবেলায় পাহাড়ি জনগণকে একই পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে এই নামকরণ করা হয়। এ নতুন জাতি গঠনের লক্ষ্য ছিল পাহাড়িদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং উপজাতি ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস। জনসংহতি সমিতি তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দানেরও দাবি জানায়।