মহান বদর যুদ্ধ প্রমাণ করে রমজান মুসলমানদের বিজয়ের মাস

মূল: ড. আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবি
অনুবাদ: নাহিয়ান হাসান


মহান বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের ধারাটি ছিল রমজান মাসে বিজয় পরিক্রমার প্রারম্ভিকতা। রমজান বিজয়, সাহায্য, কল্যাণ এবং ক্ষমতায়নের মাসও বটে। কেননা এই মাসে ঈমানী মূল্যবোধ ও উচ্চমানের নৈতিকতার যা কিছুই রয়েছে তা মুসলমানদের সাথে এমন ধৈর্যের সন্নিবেশ ঘটায় যা নিরবিচ্ছিন্ন। তা এমন সংকল্পের সমাহার ঘটায় যা শেষ হওয়ার নয় এবং এমন পদক্ষেপ নিতে উদ্ভুদ্ধ করে যার কোনো সীমারেখা নেই। আর যদি আপনি রমজান মাসে ঘটে যাওয়া মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর কথা স্মরণ করেন তবে প্রথমেই প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির কথা স্মরণে আসে তা হল, মহান বদরের যুদ্ধ। যে যুদ্ধে মুসলমানেরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে কাফেরদের সেনাবাহিনী ও কুরাইশদের বাতিল নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিল।

যুদ্ধের ইতিহাস ও তা সংঘটিত হওয়ার স্থান:

মহান বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরির ১৭ই রমজান সোমবার সকালে ঐতিহাসিক ‘বদর প্রান্তরে’। বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর জন্য সে জায়গাটি ছিল শাম অভিমুখে সফর করার এবং পবিত্র মক্কা নগরীতে ফিরে আসার একধরনের স্টেশন বা মূলকেন্দ্র। এর ভৌগোলিক অবস্থান মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি সাফরা উপত্যকার নিম্নাঞ্চলে হওয়ায় আরবের প্রসিদ্ধ বাজারগুলোর একটি বাজার হতে একে সাহায্য করেছে।

যুদ্ধের কারণ:

মুসলমানেরা মুশরিকদের পূর্বেই বদরের প্রান্তরে পৌঁছে গিয়েছিল এবং হাব্বাব ইবনে মুনজির রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বদর প্রান্তরের পানির স্থানকে নিজেদের পশ্চাতে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরামর্শ কবুল পূর্বক তার মতানুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন।

মাদানি যুগে জিহাদের অনুমতি লাভের পর মুসলমানদের কাছে কুরাইশদের একটি বড় কাফেলার গতিবিধির খবর পৌঁছে যে কাফেলাটি প্রচুর পরিমাণে খাদ্যসামগ্রী ও ধন-সম্পদ বোঝায় করে আবু সুফিয়ান এবং সাখার ইবনে হারবের নেতৃত্বে শাম থেকে মক্কায় ফিরে আসছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদেরকে বের হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামগণ আওয়ালীর বাসিন্দাদের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়াই তখন যারা প্রস্তুত ছিল তাদের সাথে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন যাতে তারা সেই কুরাইশী কাফেলাকে হারিয়ে না ফেলেন। একারণেই মুসলমানেরা বদরের যুদ্ধে পরিপূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে বের হতে পারে নি। তারা কাফেলাকে ধরতে বের হয়েছিলেন। কুরাইশের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার খেয়াল তাদের ছিলো না।

