প্রধানমন্ত্রী এখন কী করবেন? (দ্বিতীয় অংশ)

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক


[দ্বিতীয় অংশ]

তৃতীয়ত: ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার চর্চা। এ বিষয়টি একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কতোটা ক্ষতিকর, তা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার চর্চা যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মধ্যে বিকেন্দ্রিকরণের প্রতি অশ্রদ্ধা ও ক্ষমতার অপব্যাবহারের প্রতি আসক্তির জন্ম হয়। যেমন, এখন দেশে মন্ত্রী থেকে দলীয়—সকল নেতারাই একবাক্যে বলছেন, নেত্রীর (শেখ হাসিনা) নির্দেশনাতেই দেশ চলছে। অবশ্যই তিনি যখন ক্ষমতায় আছেন, তাঁর দিকনির্দেশনা তো লাগবেই। কিন্তু সকল বিভাগে থেকে যদি এ ধরনের শব্দ উচ্চারিত হয়, তখন বুঝে নিতে হয়: গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক। এখানে একব্যক্তির শাসনের অস্তিত্ব উঠে আসে। ফলে, জনগোষ্ঠীর সরকার দলীয় অংশ ও প্রশাসনে জবাবদিহিতার চাপ কমতে থাকে এবং প্রত্যেকেই ক্ষমতার অপব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এ ধরনের একটি সংস্কৃতির চিত্র এখন আমরা দেশে দেখতে পাচ্ছি।

চতুর্থত: একদলীয় সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যাকে ইংরেজিতে বলা হয়: A one-party system বা State. সংজ্ঞায় বলা হয়: A one-party system is a form of government where the country is ruled by a single political party, meaning only one political party exists and the forming of other political parties is forbidden. Some countries have many political parties that exist, but only one that can by law be in control. This is called a one-party dominant state. In this case opposition parties against the dominant ruling party are allowed, but have no real chance of gaining power. (Wikipedia) অর্থাৎ, একটি এক-দলীয় ব্যবস্থা হ’ল একধরণের সরকার যেখানে দেশটি একটি একক রাজনৈতিক দল দ্বারা শাসিত হয়, যার অর্থ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল বিদ্যমান এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল গঠন নিষিদ্ধ। কিছু দেশে অনেক রাজনৈতিক দল বিদ্যমান রয়েছে , তবে আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে একটি মাত্র দল। একে বলা হয় একদল-শাসিত রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলিকে গ্রহণ করা হয়, তবে ক্ষমতা অর্জনের প্রকৃত সুযোগ নেই। অনেকটা এ ধরনেরই একটি ব্যবস্থা বর্তমানে দেশে চালু রয়েছে। আমাদের দেশের ইতিহাসে ‘বাকশাল’কে এ ধরনের একটি নযীর বলে গণ্য করা হয়। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একদলীয় শাসন বা রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি বিশেষ দল বা দলের শীর্ষব্যক্তির শাসন মূখ্য হয়ে ওঠে। সেখানে অন্য কোন দল বা ব্যক্তির মতামত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। ফলে, অনিবার্যভাবে জন্ম নেয় ফ্যাসিবাদ ও স্বেচ্ছাচারিতা। এসব বিষয় বর্তমানে বাংলাদেশে পূর্ণভাবে প্রযুক্ত কি না—সে বিষয়ে না গিয়ে বলতে পারি, দেশ এখন একদলীয় শাসনব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায়, শাসকদলের সদস্যদের মধ্যে স্বভাবতই একধরনের স্বেচ্ছাচারিতার মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তারা নিজেদেরকে আইনের উর্ধে ভাবতে শিখে। বৈধ হয়ে যায় দুর্নীতি। সম্প্রতি স্বীকৃত চালচুরির বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর “ তদন্তে দেখা গেছে সে রকম কিছু ঘটেনি” মর্মে বিবৃতি সদস্যদের মাঝে উত্তরোত্তর স্বেচ্ছাচারিতাকে উসকে দেবে বলে মনে হয়।

