ভাইরাস করোনা ও সেক্যুলারত্বের অসহায়ত্ব

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

রাষ্ট্রচিন্তক ও গবেষক


একটি আদর্শের পরীক্ষা হয় সমস্যার ধাক্কায়। মেধাবীর মেধার পরীক্ষা যেমন তার আত্মস্থের সামর্থ্যে আর প্রতিভাবানের পরীক্ষা যেমন তার সৃজনশীলতায়, তেমনি একটি আদর্শ পাশ-নম্বর পায় সমস্যায় অনুসারীরা কতোটা সমাধান পায়, সেটার উপর। অভিধান বলে: ‍আদর্শ হলো, কিছু বিশ্বাস বা নীতির অবস্থান যার উপর কোন রাজনৈতিক পদ্ধতি, দল বা প্রতিষ্ঠান স্থিতিশীল হয়। (a set of beliefs or principles, especially one on which a political system, party, or organization is based.) তাই যদি হয়, আমাদের দেশের ন্যাকা সেক্যুলাররা—যারা সেক্যুলারিজমকে তাদের হাজার বছরের লালিত চৌদ্দ পুরুষের সংস্কৃতি বলেন, সংবিধানে নীতি বলে জবরদস্তি বসিয়ে রেখেছেন, তারা ভাইরাস করোনার এমন ধংসযজ্ঞের সময় তাদের সেক্যুলারিজমকে দিয়ে একটি মানুষকেও সান্ত্বনার বাণী শোনাতে পেরেছেন? এবার কিন্তু আমাদের ন্যাকা সেক্যুলারদের উপর ভয়াবহ একটা পরীক্ষা হয়ে গেলো। ভাইরাস কোভিড-১৯ আসার পর কেমন যেন ন্যাকা সেক্যুলারমহল খেই হারিয়ে বসেছেন। কোথায় গেলো তাদের হম্বিতম্বি, কোথায় গেলো মঙ্গল-শোভাযাত্রার মঙ্গলীয় উম্মাদনা, কোথায় গেলো সেক্যুলার-সংস্কৃতির লু-লু ধ্বনি! সত্যিই, তাদের এ দীনতা-হীনতার জন্য আমার খুব করুণা হয়। কথায় বলে: বিপদে বন্ধুর পরিচয়।

সেক্যুলারিজমকে যারা নীতি মানেন, পার্থিব জীবনের জাগতিক মানার বিষয় মানেন—তাদের তুলনা কিন্তু সেই গাভীর মতো, যার কথা রচনা বইতে লিখা আছে কিন্তু না আছে দেহ, না আছে গৃহ। আচ্ছা, না হয় ধরেই নিলাম, জাগতিক মানার ক’টা পাই তাদের পকেটে আছে, তবে আজকের জাগতিক বিমার করোনার জন্য ক’চামচ সেক্যুলার দাওয়াই দিতে পারেন কি? অথবা ক’কালাম নিরাময়ের বা সান্ত্বনার বাণী শোনাতে পারেন কি? নাই যদি পারেন, তবে কোলকাতার বানানো শতরকমের পেঁচা-পেঁচির মুখোশ পরে, নর্দন-কুর্দন করে যে মঙ্গলযাত্রা করেছিলেন, সে-সবের সঞ্চয় অল্প বলবেন কি? আজ খবরে শুনলাম, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক’জন সেক্যুলার অধ্যাপক নাকি দেশবাসীকে করোনা থেকে রক্ষায় খোদার দরবারে হাত তুলতে বলেছেন।ওমা একি শুনি! ষাঁড় কি তবে বাচুর প্রসবে দিকভ্রান্ত হইল? সতী নারী স্বামীর মরণে বিধবা হয় আর বেশ্যা পতিতালয় বন্ধে ঘড়ছাড়া হয়। অবাক হবার কী আছে?

অধ্যাপক আবুল ফজলের কথা নতুন-প্রজন্ম না জানুক, বড়-প্রজন্মদের তো জানার কথা। বাংলাদেশের নামকরা যে ক’জন শিক্ষাবিদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন—তাঁদের মধ্যে তাঁকে শুমার করা যাবে নিঃসন্দেহে। ১৯৮৩ সালে তাঁর ইন্তিকাল হয়। সারা জীবন তিনি সেক্যুলারিজমের ওকালতিতে লিখেছেন, ইসলামী শাসনের অযৌক্তিতার পক্ষে কলম ধরেছেন, মোল্লা-মৌলভীদের দৌড় যে মসজিদে গিয়ে খতম হয়েছে—সেসবও অবাধে বলেছেন। তাঁর যুক্তি ছিলো—ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। অতএব, রাষ্ট্র হবে ধর্মভিত্তিক নয়, সেক্যুলার; রাষ্ট্রের সংস্কৃতিও হবে সেক্যুলার। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘সমকালীন চিন্তা’ বইটি মাঝেমাঝে যখন হাতে নিই, মনে হয়: সময়ের কাছে মানুষ কতো অসহায়! সেই অধ্যাপক আবুল ফজল যখন সেক্যুলারিজমের চৌহদ্দি ছেড়ে মৃত্যুশয্যায়; দেখলেন, ওপারে সেক্যুলরিজম নেই—ওপারে অপেক্ষা করছে অন্য এক ইজম, তার নাম: ইসলাম—অসার হয়ে দেখা দিলো তাঁর সেক্যুলার-জীবন; একজন মৌলভী ডেকে তাওবা করলেন জীবনের করুণ সায়াহ্নে। খবরটি যখন নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে দৈনিক ইনকিলাবের আলোচিত কলাম ‘কাজীর দরবার’-এ প্রকাশিত হলো, সেদিনকার সেক্যুলাররা শরমে মূর্ছা গিয়েছিলেন কিনা জানি না। দোয়া করি, আল্লাহ মরহুম আবুল ফজলকে মাগফিরাত দান করুন। কিন্তু স্মরণ করি, যে মৌলভীদের পেছনে তিনি কলম ঘুরিয়েছেন অহোরাত্র, শেষতক তাঁদের হাতেই হাত রেখে অনুতাপের স্বীকারোক্তি দিতে হলো মরহুম অধ্যাপককে। এখানেই তো সেক্যুলারিজমের কলঙ্কিত পরাজয়, নির্লজ্জ ব্যর্থতা। আজ যে জাবির ক’জন সেক্যুলার শিক্ষক করোনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে বলেছেন, সেটাকে আমরা মুবারকবাদ জানাই, সাথেসাথে অনুরোধ করবো: তাঁরা যেন সেক্যুলারিজমের অসারতাকে উপলব্ধি করেন।

