কাশ্মীরে শীর্ষ স্বাধীনতাকামী নেতাকে হত্যার জেরে সংঘর্ষ অব্যাহত

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | নাহিয়ান হাসান


হিন্দুত্ববাদী সরকারী বাহিনী কর্তৃক শীর্ষস্থানীয় সংগ্রামী নেতাকে হত্যার পর ভারত-শাসিত কাশ্মীরে শুক্রবার (৮ই মে) তৃতীয় দিনের মতো সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার (৬ই মে) দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলাওয়ামা জেলায় ভারতীয় সেনাদের সাথে বন্দুকযুদ্ধে হিজবুল মুজাহিদিন গ্রুপের কমান্ডার রিয়াজ নাইকু সহ আরও তিন সংগ্রামী নিহত হয়েছেন, যার ফলে ভারত শাসিত কাশ্মীরের বেশ কয়েকটি জায়গায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

স্বাধীনচেতা শান্তি প্রিয় মুসলিম প্রধান এই অঞ্চলের বৃহত্তম সংগ্রামী গোষ্ঠী হিজবুল মুজাহিদিনের অভিযানের প্রধান ছিলেন শীর্ষস্থানীয় সংগ্রামী নেতা রিয়াজ নাইকু (৩৫)। তিনিই কাশ্মীরে ভারতীয় অন্যায় শাসন এবং হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

শুক্রবার (৮ই মে) ভারতের অন্যায় শাসন ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরী বিক্ষোভকারীরা সরকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করায় কট্টর হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের সেনাবাহিনীর সাথে স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরীদের সংঘর্ষ বেধে যায়। পরবর্তীতে স্বাধীনতাকামীদের বিক্ষোভ বন্ধ করতে তারা শটগান, ছোড়া বন্দুক ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে।

সেখানকার কিছু নাগরিক এবং চিকিৎসক মারফত জানা গিয়েছে যে, তিন দিনের সংঘর্ষে কমপক্ষে একজন নিহত এবং ৫০ জন আহত হয়েছেন। আর বেশিরভাগ আহতদেরকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন যে, লোকজনের চোখে ছোড়া বন্দুকের গুলি লেগেছে তবে, বুলেট এবং ছোড়া ​​গুলিবিদ্ধ আহতদের মধ্যে কমপক্ষে এক ডজন লোককে চিকিৎসার জন্য এই অঞ্চলের প্রধান শহর শ্রীনগরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মিডিয়ায় ব্রিফ করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের উপর কড়া বিধিনিষেধ থাকায় তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আহতদের বেশিরভাগই এক বা উভয় চোখেই ছোড়া গুলি দ্বারা আঘাতের শিকার হয়েছেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার (৭ই মে) সরকারী বাহিনী শীর্ষস্থানীয় সংগ্রামী নেতা রিয়াজ নাইকুর জন্মভূমি গ্রামে চড়াও হয়ে সেই প্যান্ডেলটি ভেঙে দেয় যা রিয়াজ নাইকুর জানাজা এবং তার প্রতি গ্রামবাসীর শেষ শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করতে সকলেই জড়ো হওয়ার জন্য বানানো হয়েছিল। যার কারণে স্বাধীনচেতা গ্রামবাসী এই অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের সূত্রপাত করে যা পরবর্তীতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সরকারি বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

কট্টর হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের কাশ্মীরের নতুন পলিসির একটি হল জানাজাকে কেন্দ্র করে গণ জমায়েত হতে না দেওয়া। এই পলিসির আওতায় নিহত সংগ্রামীদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করাটাই হয়ে উঠেছে বিক্ষোভের মূল কারণ।

পরিবারের কাছে নিহত সংগ্রামীদের লাশ হস্তান্তর করার পরিবর্তে পুলিশ গ্রাম থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দুরে পাহাড়ী কবরস্থানে এই শীর্ষস্থানীয় স্বাধীনতাকামী সহ বাকি সংগ্রামীদের লাশ দাফন করেছে।

বুধবার (৬ই মে) থেকে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সরকারি প্রশাসন উক্ত অঞ্চলের মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। এটি এই অঞ্চলে নিজেদের অন্যায় শাসন ও হস্তক্ষেপ বজায় রাখার একটি হীন ভারতীয় কৌশল। বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটলে প্রায়শই এই অঞ্চলকে সবধরনের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

কট্টর হিন্দুত্ববাদী মোদির সরকারি প্রশাসন এধরণের প্রায় সকল তথ্যই গোপন করার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখায় সংঘটিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমকে কিছু জানাতে তারা অস্বীকার করে।

২০১৯ সালেও কট্টর হিন্দুত্ববাদী বর্তমান ভারত সরকারের প্রশাসন ঠিক একই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল যখন মুসলিম প্রধান এই অঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বাতিল করে সরাসরি ফেডারেল শাসন জারি করেছিল।

সেই সময়, কলহবিহীন শান্তিপূর্ণ এই কাশ্মীর অঞ্চলে এক মাসব্যাপী সবধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে তথ্য গোপন করে রাখা হয়েছিল এবং অভূতপূর্ব সামরিক ক্র্যাকডাউন শুরু করা হয়েছিল।

ভারতীয় নিরাপত্তা আধিকারিকরা এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু সদস্য কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামী রিয়াজ নাইকুর মৃত্যুকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একটি বড় বিজয় বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি প্রায় আট বছরের জন্য হিজবুল মুজাহিদিনের শীর্ষ কমান্ডার ছিলেন এবং এই গ্রুপের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সহজাত বিচক্ষণতা সম্পন্ন নেতা ‘বুরহান ওয়ানি’ নিহত হওয়ার পর ২০১৬ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে তিনি এই গ্রুপের শীর্ষস্থানীয় পদে সমাসীন হয়েছিলেন।

ওয়ানির মৃত্যুর পরে, নাইকু ভারত-শাসিত কাশ্মীরে স্বাধীনতা সংগ্রামকে নতুন জীবন দান করতে বিশেষ অবদান রেখেছেন।ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেছেন যে, তিনিই ছিলেন ভারত শাসিত কাশ্মীরের মোস্ট ওয়ান্টেড বিদ্রোহী।

করোনাভাইরাস লকডাউন চলাকালীন ভারত সাম্প্রতিক মাসগুলিতে এই অঞ্চলজুড়ে জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযান আরও বাড়িয়েছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামীরা শুরু থেকেই সরকারী বাহিনী এবং এই অঞ্চল সম্পর্কে মিথ্যা সংবাদদাতাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে।

ভারত ও পাকিস্তান প্রত্যেকেই কাশ্মীরের স্ব স্ব অংশ পরিচালনা করে তবে উভয়ই এই অঞ্চলটির পুরো অংশকেই নিজেদের বলে দাবি করে থাকে।

১৯৮৯ সাল থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা কাশ্মীরে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। বিদ্রোহ এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় সামরিক ক্র্যাকডাউনে প্রায় ৭০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

বেশিরভাগ কাশ্মীরিরা ভারত শাসিত কাশ্মীরের ভারতীয় শাসনকে অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীনতাকামীদের এই অঞ্চলটিকে পাকিস্তানের শাসনাধীন বা একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে একত্রিত করার আহ্বানকে সমর্থন করে।