নির্দ্বিধায় বলা যায়, উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো এখন সরকারদলীয় সদস্য ও তৃণমূল-প্রশাসনের মস্তকে ঘূর্ণায়মান। ফলে, এরা ভাবছে, জাতীয় বিষয়গুলোতে নেতৃত্ব পর্যায়ে যখন জবাবদিহিতা আশ্রয় পায়নি সেখানে ত্রাণের বিষয়ে জবাবদিহিতার ধারণা বা বিশ্বাস আমলে নেয়ার যোগ্য নয়। এখান থেকেই দুর্নীতির বটবৃক্ষের পথচলা শুরু। স্মরণযোগ্য, বিষয়গুলো আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পরের আমলের কথা বিবেচনা করলে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণগুলো শুনলে দেশব্যাপী দুর্নীতি এবং ত্রাণ চুরি ও পাচারের ভয়াবহ চিত্র সম্পর্কে ধারণা করা যায়। তিনি তাঁর ভাষণে (১৯৭৩) আওয়ামী লীগ থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দেয়ার আহ্বান জানান। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান মরহুম সিরাজুর রহমানের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারটির অডিও প্রকাশিত হয়। সেটি রেকর্ড করা হয় লন্ডনে, ১৯৭৫ সালের মে মাসে। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ষ্পষ্ট বলতে শোনা যায় যে, তাঁর কথায় দেশে ‘ফ্রি-স্টাইল দুর্নীতি’ চলছে। অডিওটি ইউটিউব থেকে যে কেউ শুনতে পারেন। দেশীয় সংবাদ-মাধ্যমে তো বটেই, আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও সে-সময়কার দুর্নীতি ও লুটপাটের কথা উঠে আসে। যেমন, বৃটেনের সানডে টাইমস ১৯৭৪ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর (দুর্ভিক্ষের সময়) তাদের এক রিপোর্টে মন্তব্য করে: In the past sale of relief goods on the black market became so common that the Intrnational committee of the Red Cross at once stage decided to withdraw from Bangladesh. ( Awami league Rule, Oasis Books 1992)। (অর্থাৎ, সে-দিনগুলোতে কালোবাজারে ত্রাণ সামগ্রীর বিক্রি এতটাই সাধারণ হয়ে পড়েছিল যে, রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটি এক পর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।) ১৯৭৩ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারী বৃটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বাংলাদেশের দুর্নীতির উপর রিপোর্ট করতে গিয়ে একজন বৃদ্ধ মানুষের হাহাকার তুলে অনে এভাবে—“ Either give us food or shoot us.” অর্থাৎ, হয় আমাদেরকে খাবার দাও, নইলে গুলি করে মেরে ফেলো (প্রাগুক্ত)।

উপরের তথ্যগুলোর সমর্থন মেলে মরহম শেখ মুজিবুর রহমানের এক ভাষণে। সেখানে তিনি তাঁর সময়ে চলমান দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে বলেন:–“……এত রক্ত দেয়ার পরে যে স্বাধীনতা এনেছি, চরিত্রের পরিবর্তন অনেকের হয় নাই। এখনও ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারী, মুনাফাখোর বাংলার দুঃখী মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দীর্ঘ তিন বৎসর পর্যন্ত এদের আমি অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, হমকি দিয়েছি—চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী। কিন্তু আর না, বাংলার মানুষের জন্য জীবনের যৌবন আমি কারাগারে কাটিয়ে দিয়েছি। এ মানুষের দুঃখ দেখলে আমি পাগল হয়ে যাই। কাল যখন আমি আসতেছিলাম ঢাকা থেকে; এত দুঃখের মধ্যেও না খেয়ে কষ্ট পেয়েছে, গায়ে কাপড় নাই, কত অসুবিধার মধ্যে বাস করতেছে হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ লোক দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেখবার জন্য। আমি মাঝে-মাঝে প্রশ্ন করি; তোমরা আমাকে এত ভালবাস কেন? কিন্তু যেই দুঃখী মানুষ দিনভর পরিশ্রম করে, তাদের গায়ে কাপড় নাই, তাদের পেটে খাবার নাই, তাদের বাসস্থানের বন্দোবস্ত নাই, লক্ষ-লক্ষ বেকার; পাকিস্তানীরা সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে, কাগজ ছাড়া আমার জন্য কিছুই রেখে যায় নাই; বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে আমাকে আনতে হয়, আর এই চোরের দল আমার দূঃখী মানুষের সর্বনাশ করে লুটতরাজ করে খায়। আমি শুধু ইমার্জেন্সি দেই নাই। এবার আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, আমি পঁচিশ বৎসর এই পাকিস্তানী জালিমদের বিরুদ্ধে জিন্না থেকে আরম্ভ করে গোলাম মোহাম্মদ, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে বুকের পাঠা টান করে সংগ্রাম করে থাকতে পারি, আর আমার ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি, তাহলে পারবো না? নিশ্চয় ইনশাআল্লাহ পারবো। এই বাংলার মাটি থেকে এই দুর্নীতিবাজ, এই ঘুষখোর, এই চোরাচালানী, এই মুনাফাখোরদের নির্মূল করতে হবে।” (১১ই জানুয়ারী ১৯৭৫, ভিডিও) উল্লেখ্য, সেদিনও কিন্তু শাসকদলীয় লোকজন ব্যাপক হারে ক্ষমতার আচ্ছাদনকে ব্যবহার করতে পেরেছিলো।