করোনা ভাইরাস যখন ঘরের দোরগোড়ায় ঠকঠক শব্দ করছিলো, আমাদের সেক্যুলাররা তখন কোন প্রাণীর মুখোশ পরেছিলেন, তাদের বাঙ্গালি সংস্কৃতির কাছে মঙ্গল কামনায় বিভোর ছিলেন কিনা জানি না। তবে, সেসব বাদ দিয়ে তারা যে, বিদেশী সংস্কৃতির অষুধের বোতল হাতড়াতে সচেষ্ট ছিলেন, তা বলতে পারি সহজেই। কারণ, আমিই আগেই বলেছি, সেক্যুলারদের দেহ নেই, গৃহ নেই।ওদের বিশ্বাসের কোন ভিটা নেই।ওদের সংস্কৃতি যেমন ওদের কথায় ‘বহমান নদীর মতো’, তাই বিশ্বাসও বোধ করি ভাসমান মেঘের মতো। ভাসমান মেঘ যেমন হঠাৎ উধাও হয়ে যায়, তেমনি ওদের বিশ্বাসও হারিয়ে যায় হঠাৎ করে—তখন-ই ওরা হয়ে পড়ে নাস্তিক। ছাত্রজীবন থেকে এ বিশ্বাস আমার দৃঢ় হয়েছে: সেক্যুলারিজম হচ্ছে নাস্তিকতার প্রবেশদ্বার। আমাদের বাংলাদেশেই ধরা যাক, যারা নাস্তিক বলে পরিচিতি পেয়েছেন, তারা কিন্তু এক লাফে নাস্তিক হননি; সেক্যুলারিজমের দরোজা দিয়েই নাস্তিকতায় প্রবেশ করেছেন। আরও শক্তিশালী উদাহরণ দেই। যেমন ধরুন, সংবিধানে সেক্যুলারিজমকে ঢোকানো হলো, কি হলো? করোনা ঢুকতেই সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের পাইক-পেয়াদারা পর্যন্ত শুধু হম্বিতম্বি ছাড়া মুখে একবারও আল্লাহ-খোদার নাম নেয়নি। কারণ,ওটা নিলে আবার সংবিধানের মূলনীতি লঙ্ঘন হয় যদি! অতীতের অন্যসব সরকারের সময় শুনতাম জাতীয় কোন বিপদে মসজিদে-মসজিদে দোয়ার আহ্বান জানাতে। এখন ওগুলো সেক্যুলারপরিপন্থী, তাই না! এভাবেই একদিন প্রশাসনযন্ত্র নাস্তিকতার লেবাসে আক্রান্ত হবে। সেদিন তো সেক্যুলার সংস্কৃতির ব্যানারে সরকার পর্যন্ত স্কুলে-স্কুলে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করতে হুকুম জারি করেছিলো। কই, মঙ্গল যে এলো না! রবিন্দ্রগীতিতে তো চিড়া ভিজলো না। কোলকাতাইয়া বাবুরা পানি ছাড়তে পারে, মঙ্গল ছাড়তে পারে না?

বিশ্বাস যদি আজ এমন হতো যে, সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ; তিনিই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, তিনিই একমাত্র রোগ নিরাময়কারী—তা’হলে আজ সরকারী সম্প্রচারে দোয়ার কথা উঠতো। তা না বলে, বলা হচ্ছে: অমুক আমাদের নেত্রী, তাই করোনার ভয় নেই। ইসলামের ভাষায় এগুলো স্পষ্ট শিরক ও ধর্মত্যাগী কাণ্ড। আজকের ন্যাকা সেক্যুলাররা অন্তত মরহুম অধ্যাপক আবুল ফজলের মতো বিবেকের পরিচয় দিতে পারতেন। তাতে তাদের-ই মঙ্গল হতো। সে মঙ্গল আসতো ওপাড় থেকে নয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমাদের সেক্যুলারদের অসহায়ত্বের দৃশ্য দেখে এতোটুকুই লিখলাম।

Comments are closed.