মহামারি ছড়িয়ে পড়লে ইসলামের নিদর্শনগুলো মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা উচিৎ

মাওলানা শের মুহাম্মাদ


চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া বিশ্বব্যাপী মহামারির রুপ ধারণ করেছে করোনা ভাইরাস। ইতিমধ্যে ভাইরাসটির সংক্রমণে প্রায় ১৩ হাজার লোক নিহত হয়েছে। আর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। এহেন সংকটাপূর্ণ মূহুর্তে মহামারি ও ইসলামের দৃষ্টিতে করণীয় সম্পর্কে জানা যাক।

৬ষ্ঠ হিজরিতে মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া-সাল্লামের জীবদ্দশায় পারস্যের মাদায়েনে মহামারি রূপে প্লেগ দেখা দেয়। এরপর ১৮ হিজরিতে হযরত উমার রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর শাসনামলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। সিরিয়ার আমওয়াস নামক অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় সিরিয়ার তাবুতে অবস্থান করছিলেন ৩৫ হাজার মুসলিম সেনা। সেখানে মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে ২৫ হাজার সেনা শাহাদাত বরণ করেন। এটি ছিল সাহাবী এবং তাবেয়ীদের এতবড় শহীদী জামাত যা ইসলামের সবগুলো যুদ্ধে শহীদানের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।

৬৬ হিজরিতেও মহামারি দেখা দিয়েছে। হজরত মুগিরা বিন শু’বা রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফার গভর্ণর থাকাকালে ৬৬ হিজরিতে মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে। স্বয়ং মুগিরা বিন শু’বা এতে আক্রান্ত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

৫ম উমাইয়া খলিফা আব্দুল আযীয বিন মারওয়ানের আমলে মিশরে মহামারি দেখা দিলে সেখান থেকে পালিয়ে একটি নিভৃত পল্লীতে তিনি আশ্রয় নিয়ে নিলেন। সেখানে তার ভাই খলিফা আবদুল মালিকের পক্ষ থেকে তার নিকট একজন দূত আসলো। আবদুল আযীয দূতকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার নাম কী?” দূত উত্তর করলেন, আমার পিতার নাম ‘অন্বেষণকারী’ আর আমার নাম হল ‘কব্জাকারী’।
উত্তর শুনে আবদুল আযীয মন্তব্য করলেন, আমি সম্ভবত আর মিশরে জীবিত ফিরতে পারবো না। সত্যিই তিনি সে পল্লীতেই মৃত্যুবরণ করলেন।
বনি উমাইয়ার শাসনামলে এত বেশি মহামারি হয়েছে যে, সিরিয়ায় সবসময় মহামারি লেগেই থাকতো বলে ঐতিহাসিকগণ মন্তব্য করেছেন।

আব্বাসী শাসনামলে তূলনামূলক মহামারি হ্রাস পেয়েছিলো। আব্বাসী শাসকদের পক্ষ থেকে নিযুক্ত সিরিয়ার গভর্ণর জনগণের উদ্দেশ্যে একদিন বললেন, তোমরা আল্লাহ তায়ালার প্রসংশা করো। আমরা শাসনক্ষনতা লাভ করার পর থেকে আল্লাহ তোমাদের উপর থেকে মহামারি তুলে নিয়েছেন।

তেমনিভাবে ইসলামের অতীত ইতিহাসে অনেক মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। সে সবের বিস্তারিত বর্ণনাও লিপিবদ্ধ রয়েছে। মহামারির সময়ে পূর্ববর্তী মুসলিম সমাজের জীবনযাপন কেমন ছিল ইতিহাসের কিতাব থেকে তার আন্দাজও পাওয়া যায়।

বৈশ্বিক এ সঙ্কটকালে করোনা সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার মত যে কাজগুলো আমরা করছি অভূতপূর্ব ইতিহাসে এমনটি দেখা যায়নি। মহামারীর সময়ে কখনোই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশক নিদর্শনগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। জামাতবদ্ধ হয়ে আমরা যে সালাতগুলো মসজিদে আদায় করি তা মুসলিম জাতিসত্তার স্বকীয়তার নিদর্শন। সালাত হল ইসলামের গৌরব, মাহাত্ন্য এবং ধর্ম হিসেবে ইসলামের কার্যকারিতা, প্রভাব এবং শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন। জামাতে সালাত আদায় করা, হজ্ব করা, জুম’আর বিশাল জমায়েত- এগুলোর একটা বৈশিষ্ঠ্য এবং ঘোষণা আছে। বিশ্ববাসীর সামনে এই ইবাদাতগুলো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পরাক্রমশীলতার ঘোষণা দেয়। যখন আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালার সব থেকে সেরা সৃষ্টি সমবেতভাবে বিশাল জমায়েতে সমুচ্চস্বরে তাঁর বড়ত্বের ঘোষণা করে, তাঁর পদতলে লুটিয়ে পড়ে, এই অনুপম দৃশ্যের কোনো তুলনা পৃথিবীতে আছে? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এর তুলনীয় কোন বস্তু আছে? মাটিতে, কাঁদায়, ধূলি-ধূসরিত ফ্লোরে মানুষ যখন তার সবচেয়ে সম্মানীয় অঙ্গ নাক-কপাল আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পদতলে লুটিয়ে দেয়, তখন আমাদের রব কতটুকু রহম হন তার অনুভূতি আমাদের আছে? আল্লাহর ওয়াস্তে মসজিদগুলো খোলা রাখুন।