এতোক্ষণ যা বলে এলাম, তা কিন্তু আজকের এই করোনার ভয়াবহ সময়ে নযীরবিহীন ত্রাণ-চুরি ও দুর্নীতির মৌলিক কারণ অনুসন্ধানের নিমিত্ত তুলে ধরা হলো। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোন বিরূপ মনোভাব নেই। ইতিহাসের সঠিক তথ্য—যা আমাদেরকে ভবিষ্যৎশিক্ষার চাহিদা পূরণ করে, সেই শিক্ষার দৃষ্টিকোণে কথাগুলো বললাম মাত্র। এখন প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী করতে পারেন? কাদেরকে দায়ী করবেন? যদি বলি, প্রত্যেকটা দুর্নীতিবাজ ও ত্রাণচোরকে তিনি ধরেধরে শাস্তি দিয়ে জেলে পুরলেন।তা কি আদৌ সম্ভব? আর সম্ভব হলেও সমস্যার কি সমাধান আসবে? এককথায় বলবো, সবাইকে যেমন ধরে জেলে পুরাও সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব হলেও তাতে সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। আপনি শাস্তি দিয়ে হয়তো কিছুটা গতি মন্থর করতে পারবেন কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসবে না। কারণ, এটি কোন পূর্ণাঙ্গ ফৌজদারী বিধির বিষয় নয়, এটি একটি সিস্টেম বা প্রক্রিয়ার বিষয়। সিস্টেমটা গড়ে তোলা হয়েছে দুর্নীতির সুযোগ রেখে।এর জন্য যেমন রাষ্ট্রের পরিবল্পনা দায়ী তেমনি আপনার মতো শাসকেরাও দায় এড়াতে পারেন না। যে সিস্টেম রাষ্ট্রে আইনের শাসন গড়ে তুলতে অযোগ্য, বিচারে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ—সে পদ্ধতি অবশ্যই মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। আপনাকে মানতে হবে এখন বহুদলীয় ব্যবস্থার যুগ; পারস্পরিক মতবিনিময় ও সহযোগিতার যুগ এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক বিবেচনায় সবদলকে সাথে নিয়ে অবিভক্ত জাতি গঠনের যুগ—যা নিঃসন্দেহে আপনি ও পূর্ববর্তী শাসকেরা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সে কারণেই দেখা যায়, দেশের এমন পরিস্থিতিতে যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশ সবার সহযোগিতা চায় তখন বাংলাদেশ ভিন্নপথে চলছে।সমস্যার সমাধান চাইলে আপনাকে যেমন সিস্টেম পরিবর্তনে মনযোগী হতে হবে, তেমনি সব নাগরিকের সাথে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; পরিবর্তন করতে হবে রাজনৈতিক মানস।

Previous post নাকচ করল বাংলাদেশ
Next post করোনা মোকা‌বিলায় বাংলাদেশে ভারতীয় সেনার প্রয়োজন নেই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী