মুহিউদ্দীন খানের মতো তরুণদের এমন মূল্যায়ন আর কেউ করেনি : যাইনুল আবেদীন

জুন ২৭, ২০১৯

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | বিশেষ প্রতিনিধি


ফখরে মিল্লাত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.। বৈচিত্রময় গুণী এই মানুষটির কথা কে না জানেন। তার অবদান সম্পর্কেও কমবেশি সবার জানা। তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনের অনুবাদ লিখে সবার মাঝে বেশ বড়সড় জায়গা করে নিয়েছেন। রাজনীতি ও লেখালেখির প্লাটফর্মে সমান তালে হেঁটেছেন জীবন-বিপ্লবের বাঁকে বাঁকে। এই মহান ব্যাক্তি  মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ.- ২০১৬ সালের ২৫ জুন ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ.  যাদেরকে নিজের হাতে গড়েছেন,  যারা তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন, তার কাছে আসা-যাওয়া ছিলো যাদের, তাদের অন্যতম একজন, যিনি বর্তমান সময়ে মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর পরে তার সান্নিধ্যে সবচে বেশি সময় ব্যায় করেছেন তিনি হলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, লেখক, অনুবাদক, চিন্তক, উস্তাদুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন।

ইনসাফের সাথে আলাপকালে খান সাহেব রহ. এর সাথে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন বলেন, আমি ১৯৮৮ সালে কৈশোর পার করে যখন শরহে বেকায়াহ পড়ছি, তখন মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর সাথে দেখা হয়েছিলো। উপলক্ষ্যটা ছিলো আমি মাকামাতে হারীরী পড়ে একটি রচনা লিখে মুফতী উবায়দুল্লাহ সাহেবকে দেখাই, লেখা দেখে পছন্দ করে বললেন এ লেখা খান সাহেবকে দেখানো দরকার। তখন আমি খান সাহেবকে তেমন চিনি না, তিনি একজন লেখক, সম্পাদক, তার কাছে যেতে হয় বা যাওয়া যায় তা আমার জানা ছিলো না। মুফতী উবায়দুল্লাহ সাহেব আমাকে সাথে নিয়ে খান সাহেবের কাছে যান। লেখা দেখে তিনি বললেন আগামী বছর কী পড়বা? আমি বললাম হেদায়া, তখন বললেন তাহলে তুমি হেদায়ার লেখক ও কিতাব সম্পর্কে একটা লেখা তৈরী করো। তারপর আমি এ বিষয়ে পড়াশুনা করে একটা লেখা তৈরী করে খান সাহেবের নিকট পেশ করি। মাস কয়েক পরে আমি যখন হেদায়া পড়ি তখন আমার এ লেখাটি মাসিক মদীনায় ছাপা হয়। এটা ছিল আমার জীবনের দ্বিতীয় লেখা যা প্রথম প্রকাশ হয় মাসিক মদিনায়। বলা যায় সেখান থেকেই আমার লেখালেখির শুরু।

মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর রচিত ও অনুবাদিত গ্রন্থ সম্পর্কে মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন বলেন, একজন লেখকের শুধু লেখাটাই মূখ্য হয় না, ব্যাক্তি ও ব্যাক্তিত্বটাও থাকে। মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর সকল লেখার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে।  ইন্তেকালের পূর্বপর্যন্ত তার কআছে আমার যাওয়া আসা ও যোগাযোগ ছিলো। তার অনুবাদ গুলোর মধ্যে আল ফারূকের অনুবাদ ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ লিখিত ‘ইনসানিয়্যাত মওতকে দরওয়াজে পর’ এর অনুবাদ খান সাহেব করেন ও ‘জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ’ এই ২টি বই তিনি তার যৌবন লেখা শেষ করেন। এখনও আমি এদুটি বই পড়ি। আমার কাছে ভালো লাগে। আর তার মৌলিক রচনাবলীর মধ্যে আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘জীবনের খেলা ঘরে’।

মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর নবীন তরুণ লেখকদের মূল্যায়ন সম্পর্কে  যাইনুল আবেদীন বলেন, তৎকালীন সময় যারা সম্পাদক ছিলেন তাদের মধ্যেথেকে খান  সাহেব যেভাবে নবীন তরুণ লেখকদের মূল্যায়ন করতেন তার কোন উপমা হয় না। যে সময়টাতে একজন লেখককে সাহস দেয়ার জন্যও কোন লোক ছিলো না। সে সময়ও খান সাহেব তা করেছেন। দৈনিক বাংলার সম্পাদকের পরে বাংলাদেশের ইতিহাসে মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর মতো তরুণদের এমন মূল্যায়ন আর কেউ করেনি। তখনকার খান সাহেব রহ. এর মর্যাদা, সম্মা্‌ ব্যাক্তিত্ব ছিলো আকাশচুম্বি। সে সময় যেকোন ব্যাক্তি লেখা নিয়ে বা কথা বলার জন্য নির্দ্বিধায় খান সাহেবের কাছে পৌছে যেতে পারতেন কোন বাধাঁ ভয়হীনভাবে।

এমনকি কেউ যদি মফস্বল থেকে একাধিক লেখা পাঠাতো আর তিনি যদি জানতে পারতেন লেখাটি যিনি পাঠিয়েছেন তিনি আলেম আলেম বা নতুন তরুণ লেখক তাহলে তিনি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লিখতেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের পরে আজো পর্যন্ত এতো পরিমাণে চিঠিও লেখেনি কেউ, যা লিখেছেন মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ.। যদি তার চিঠিগুলো সংকলন করা হয় তাহলে তার সংখ্যা বাংলা সাহিত্যে অনেক বড় হবে বলে মনে করি।

যে কেউ একটা বই অথবা অনুবাদ বা কোন স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করে খান সাহেবের কাছে নিয়ে এসে যদি বলতো যে আপনি একটা ভূমিকা বা অভিমত লিখে দেন, তখন তিনি কোন প্রশ্ন ছাড়াই বরং প্রশংসা করতেন এবং তাতে লিখে অভিমত দিতেন। তিনি মনে করতেন সে এখন শক্তিমান না, কিন্তু সে যদি কাজ চালিয়ে যায় তাহলে একসময় শক্তিমান লেখক হয়ে উঠবে। তার এ বিষয়টা  যদিও অনেকে নেতিবাচক হিসেবে দেখতেন।

এদিক থেকে মাসিক মদীনায় ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. দ্বীন মুহাম্মদসহ যারা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় লেখক। এর পাশাপাশি অনেকের জীবনের প্রথম লেখাটা প্রকাশ হয়েছে মাসিক মদীনায়। আর জীবনের প্রথম লেখা তো আর পত্রিকায় ছাপানোর উপযোগী থাকে না, তারপরও খান সাহেব তা সম্পাদনা করে ছাপিয়ে দিতেন। যেমন আমারটা। আর কোন নতুন লেখক খান সাহেবের কাছে উৎসাহ না পেয়ে নিরাশ হয়ে গেছেন আমার জানামতে এমন ঘটনা ঘটেনি।

মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন আধুনিক সমাজে তার মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে গিয়ে বলেন, উলামায়ে কেরাম বা মাদরাসায় পড়ুয়া, মাদরাসাকে ভালোবাসে এমন, তাদের কাছে খানে সাহেবের গুরুত্ব বা মর্যাদা তো ছিলো অপরিসীম। আর আধুনিক সমাজে মাওলানা মহিউদ্দীন খানের যে সম্মান ছিল, যা আন্দাজ করা যায় মাসিক মদীনার ১৯৯৫ সালের সীরাত সংখ্যা থেকে। যা ১ লক্ষ ৬৫ হাজার কপি ছাপাতে হয়ে ছিলো, যার অধিকাংশ পাঠকই ছিলো সাধারণ শিক্ষিত। এমনকি দেশেরে গন্ডি পেরিয়ে কলকাতাতে প্রতি মাসে মল্লিক ব্রার্দাসের মাধ্যমে ৩৫ হাজার কপি মাসিক মদীনা চলতো।

মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর সাথে বিভিন্ন স্মৃতিকথা জানিয়ে  যাইনুল আবেদীন বলেন, মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. এর সাথে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো আশরাফ আলী থানভী রহ. এর রাজনৈতিক চিন্তাধারা নিয়ে শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. লেখা  ‘হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. কি সিয়াসি আফকার’ এর অনুবাদ করি। এটা যখন বই আকারে প্রকাশিত হয় তখন তার বাসায় যাই এক কপি বই হাদিয়া দিতে। তখন তিনি বিছানা থেকে উঠে আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য আমার বইটা হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখেলেন অনুবাদে আমার নাম লেখা। তখন তিনি বললেন অনুবাদ আপনিই করেছেন। এরপর বইটিতে চুমু খেলেন, কপালে ও বুকে লাগালেন।