আমরা যাকে আধুনিক,অগ্রসর, যৌক্তিক মনে করছি; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো আধুনিক,অগ্রসর বা যৌক্তিক কোনোটাই হয়না। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ শুধু পশ্চিমা বা প্রতিষ্ঠিত সেক্যুলার ধ্যান-ধ্যারণার প্রতি এক ধরণের চিন্তার দাসত্ব। যে সমাজ ইসলামের সাথে সম্পর্কহীন তারা যখন আল্লাহর আযাবের সম্মুখীন হয়, ততদিনে গুনাহ তাদের অন্তরকে এতোটা কঠিন করে তোলে যে, আল্লাহর আযাবের মুখোমুখি হলে তারা আরো দাম্ভিক হয়ে যায়।

আমাদের সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল কারো কারো মুখে এমন দম্ভোক্তিও শুনছি যে, তাদের শক্তি নাকি করোনা নামক আল্লাহর আযাবের চেয়েও আরো শক্তিশালী। তারা এটাকে প্রতিহত করেই ছাড়বেন। নাউযুবিল্লাহ্। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন!
ফিরাউন এবং নমরুদের মতো যে সমস্ত কাফিররা কুফরের ক্ষেত্রে একেকজন সাইন; অতীতে তাদের ক্ষেত্রেই কেবল এমন দম্ভ লক্ষ্য করা গেছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ক্ষমতাকে তাচ্ছিল্য করে একটি দম্ভোক্তিই একটি জাতিকে ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট।

এ সময়ে আমাদের উচিত জাতিগতভাবে তওবা করা। আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। অশ্লীলতার কারণে মাহামারী ব্যাপক আকাড় ধারণ করে। সমাজে বাধাহীনভাবে যখন নাফরমানি হয়- আল্লাহর আযাব চলে আসে। এখন আমাদের উচিত বেশ্যালয়গুলো ভেঙ্গে ফেলা, গার্মেন্টস, অফিস, কল-কারখানায় নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে বন্ধ করে দেওয়া, মদ-জুয়ার আসরগুলো বন্ধ করে দেওয়া।

ইবনু হাজার আসকালানী বেশ কিছু বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া-সাল্লামকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, মহামারি হল পাপের সাজা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পূর্ববর্তী অনেক উম্মতকে মহামারি দিয়ে শাস্তি দিয়েছেন। তার কিছু প্রভাব পৃথিবীতে থেকে গেছে। সেটাই কখনো কখনো আসে আবার চলে যায়। (বজলুল মাউন ফি ফাজলিত তাউন : ৭৮ ইবনু হাজার)

কিছু বর্ণনামতে রাসূল সা: বলেছেন, মহামারি হল মুমিনদের রহমত এবং শাহাদাত কিন্তু কাফিরদের জন্য আযাব।

সংক্রামক ব্যাধিগুলো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হুকুমে বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ সাপেক্ষে উপযুক্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। রাসূল (সা.) এর হাদীসে এ ধরণের পদক্ষেপ গ্রহনের স্বপক্ষে প্রমাণ রয়েছে।

বুখারি এবং মুসলিমের উভয় বর্ণনায় রাসূল (সা.) এই দুআটি সর্বোত্তম বলেছেন।
এটি অর্থের দিক থেকে আমাদের খুবই প্রাসঙ্গিক। দু’আটি বেশি বেশি পড়া দরকার।
الّٰلهُمَّ إِنِّيْ أَسأَلُكَ الْمُعَافَاةَ فِي الدُّنْيَا و الْآخِرَةِ.
হে আল্লাহ্, দুনিয়া এবং আখিরাতে আমি আপনার নিকট আরোগ্য কামনা করি।
সকাল এবং সন্ধ্যায় এই দু’আগুলো পাঠ করুন।
أَعُوْذُ بِاللّٰهِ و قُدْرَتِهٖ مِنْ شِرِّ ما أَجِدُ و أُحَاذِرُ
আমি আল্লাহর নিকট তার ক্ষমতার ওসিলায় আশ্রয় প্রার্থনা করছি। সে সব মন্দ বিষয় থেকে আমি যা পাচ্ছি এবং অনুভব করছি।
بِسمِ اللّٰهِ الَّذِيْ لا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهٖ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ و لَا فِيْ السَّمَاء.
আল্লাহর নামে শুরু করছি। যার নাম স্মরণ করলে দুনিয়া এবং আখিরাতে কোনো বস্তু কোনো ক্ষতি করতে পারে না।