যে কারণে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করে সেক্যুলাররা | যাহা বলিব সত্য বলিব | এক

মে ৬, ২০১৯

মুসাফির


ভারত বরাবরই উপমহাদেশের দেশভাগ বা দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধীতা করে এসেছে। তাই বলে আমিও যে সে’ মাপকাঠিতে বিরোধীতা করবো, তা নয়। আমার ইতিহাসচর্চা, বুঝ, জ্ঞান ইত্যাদির নিরিখে আমাকে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে, আমার অন্ধ অনুকরণের কোন ব্যাখ্যা থাকে না। আমাদের দেশে একটি শ্রেণী আছে, যারা দাবি করেন: তারা সেক্যুলার এবং ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র ধারক-বাহক, দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করেন ভারতের অবস্থানের মাপকাঠিতে। তাদের এমন অবস্থান যুগ-যুগ ধরে বিতর্কিত হয়ে আসছে। তারা মূলত ভারতীয় শাসকশ্রেণীর দর্শনকে আশ্রয় করে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রসত্ত্বা হিসাবে পাকিস্তানের অভ্যুদয়কে মেনে নিতে পারেনি। আসলে, উপমহাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের রূপকার হলো ভারতীয় বর্ণাশ্রয়ী হিন্দু-সমাজ। কিন্তু কৌশলে সেটার দায়ভার তুলে দেয়া হয় মুসলিমদের কাঁধে। মুসলমানদের ভারত-বিজয়ের পর থেকে মুসলিম শাসকবর্গ কখনও জাতীয় জনগোষ্ঠীকে দ্বিজাতিতত্ত্বের দৃষ্টিতে বিভক্ত করে দেখেনি। তাই মোগল-আমলে বা বাংলার মুসলিম শাসকদের রাজত্বে দরবারের নিম্নপদস্থ থেকে উচ্চপদস্থ পর্যন্ত হিন্দু জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিলো। আসলে দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণাটি আসে হিন্দু-সমাজের বর্ণপ্রথা থেকে। মুসলিম-সমাজের সাথে সহাবস্থান সত্ত্বেও তারা মুসলিমদেরকে ম্লেচ্ছ, যবন, চণ্ডাল ইত্যাদি ঘৃণাত্মক শব্দে বিশেষায়িত করতো। বাংলা সাহিত্যের বাবু রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বঙ্কিম পর্যন্ত সকল ‘অসাম্প্রদায়িক’ মহারথীদের লেখাজোখায় এসব বর্ণবাদী শব্দ প্রয়োগ হয়েছে অনেকবার। কেবল শব্দ-প্রয়োগে নয়, সামাজিক আচার-আচরণেও ওসব শব্দের ব্যবহারিক অনুশীলন হতো অহরহ। কোন পাত্রে মুসলিমের স্পর্শ লাগলে তা বারকয়েক ধুয়েই তবে হিন্দুরা ব্যবহার করতো। কারণ, ম্লেচ্ছের স্পর্শ অহিতকর ও অশুভ। ১৯৯১ সালে ভারতের সাহারানপুর জেলার একটি থানায় আমি নিজে এমন একটি ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবে মুসলিম-সমাজে এসবের প্রতিক্রিয়া হয় অত্যন্ত গভীরে। এ প্রতিক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি–পাকিস্তান সৃষ্টি।

আমাদের এখানকার সেক্যুলাররা, যারা বাঙালি-সংস্কৃতিকে নিজেদের আত্মজ সংস্কৃতি বলে দাবি করেন–তারা পাকিস্তান সৃষ্টির উক্ত বাস্তব প্রেক্ষাপটকে মানতে নারায। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান-পুরুষ মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ার সুযোগ কারো-কারো হয়ে থাকবে। বইটি প্রকাশ করেছে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা। ভূমিকা লিখেছেন তাঁর কন্যা ও বাংলাদেশের বর্তমান সরকার-প্রধান শেখ হাসিনা। বইটির পূর্ণচিত্রে দেখা যায়, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের আশি শতাংশ রাজনৈতিক জীবন কেটেছে মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্বের পক্ষে। বইটির ৩৭ পৃষ্টায় মরহুম শেখ সাহেব লিখছেন–” আমি আর্টসের ছাত্র ছিলাম, তবু নারায়ন বাবু আমাকে খুব ভালবাসতেন। তিনি যদিও জানতেন, আমি প্রায় সকল সময়ই ‘পাকিস্তান, পাকিস্তান’ করে বেড়াই।” অথচ এই শেখ সাহেবকেই এখানকার সেক্যুলাররা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধীতাকারী বলে পরিচিত করার প্রয়াস চালায়। কিন্তু তাঁর লেখা আত্মজীবনীই বলে, তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির জন্যই রাজনীতি করেন এবং সেই রাষ্ট্রটির প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য সত্তরের নির্বাচনে জয়ী হন। যদি পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষীয়রা সাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্রের এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের অনুগত হয়ে থাকেন, তবে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানও সেই কাতার থেকে মুক্ত নন–এটা ইতিহাস প্রমাণ করে। সেক্যুলারদের আরও মনে রাখা উচিৎ, ১৯৪৬ সালে তাদের কথিত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানেরও একটি ভোটের ভূমিকা ছিলো এবং তিনি সেই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হতে সত্তরের নির্বাচন করেছিলেন।

