মুসল্লীদের জন্য মসজিদ উন্মুক্ত করে দিতে উদাত্ত আহ্বান জানালেন ফরিদপুরের ৪০ আলেম

মহামারি করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশব্যাপী লকডাউন পরিস্থিতিতে ধর্মমন্ত্রণালয় কর্তৃক মসজিদের জামাতে মুসল্লী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যে নির্দেশনা জারি করেছে, তা প্রত্যাহার করে মসজিদসমূহ মুসল্লীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ফরিদপুরের ৪০ জন আলেম।

মঙ্গলবার দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে ফরিদপুরের ৪০ জন আলেম বলেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা ভাইরাস থেকে বিশ্বের ছোট বড় কোন দেশই মুক্ত নয়। আমাদের বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে এই মহামারীর বিস্তাররোধে দেশের জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে। এসব স্বাস্থ্যবিধি সকলের মেনে চলা জরুরী।

বিবৃতিতে ফরিদপুরের উলামায়ে কেরাম আরো বলেন, পবিত্র কুরআন-হাদীসের আলোকে ব্যক্তি ও সমষ্টিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, জুলুম-অত্যাচার ও গুনাহের কাজ অতি মাত্রায় শুরু হলে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে কঠোর সতর্ক ও হুঁশিয়ারী করার জন্য মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটান। এই মহামারির প্রাদুর্ভাব থেকে নিজে এবং দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য মুসলমানদের করণীয় হল- আল্লাহর কাছে ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে কায়মনোবাক্যে তাওবা-ইস্তিগফার তথা দৃঢ়ভাবে সকল অন্যায় ও গুনাহ পরিত্যাগের সংকল্প করে ক্ষমা চাইতে হবে এবং অধিক পরিমাণে নামায, তিলাওয়াত, দান-সদক্বা ও দোয়া-মুনাজাতের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

তারা আরো বলেন, এই তাওবা-ইস্তিগফার ও ইবাদাতের জন্য উত্তম স্থান হল মসজিদ। মসজিদ নির্মাণের একমাত্র উদ্দেশ্যই হল ইবাদত করা। সমগ্র পৃথিবীর সব মসজিদই আল্লাহর ইবাদাতের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। অপরদিকে মসজিদ সবসময় আবাদ রাখার নির্দেশসহ আল্লাহ ইরশাদ করেন- “আর তার চেয়ে বড় জালেম কে হতে পারে- যে আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম স্মরণ করা থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করে এবং সেগুলোকে উজাড় করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়? এই ধরনের লোকদের মসজিদে প্রবেশ বিধেয় নয়। আর যদি কখনো প্রবেশ করে, তাহলে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রবেশ করতে পারে। তাদের জন্য রয়েছে পৃথিবীতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি”। (সূরা বাক্বারা, আয়াত- ১১৪)।

উলামায়ে কেরাম বলেন, মসজিদে এই বাধা দেওয়া অনেকভাবে হতে পারে যেমন- (১) মসজিদে আসতে সরাসরি বাঁধা দান, (২) মসজিদ ধ্বংস বা উচ্ছেদ করে বাঁধা দান, (৩) নামাজির সংখ্যা কমিয়ে বাঁধা দানসহ উল্লেখিত সব পদ্ধতিই মসজিদে আসতে বারণ করার নামান্তর বলে মুফাসসিরীনে কেরাম অভিমত দিয়েছেন। মহামারি প্রবণ এলাকা হলেও কোন সুস্থ মুসলমানকে আল্লাহর ঘর মসজিদে আসতে বাধাদান করা যাবে না। কাজেই করোনা মহামারীর আতঙ্কের মধ্যেও যেসকল সুস্থ মুসল্লী মসজিদে আসতে চাইবে, তাদেরকে কোনভাবেই বাধাদান শরীয়ত সমর্থন করে না। সুতরাং সংখ্যার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে আল্লাহর ঘর মসজিদসমূহকে মুসল্লীদের জন উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আমরা জোর আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা জোর আশাবাদি, মসজিদসমূহে এই কঠিন বিপদে আল্লাহ পাগল বান্দাগণ যখন কান্নাকাটি করে তাওবা-ইস্তিগফার ও ইবাদতে মশগুল হবেন, ইনশাআল্লাহ এতে আল্লাহ’র ক্রোধ প্রশমিত হবে এবং তিনি দয়াপরবশ হয়ে এই দেশ ও জাতিকে হেফাজত করবেন।

