করোনাভাইরাস: মুসলিম রোগীদের সাথে বর্ণবাদী আচরণ করছে ভারত

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | নাহিয়ান হাসান


ভারতের হাসপাতালে মুসলিম ও হিন্দু করোনভাইরাসে আক্রান্তদের পৃথক করে দেওয়া হয়েছে। এতে করে বিশ্বে একমাত্র ভারতই ধর্মীয় ভিত্তিতে রোগী পৃথক করেছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দোহা ভিত্তিক আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে ভারতের গুজরাট রাজ্যের সরকারী হাসপাতালে রোগীদের ধর্মীয় ভিত্তিতে পৃথক করনকে অনেকে বর্ণবাদী আচরণ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। বলা হয়, এটি নিঃসন্দেহে বর্ণবাদকে উৎসাহিত করবে।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রকোপ চলাকালীন এধরণের ‘বর্ণবাদী’ আচরণ প্রকাশ পেয়েছে পশ্চিম ভারতের রাজ্য গুজরাটের প্রধান শহর আহমেদাবাদের একটি সরকার পরিচালিত হাসপাতালে।
তারা ধর্মের উপর ভিত্তি করে করোনভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে দাবি করেছে যে এই আদেশটি এসেছে সরকারের পক্ষ থেকে।

আহমেদাবাদ সিভিল হাসপাতালের প্রধান পরিচালক ডা. গুণভান্ত এইচ রাথোড় বুধবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রতিবেদনে বলেন, “সাধারণত পুরুষ ও মহিলা রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড থাকে। তবে এখানে আমরা হিন্দু ও মুসলিম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করেছি। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত এবং আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন”।

গুজরাট রাজ্যটি হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দ্বারা পরিচালিত। যারা দেশের কেন্দ্র সরকার পরিচালনা করে। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ২০০১ থেকে নরেন্দ্র মোদী প্রায় ১৩ বছর এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

আল জাজিরা গুজরাট সরকারের স্বাস্থ্য বিষয়ক মুখ্য সচিব জয়ন্ত রবিকে ধর্মীয় ভিত্তিতে রোগীদের পৃথকীকরণের বিষয়ে ফোন করলে তার ব্যক্তিগত সহকারী ফোন রিসিভ করে বলেন, আমরা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ সঞ্জয় সোলঙ্কির সাথে কথা বলার পরামর্শ দিচ্ছি।

ব্যক্তিগত সহকারী তার নাম প্রকাশ না করে বলেন, “এব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই।”

সোলঙ্কিকে ফোন করলে তিনি আল জাজিরাকে রাথোড়ের সাথে কথা বলতে বলেন। তিনি বলেন,এব্যাপারে কথা বলার জন্য তিনিই সঠিক ব্যক্তি।

তবে রাথোড় আল জাজিরার ফোন কলগুলোর কোনও উত্তর দেননি।

ইউএসসিআইআরএফ হিন্দু ও মুসলিম রোগীদের গুজরাটে পৃথক হাসপাতালে পৃথক পৃথক ওয়ার্ডে রাখার রিপোর্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা মনে করে এই ধরনের কর্মকাণ্ড ভারতে চলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরও বাড়িয়ে তুলতে এবং মুসলিম বিদ্বেষ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে যা মোটেও কাম্য নয়।

এদিকে গুজরাটের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রী নীতিন প্যাটেল আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যে এই ধরণের কিছুই ঘটেনি।

তিনি জানান, “লোকদের সর্বোত্তম সম্ভাব্য চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা করা হচ্ছে”। তিনি একথা বলেই ফোন রেখে দিয়েছেন।

রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগও একটি সরকারী বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে মুসলমান ও হিন্দুদের পৃথক ওয়ার্ডের রিপোর্টকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করা হয়।

তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে একজন রোগীর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, “রবিবার রাতে প্রথম ওয়ার্ডে
(এ -৪) ভর্তি হওয়া ২৮ জনের নাম ডেকে আনা হয়েছিল। এরপর তাদেরকে অন্য ওয়ার্ডে (সি -৪) স্থানান্তরিত করা হয়”।

“আমাদের কেন স্থানান্তরিত করা হচ্ছে তা বলা হয়নি, তবে যে নামগুলি ডেকে আনা হয়েছিল সেগুলি নির্দিষ্ট কোন ধর্মের। আমরা আমাদের ওয়ার্ডের এক কর্মচারীর সাথে কথা বলেছি এবং তিনি বলেছিলেন যে এটি উভয় সম্প্রদায়ের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য করা হয়েছে”।

দ্য হিন্দু সংবাদপত্রের অন্য একটি প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক চিকিৎসকের মতে, “সংখ্যালঘু মুসলিম রোগীদের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু নির্দিষ্ট রোগী একই ওয়ার্ডে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।”

“কিছু রোগী অভিযোগ করার পরে অস্থায়ী ভিত্তিতে তাদের আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল” ডাক্তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে পত্রিকাটিকে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে আহমেদাবাদ ভিত্তিক সমাজবিজ্ঞানী ঘনশ্যাম শাহকে আল জাজিরা জিজ্ঞাসা করে যে, হাসপাতালে রোগীদের ধর্ম অনুসারে পৃথকীকরণের বিষয়টি বর্ণবাদ কিনা? তখন তিনি জবাব দিয়েছিলেন, অবশ্যই বর্ণবাদ।

তিনি বলেন, “গুজরাটকে জানার পরে আমি অবাক হচ্ছিনা না যে সেখানে এটি ঘটেছে। এটি খুবই স্পষ্ট একটি বিষয়। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে মুসলমানদের ঘিরে মিথ্যা সংবাদের প্রোপাগান্ডা সম্ভবত ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো তবে আমি দেখতে পাচ্ছি যে এটি গুজরাটে এসেই দৃশ্যমান হয়েছে”।

হিন্দুত্ববাদী ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ করোনাভাইরাসের মহামারীকে মুসলমানদের দ্বারা ছড়ানো বলে একটি সুবিস্তৃত ইসলামবিদ্বেষকে ইঙ্গিত করছিলেন। বিশেষত মুসলমানদের তাবলীগী জামাত মার্চ মাসে নয়াদিল্লিতে একটি ধর্মীয় জমায়েত আয়োজন করার পরে তিনি এ মন্তব্য করেন।

এই জমায়েতটির শত শত লোক জন করোনা ভাইরাসে পজিটিভ হওয়ায় দেশজুড়ে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য তাদেরকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এবং এই ভাইরাস কাদের মাঝে উপস্থিত রয়েছে তা সন্ধানের জন্য দেশব্যাপী খোঁজ শুরু করা হয়েছিল।

একে কেন্দ্র করে বুধবার তাবলিগী জামায়াতের প্রধান মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিরুদ্ধে “দোষনীয় নরহত্যার” অভিযোগে মামলা করা হয়।