প্রান্তিক মানুষদের জন্য কিছু একটা করুন!

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক


বন্যা, মহামারী ইত্যাদির সময় মানুষ একে অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করার সুযোগ পায় কিন্তু করোনার মতো মহামারী যখন হানা দেয়, তখন তো আর অন্যকে সাহায্য করার প্রশ্ন করা দূরে থাক, নিজেকে রক্ষাই বড় হয়ে দেখা দেয়। আমি মফস্বলে থাকি, মফস্বলের মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়। সেদিক থেকে কিঞ্চিৎ হলেও আমি অভিজ্ঞতা অর্জন করছি প্রতিদিন।যাঁরা ঢাকাতে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদকক্ষ থেকে সংবাদ-মাধ্যমকে গ্রন্থগত মন্তব্য ছুঁড়ে শলাপরামর্শ দিচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু বাস্তবতার বাইরে থেকে দিচ্ছেন।তাঁরা না মফস্বল সম্পর্কে জানেন, না প্রান্তিক মানুষের সুখ-দূঃখের খবর রাখেন। আমাদের সরকার বাহাদুর বলেন, উযীর-নাজির বলেন—কারো সাথে প্রান্তিক মানুষের যোগাযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, যে স্বামী স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ রাখেনি, সে কি করে স্ত্রীর প্রয়োজন বুঝবে? তার ভরণ-পোষণ আদায় করবে? জাতীর উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে কিছু প্যাকেজ ঘোষণা করে রাজনৈতিক দায়িত্ব হয় তো পালন সম্ভব, কিন্তু হতদরিদ্র প্রান্তিক মানুষের জন্য বাস্তব কিছু করা অসম্ভব। একটি সরকার যেভাবেই ক্ষমতায় থাক, যতোক্ষণ গদি ধরে রাখুক, তার দায়িত্ব হলো: এ দেশের বাস্তবতায় বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাজে আসে এমন কিছু করা।

এ রোগ আসার আগে দেখতাম, নিত্যদিন সকালবেলা গরীব কৃষকেরা শাক-তরকারী বেচতে বাজারের দিকে যেতেন। ওতে তাঁদের যা কিছু পকেটস্থ হতো তা দিয়ে পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন মেটাতেন। হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনিতে রিকসা চালিয়ে দু’পয়সা রোজগার করতেন রিকসাওয়ালারা। এভাবে মাছবিক্রেতা, শব্জিবিক্রেতা—এঁদের প্রত্যেকেই হররোজ রোজগারের উপরে নির্ভরশীল। হুকুমতের বাসিন্দারা কি কালেভদ্রেও সে-সব প্রান্তিক মানুষের খবর রেখেছেন? ঢাকায় বসে যেসব সমাজবিজ্ঞানীরা লম্বা-লম্বা তত্ত্ব ছাড়ছেন—তাঁরা কি কখনও ওসব মানুষকে ক’ফোঁটা শরবত খাইয়ে জিজ্ঞেস করেছেন: তাঁদের দিনরাত কেমন কাটে? এই হলো: গ্রন্থগত বিদ্যা পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন। আজ সপ্তাহ পার হলো, সে-সব প্রান্তিক মানুষেরা ঘরবসা হয়ে আছেন। হুকুমতের কর্ণধারেরা কেউ কি জানেন তাঁরা কেমন আছেন? করোনাতে তাঁরা বাইরে বেরুতে পারছেন না, রাস্তায় আছে পুলিশ-সেনাবাহিনী। আমাদের এখানে গত হাট বসতে দেয়নি করোনা ছড়াবার আশঙ্কায়। অতএব লেনদেন হয়নি কারও।রিকসাওয়ালারা ভাড়া পায়নি; তরকারীওয়ালারা দাম পায়নি। কিন্তু তাই বলে কি প্রান্তিক মানুষের পরিবারের পেটগুলো কি সে-কথা মানছে? আতঙ্কে তাঁরা বাড়ি হতে বেরও হতে পারছেন না। তবুও সব প্রতিকূলতা পার করে ওদেরকে যেমন করোনার মতো মহামারী থেকে রক্ষার চেষ্টা করতে হবে, তেমনি ওদের নিদেনপক্ষে দু’বেলা আহারের তো ব্যবস্থা দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে নাকি এটাওটা দেবার কথা বলেছেন। জানি না তিনি প্রান্তিক মানুষের কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি কতোটুকু পৌঁছুচ্ছে—সে খবর আদৌ রাখছেন কি না। আমাদের এখানে প্রান্তিক মানুষদেরকে কিছু ডাল-চিনি-তেল দেয়া হচ্ছে বলে জেনেছি। তবে যে দেশে পদে-পদে দুর্নীতি সেখানে এ দেয়া কতোদিন চলে কেউ জানে না। আমেরিকা, কানাডা, ইতালি, বৃটেনের মতো দেশগুলোর সরকার-প্রধানদেরকে দেখছি, প্রতিদিন জনগণের জন্য সাংবাদিকদেরকে প্রতিদিনকার বিবরণী দিচ্ছেন। আর আমাদের সরকার-প্রধান দূরে থাক, মন্ত্রীরাও কোন বিবরণী দিচ্ছেন না। তারা হয় তো ভাবছেন: জনগণের প্রতি যখন জবাবদিহিতার চাপ নেই, এতো বকবক করার কী কারণ আছে? দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কথা বলতে পারবো না, আমরা যেখানে থাকি অর্থাৎ, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভায় জনপ্রতিনিধিরা কিছু কাজ করে যাচ্ছেন বলে শুনেছি। তবে, কোন মনিটরিং সেল নেই প্রতিদিনকার পরিস্থিতি তদারক করতে। এখন কোথাও কোন সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেলে, তা নজরে আনার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তৎপর হলে সতর্ক হবার পথ প্রশস্ত থাকবে। একটা মনিটরিং সেল পৌরসভায় সক্রিয় থাকলে সরকারের প্রতিশ্রুত জিনিসপত্র মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছুচ্ছে কি না—তা তদারক করাও সহজ হবে। সেলটিতে সেনাবাহিনীকে সংযুক্ত করা যেতে পারে। এমনটি দেশের প্রতিটি উপজেলায় করা যেতে পারে।

