যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক কুরআন তিলাওয়াত সংস্থা ‘ইক্বরা’

জানুয়ারি ২২, ২০২০ | মাহবুব শাহীন

 



আন্তর্জাতিক কুরআন তিলাওয়াত সংস্থা ‘ইক্বরা’ ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ‘ইত্তেহাদুল কুররা’ বা বিশ্বের আন্তর্জাতিক ক্বারীদের সংগঠন। সংগঠনটির কার্যকরী সদস্যবৃন্দ সর্বসম্মতিক্রমে ‘International Quran Recitation Association (IQRA)’ নামটিকে গ্রহণ করেছিলেন।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ‘ইক্বরা’-র প্রথম কমিটির সদস্যরা হলেন, মিসরের তৎকালীন শাইখুল কুররা ও ‘ইক্বরা’-র প্রথম সভাপতি শাইখ মাহমুদ খলীল আল হুসারী (রহ.), মহাসচিব হিসেবে পাকিস্তানের ক্বারী যাহের ক্বাসেমী (রহ.),  কার্যকরী সদস্য হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত মিসরের ক্বারী শাইখ আবদুল বাসিত মুহাম্মাদ আবদুস সামাদ (রহ.), তৎকালীন পাকিস্তানের, পরবর্তীতে বাংলাদেশের  প্রধান ক্বারী মাওলানা ক্বারী মুহাম্মাদ ইউসুফ (রহ.), ইয়েমেনের উস্তাদ আলী মুহাম্মাদ শরফুদ্দীন (রহ.), পাকিস্তানের ক্বারী শাকের কাসেমী, পাকিস্তানের মাওলানা আসিফ কাসেমী এবং পাকিস্তানের ক্বারী মুহাম্মাদ ইলিয়াস(রহঃ)।

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে ‘ইক্বরা’ আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলন পরবর্তী বছর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি মাসে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি, রাওয়ালপিন্ডি, পেশাওয়ার এবং পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকার পল্টন ময়দান, চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা এবং সিলেটের আলীয়া মাদরাসা ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সম্মেলনটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মাদ মুসা এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান। সম্মেলনে বিশ্বের ১৭টি দেশের বিশ্ববিখ্যাত ক্বারীগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক কুরআন তিলাওয়াত সংস্থা ‘ইক্বরা’-র আজীবন সদস্য হিসেবে মনোনীত হন।

তাদের মধ্যে রয়েছেন আধুনিক কুরআন তিলাওয়াতের রূপকার ও তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্বারী মিসরের শাইখ মুস্তফা ইসমাঈল (রহ.), ক্বারী শাইখ আতা সুলাইমান রিযক, ক্বারী শাইখ আহমাদ আদ্দিয়াসতি আবুল মা‘আতী (রহ.), ওয়াহিদ জাফর কাসেমী, লেবাননের ক্বারী শাইখ সালাহ উদ্দিন কাব্বারা (রহ.), ক্বারী মাহমুদ শামতলী (রহ.), মালয়েশিয়ার ক্বারী হাসান আল আযহারী, ক্বারী ইসমাঈল বিন হাশিম, ইন্দোনেশিয়ার ক্বারী বাসরী আলউয়ী, ক্বারী আবদুল আযিয মুসলিম, ক্বারী ফুয়াদ যেইন, ইরানের ক্বারী ইবরাহীম আরেফী, ক্বারী মাহদী রুক‘আবী, ক্বারী মুহাম্মাদ রাব‘অী, মরক্কোর ক্বারী আবদুল হামিদ হাসায়েয়ীন, তুরস্কের ক্বারী আবদুর রহমান গোর্সেস, ইরাকের ক্বারী হাফিয সালাহ উদ্দিন, ক্বারী আব্দুর রহমান তৌফিক, সৌদি আরবের ক্বারী মুহাম্মাদ জামীল আ‘শী, সুদানের ক্বারী আহমাদ ইসমাঈল আল বাইলী, ক্বারী সাইয়্যিদ উসমান মানসূর আল র্বারূদী, নাইজেরিয়ার ক্বারী ইয়াকুবু, ক্বারী আরকাসু ওয়ো, শ্রীলঙ্কার ক্বারী এস.এম. বুহারী, ক্বারী মুহাম্মাদ যাকারিয়া,থাইল্যান্ডের ক্বারী সাইয়্যিদ মাহমুদ ও ফিলিপাইনের ক্বারী সা‘আদুদ্দীন আই আলউয়ী এবং রাশিয়ার ক্বারী রহমত উল্লাহ।

১৯৬৭ সালের ২য় আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের ইন্তেকালের পর আন্তর্জাতিক কুরআন তিলাওয়াত সংস্থা ইক্বরা’-র কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

১৯৬৬ সালে সংগঠিত ঐতিহাসিক ৬দফা আন্দোলনের ও ১৯৭১ সালে সংগঠিত স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মাওলানা ক্বারী মুহাম্মাদ ইউসুফ (রহ.) ছিলেন ‘ইক্বরা’-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে দেশের সপক্ষে কাজ করার দায়ে মাওলানা ক্বারী ইউসুফ (রহ.)-কে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দেশটির রেডিও ও টেলিভিশন থেকে বরখাস্ত এবং তার ওপর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জাড়ি করা হয়। মাওলানা ক্বারী ইউসুফ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বাংলাদেশের প্রধান ক্বারী বা শাইখুল কুররা হিসেবে নিযুক্ত করেন। ক্বারী মুহাম্মাদ ইউসুফ (রহ.) বাংলাদেশে ‘ইক্বরা’র কার্যক্রমকে পুনরায় শুরু করার স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। কিন্তু নব্য স্বাধীন একটি দেশে সম্পদের স্বল্পতা এবং দেশজ উন্নয়নের কারণে ‘ইক্বরা’র কার্যক্রম ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুরু করা সম্ভব হয়নি।

১৯ বছর পর ১৯৯১ সালে মাওলানা ক্বারী মুহাম্মাদ ইউসুফ (রহ.) দেশে পুনরায় আন্তর্জাতিক কুরআন তিলাওয়াত সংস্থা ‘ইক্বরা’র কার্যক্রম  শুরু করতে সক্ষম হন। ‘ইক্বরা’ আয়োজিত বাংলাদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একটানা ১৪ বছর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৪ সালের পর দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার কারণে ‘ইক্বরা’-র কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত হয়ে পড়ে।

২০১২ সালে ১৫তম আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ইক্বরা’র কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। বিগত ২৯ বছরে ‘ইক্বরা’ বাংলাদেশে ১৯ বার আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলনের আয়োজন করেছে। ‘ইক্বরা’ আয়োজিত আন্তর্জাতিক এ তিলাওয়াত সম্মলেনটি বিশ্বের উল্লখেযোগ্য ২/৩টি আর্ন্তজাতকি ক্বিরাত সম্মেলনের অন্যতম এবং ‘ইক্বরা’ বিশ্বের একমাত্র বেসরকারি সংস্থা যারা ১৯বার আন্তর্জাতিকভাবে ক্বিরাত সম্মেলন করেছে। বাংলাদেশের সাথে মুসলিম বিশ্বের ভ্রাতৃত্ববোধকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা পালন করছে এই আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলনটি। এছাড়া বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষাদানের লক্ষে আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সংস্থা ‘ইক্বরা’-র অধীনে দেশের প্রথম ও স্বতন্ত্র ইলমে ক্বিরাতের প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ক্বিরাত ইনস্টিটিউট’ দীর্ঘদিন যাবত পরিচালিত হয়ে আসছে।