সেক্যুলারদের একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয়। তারা স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারেনি নিখাদ বিদ্বেষবশত। স্বতন্ত্র মুসলিম জাতিসত্ত্বা ও সংস্কৃতিচর্চার প্রতি ওদের বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি লুকাবার নয়। ভারতের শাসক এলিট-শ্রেণীর মনোভাব থেকেই এ ধরনের মানসের জন্ম। এটাই হচ্ছে উগ্র-সাম্প্রদায়িকতা যা জাতিকে বিভক্ত করে রাখে। বাংলাদেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের অবসান হলো বলে সেক্যুলাররা যে আস্ফালন করেন তার শেকড় রাজনীতিতে নয়, মুসলিমবিদ্বেষে। ভারতে হাজার বাবরী মসজিদ ভাঙ্গুক, গুজরাটে পশুর মতো মুসলিম জবাই করুক–তাতে এখানকার সেক্যুলারদের কিছু আসে যায় না। পক্ষান্তরে, পাকিস্তান-বাংলাদেশে একজন হিন্দুর গায়ে ধুলো পড়ুক, তাতে আর রক্ষা নেই। ওদের মানবিকতা আর দরদের সাইক্লোন বয়ে যায়। বিদেশের পা চুমে চিৎকার করে উঠে: এখানে সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে। বাস্তবিকই, সেক্যুলারদের খাসলত ব্যতিক্রমী।

আমাদের এখানকার সেক্যুলাররা আরেকটি কথা বলেন, আর তা হলো, তারা বিশ্বাস করেন না: পাকিস্তান না হলে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ হতো না। কথাটি সেক্যুলারদের মোটামাথার স্থূলবুদ্ধি ছাড়া অন্য কিছুকে প্রমাণ করে না। তারা ভুলে যায়, মায়ের জন্ম না হলে সন্তানের জন্ম হয় না। সন্তান জন্ম নেয় মায়ের গর্ভেই। বাংলাদেশ পূর্বপাকিস্তান হয়ে পশ্চিম-পাকিস্তানের সাথে মিলে পূর্ণ-পাকিস্তান গঠন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম-ভোটে। এখান থেকেই পরে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। বলতে দ্বিধা নেই, পূর্ণ-পাকিস্তানের গর্ভেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্ম। ২৬ শে মার্চের আগ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান যেমন পাকিস্তানকে মাতৃভূমি বলেছেন তেমনি পূর্বপাকিস্তানের আম-জনতাও বলেছেন। যদি বাংলাদেশ ১৯৪৬ সালে পাকিস্তানের সাথে না থেকে কোলকাতার সাথে থাকতো, তবে কি ভারতের কাছ থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হতে পারতো?–সেক্যুলাররা জবাব দেবেন কি? পাগলেও একথা বোঝে, গর্ভের সন্তান মায়ের প্রকৃতি বহন করে। তেমনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও যে মুসলিম জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে ১৯৪৬ সালে পাকিস্তানের জন্ম, সে জাতিসত্ত্বার চরিত্র স্বাধীন বাংলাদেশে ৪৮ বছর পরেও সমুজ্জ্বল। এখানে সেক্যুলাররা যতোই মঙ্গল-প্রদীপ জ্বালাক, তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির মিছিল দিক, মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করুক–তাতে এদেশের ১৬ কোটি মুসলিম তাঁদের মুসলিম জাতিসত্ত্বাকে কখনোই ভুলে যাবে না। এখানেই সেক্যুলারদের নির্মম পরাজয়। সিনহারা যতোই এদেশকে সেক্যুলার বলুক, রাষ্ট্রের নীতিতে যতোবারই ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকুক–এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম মুসলিমই থাকবে, সেক্যুলার হবে না। কারণ, সেক্যুলারিজম একটি অবাস্তব ধারণা।