এখন দেশে গরম পড়তে শুরু করেছে। সবাই জানেন, এ সময় ডায়রিয়ার মতো রোগ বেশি ছড়ায়। আল্লাহ না করুন, এ সময় তেমন অঘটন ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে এবং ব্যাপকহারে প্রান্তিক মানুষের প্রাণহানী ঘটতে পারে। তাই, সরকারের উচিৎ, আগে থেকে এসব বিষয় মাথায় রেখে আগাম-ব্যবস্থা নিয়ে রাখা। বিশেষ করে, খাবার স্যালাইন, পথ্য ইত্যাদির সহজপ্রাপ্যতাকে নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য । এমনিতেই প্রান্তিক অঞ্চলে চিকিৎসা মানোত্তীর্ণ নয়। এখানে মানুষের দুর্বল আর অসুস্থ শরীর নিয়ে চলে একশ্রেণীর ডাক্তার ও ক্লিনিকের ব্যবসা। সেদিকটায় কারও নযর আছে বলে মনে হয় না। শাসকদলের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন নিয়ে যেটুকু হর্ষধ্বনি শোনা যায়, সে-সবের এক শতাংশও যদি মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষায় নিয়োজিত হতে দেখা যেত, তাতে আজকের মতো পরিস্থিতিতে সান্ত্বনার পরশ পাওয়া যেত। যাদের পেটে খাবার নেই, তাদেরকে অতি উচ্চমূল্যের আতর দিয়ে সুবাসিত করার যৌক্তিকতা কতোটুকু—তা কি অঙ্ক কষে বের করতে হবে?

আমাদের সরকার-বাহাদুরকে মনে রাখতে হবে, গদি ধরে রাখা হয় তো সহজ কিন্তু বিপদে জনগণের পাশে থাকা সমূহ কঠিন। এ মুহূর্তে প্রান্তিক জনমানুষের জন্য কিছু একটা করা দায়বদ্ধতার পর্যায়ে পড়ে। এমন জাতীয় বিপদে বিরোধীদলসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার যে আহ্বান জানানো সরকারের দায়িত্ব ছিলো, সেটা করতে সরকারের ব্যর্থতা অযোগ্যতার এক দলীল হয়ে থাকবে। প্রান্তিক মানুষের জন্য সাধ্যমতো কিছু করার মধ্য দিয়ে একটা জাতীয় ঐক্য তৈরি হতে পারতো।