বিবৃতিতে ফরিদপুরের উলামায়ে কেরাম আরো বলেছেন, মহামারি, দূর্যোগ, বিপদ-আপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং এটা মোকাবেলার সাধ্য কোন মানুষের ও দুনিয়াবী কোন শক্তির নেই। এই বাস্তব সত্য উপলব্ধি করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ এপ্রিল শনিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বলেছেন, “সারা বিশ্বে কত শক্তিশালী দেশ, কত অস্ত্র কোনো কিছুই কাজে লাগলো না। একটা ভাইরাস চোখে দেখা যায় না। তার কারণে আজ সারা বিশ্ব স্থবির, সারা বিশ্বের মানুষ আজ ঘরে বন্দি। আল্লাহর শক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি, তা আজ প্রমাণ হয়ে গেল”। প্রধানমন্ত্রী অধিবেশনে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন- “আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকুন। বিশ্ববাসী যেন করোনা ভাইরাস থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে”। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে উপস্থিত সকল সদস্যদেরকে নিয়ে মহামারি থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করেছেন এবং দেশবাসীকে আল্লাহমুখী হওয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন। সংকটকালে প্রধানমন্ত্রীর এই মূল্যবান বক্তব্য ও আহ্বান জাতি চিরদিন স্মরণে রাখবে।

বিবৃতির শেষ দিকে ফরিদপুরের আলেমগণ বলেন, আল্লাহর বিশেষ রহমত অর্জন এবং আল্লাহর গজব করোনা মহামারী থেকে মুক্তি লাভের জন্য মুসল্লী সংখ্যার শর্ত তুলে দিয়ে নামাযের নির্ধারিত সময়ে সুস্থ আগ্রহী মুসল্লিদেরকে মসজিদের জামাতে নামায পড়ার সুযোগ কর দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজনে করোনা বিস্তাররোধে মসজিদ কমিটি ও ইমাম-মুয়াজ্জিনের মাধ্যমে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে হলেও মসজিদ উন্মুক্ত রাখা জরুরী। এজন্য নিয়ম জারি করা যেতে পারে যে- মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না, প্রতি ওয়াক্ত নামাযের আগে স্যানিটাইজার বা জীবাণুনিরোধক দিয়ে মসজিদের মেজে মুছতে হবে, মুসল্লীদেরকে নিজেদের বাসা-বাড়ী থেকে অজু করে মুখে মাস্ক পরে আসতে হবে এবং জামাত শেষে নিজ নিজ বাসায় গিয়ে সুন্নাত ও নফল আদায় করবেন। বয়সের ভারে ন্যুজ ব্যক্তিরা এবং যে কোন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি ও নাবালক বাচ্চারা মসজিদে আসবে না ইত্যাদি।

এমন মহৎ উদ্যোগ আল্লাহর রহমতকে তরান্বিত করবে, করোনা গজব দূর করবে, দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ। পাশাপাশি সরকারের এমন উদ্যোগে কোটি কোটি মুসলমানও আশ্বস্ত ও সন্তুষ্ট হবেন।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন- মুফতি কামরুজ্জামান, মুফতি শারাফাত হোসাইন, মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী, মুফতি কাজী ইকবাল হোসাইন, মাওলানা মাহমূদ হাসান ফায়েক, মুফতি আবু সাঈদ, মাওলানা আব্দুল মতিন, মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল, মুফতি আব্দুল কাইয়ূম, মুফতী হাবীবুর রহমান কাসেমী, মুফতি এনামুল হাসান, মুফতি আবুল হাসান, মাওলানা রওশন আলী, মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন, মাওলানা আমজাদ হোসাইন, হাফেজ কবীর আহমদ, মাওলানা শহীদুল হাসান, মুফতি আবুল বাশার, মুফতি আমীর হোসাইন, মাওলানা আনোয়ারুল করীম, মাওলানা ইলিয়াস হোসাইন, মাওলানা আবু বকর, মাওলানা মিজানুর রহমান, মাওলানা হারুনার রশীদ, মুফতী শফিকুর রহমান, মুফতী কুতুবউদ্দিন, মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, মাওলানা নিজামুদ্দিন, মাওলানা আব্দুল হালিম, হাফেজ আসাদুজ্জামান, মুফতী মজিবুর রহমান, মুফতী আহমদুজ্জামান, মাওলানা আবুল কাশেম, হাফেজ নোমান, মুফতী আব্দুস সবুর, মাওলানা আসাদুজ্জামান, মাওলানা জাকির হোসাইন, মুফতী আব্দুর রহীম, মাওলানা হাফিজুর রহমান, মাওলানা এমদাদ, মাওলানা শামসুজ্জামান মারজান প্রমুখ। – বিজ্ঞপ্তি।