মেগা প্রকল্পে জমি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় আব্দুর রহিম আল হুওয়াইতিকে হত্যা করেছে সৌদি সরকার

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | নাহিয়ান হাসান


সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ এর মেগা প্রকল্প নিউম (এনইওএম) এ জমি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম আব্দুর রহিম আল হুওয়াইতিকে হত্যা করেছে সৌদি সরকার।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) আবদুর রহিম আল হুওয়াইতি একটি মেগা-প্রকল্পের জন্য নিজের সম্পত্তি দিতে অস্বীকার করার পরে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী তাকে গুলি করে হত্যা করেছে।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) সৌদি টিভি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তাবুক প্রদেশের বসবাসকারী আবদুর রহিম আল-হুওয়াইতি একজন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী’ যিনি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে গুলি পাল্টা গুলিতে নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি একটি ভবনের উপর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি করা শুরু করেছিলেন। যখন তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে মোলোটভ ককটেল ও গুলি নিক্ষেপ করা শুরু করেন তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পালটা গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল। যার ফলে দু’জন নিরাপত্তারক্ষী আহত ও তার নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

লোহিত সাগরের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের খ্রেইবাহ শহরের সৌদি নাগরিক আল-হুওয়াইতি সোমবার নিজের একটি ভিডিও প্রকাশ করে তাতে বলেছিলেন যে, তাকে এবং অন্যান্য নাগরিকদেরকে সরকার কর্তৃক চাপ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা তাদের সম্পত্তি হস্তান্তর করে বিনিময়ে আর্থিক ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে।এমনকি তিনি আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যে হয়তা এব্যাপারে সৌদি সরকার মিশরীয় স্বৈরশাসক জেনারেল সিসির মিশরীয় ফর্মুলা গ্রহণ করতে পারে।

পরবর্তীতে বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত হতে অস্বীকার করায় এবং সন্ত্রাসবাদ ও অস্ত্র বহনের অভিযোগে অভিযুক্ত সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত আব্দুর রহিম আল হুওয়াইতির ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়।

তবে বিষয়টি সেখানে শেষ হয়নি। বাস্তুচ্যুতি, হত্যা ও নির্যাতনের মিশরীয় সংস্করণ সম্পর্কে আল-হুওয়াইতির ভাষাগুলি মিশরীয় কর্তৃপক্ষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, কয়েক বছর আগে ইতালীয় পণ্ডিত গিয়ুলিও রেগেনি হত্যার ব্যাপারে একই গল্পের কথা বলা হয়েছিল মিশরে। পাশাপাশি সিনাইয়েও একই কায়দায় বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। যা রাজনৈতিক স্বার্থ এবং প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ঠান্ডা মাথায় খুনের শত শত ঘটনার মতোই অনন্য ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে।

সাধারণত এসকল হত্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সরকার পক্ষ তার বিপক্ষে সন্ত্রাসী, দেশদ্রোহী ইত্যাদি অভিযোগ আনতে থাকেন।

হুওয়াইতি হত্যাকান্ড ও মৃত্যুর পূর্বে ধারণ করা তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে তুমুল বিতর্কের মুখে পরে সৌদি সরকার। এবং এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে সরকার দলীয় ও নির্দলীয় লোকজন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আল-হুওয়াইতির মৃত্যুর গল্পটি জনমত গঠনের বিষয় হয়ে ওঠে এবং এই সময় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তার প্রকল্প ‘NEOM’কে একটি নতুন ঝড়ের সাথে তুলনা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় টুইটকারীরা এর নিন্দা জানান।

সৌদি কর্তৃপক্ষ এই বছরের শুরুতে ‘এনইওএম’ শহরটি নির্মাণের ঘোষণা করেছিল। যা ভিশন ২০৩০ এর অংশ হিসেবে যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান ঘোষণা করেছিলেন। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। এবং এটি ২৬ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত।

এই অঞ্চলে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ বসবাস করেন, যাদের বেশিরভাগ আল-হুওয়াইতাত গোত্রের। এই বিশাল গোত্রটির বসবাস জর্ডান, ফিলিস্তিন, মিশর এবং সৌদি আরব জুড়ে বিস্তৃত।

এক বিবৃতিতে ব্রিটেনে আরব অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস, সৌদি সরকার কর্তৃক স্থানীয় বাসিন্দাদের জোর করে বাস্তুচ্যুত শুরু করার ব্যাপারে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা উল্লেখ্য করেছে যে বাস্তুচ্যুতদের বেশিরভাগই ‘এনইওএম’ প্রকল্পের কাঠামোয় আল-হুওয়াইয়াত উপজাতির অন্তর্ভুক্ত।