মুসলমানদের মধ্যে তিন শত তের জন লোকের একটি দল বের হয়েছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ২৪০ দুই শত চল্লিশ জন ছিলেন মদিনার আনসারী সাহাবী। তাদের সাথে শুধুমাত্র ২জন ঘোড়সওয়ারী ছিলেন আর ছিল ৭০ সত্তরটি উট যেগুলোতে তারা পর্যায়ক্রমিক পালা অনুসারে আরোহন করছিলেন। কাফেলা জব্দ করতে মুসলমানদের বের হওয়ার খবর ‘আবু সুফিয়ান’ জেনে গিয়েছিলেন ফলে তিনি পথ পরিবর্তন করে উপকূলবর্তী রাস্তা অবলম্বন করে সাহায্যের জন্য মক্কার কুরাইশদের একত্রিত করতে একজন দূত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কুরাইশরা তখনই তাদের কাফেলাকে রক্ষা করার জন্য বেরিয়ে পরতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল এবং তারা তাদের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে ফেলেছিল। তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক লোকই এতে দ্বিমত পোষণ করেছিল। কুরাইশরা মুসলমানদের এই দুঃসাহসিকতাকে নিজেদের অবস্থানকে হীন করা, প্রভাবপ্রতিপত্তিকে অপমানিত করা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত হিসেবে বিবেচনা করেছিল। ফলে তাদের যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ১০০০ এক হাজারে পৌঁছেছিল। এবং তাদের সাথে ছিল ২০০ দুই শত ঘোড়সওয়ার যারা অগ্রভাগে থেকে তাদেরকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল।

যুদ্ধ শুরুর আগের ঘটনা:

কাফেলা বেঁচে যাওয়ার পর যুদ্ধে যাতে দুপক্ষের মাঝে যাতে বিদ্রোহের সূত্রপাত না হয় তা নিয়ে পরামর্শ করার সময় মুশরিকদের দলে ‘মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ না করে ফিরে যেতে যারা ইচ্ছুক’ ও আবু জাহেলের মতো যারা মরণপণ লড়াইয়ে প্রস্তুত তাদের মাঝে মতানৈক্য দেখা দেয়। কিন্তু পরিশেষে আবু জাহেলের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। কুরাইশদের কাফেলা ছেড়ে পালানো উদ্দেশ্য ছিল না বরং উপকূলবর্তী পথ অবলম্বন করে সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে মুসলমানদেরকে সাজা দেওয়া এবং বাণিজ্যিক পথটি নিরাপদ করে পুরো আরববাসীদেরকে কুরাইশদের শক্তিসামর্থ্য ও আত্মমর্যাদা সম্পর্কে বার্তা দেওয়াই ছিল তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সংবাদ এলো যে সেই বৃহৎ কাফেলাটি জব্দ হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছে এবং তার(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) সাথে যুদ্ধের জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন তিনি তার সকল সাহাবিদের সাথে একটি বৈঠক করেন এবং খাস আনসারী সাহাবায়ে কেরামের সামনে বক্তব্য রাখেন। অতপর মুহাজিরদের মধ্যে আবু বকর সিদ্দিক, ওমর ইবনুল খাত্তাব ও মিকদাদ ইবনে আমর (রিদওয়ানুল্লাহি আলাহিম) কথা বলেন। তারা অত্যন্ত চমৎকার কথা বলেছিলেন। সাদ ইবনে মুআজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মানসা বুঝতে পেরেছিলেন এবং তিনিও অত্যন্ত চমৎকার কথা বলেছিলেন। অতপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ ইবনে মুআজ (রাঃ) এর কথায় অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।

যুদ্ধকালীন ঘটনা ও যুদ্ধের সূচনা:

মুসলমানেরা মুশরিকদের পূর্বেই বদরের প্রান্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং সাহাবী হাব্বাব ইবনে মুনজির(রাঃ) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বদর প্রান্তরের পানির স্থানকে নিজেদের পশ্চাতে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরামর্শ কবুল করে নিয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের সকালে বদর প্রান্তরের যোদ্ধাদের নাম স্পষ্ট করে দিতেন। তিনি বলতেন, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল যুদ্ধের দিনটি অমুক যোদ্ধার এবং ইনশাআল্লাহ অমুক দিনটি অমুক যোদ্ধার এবং তিনি তার সৈন্যদলকে কয়েক কাতারে সারিবদ্ধ করতেন। এবং সাদ ইবনে মুআজ (রাঃ) এর পরামর্শে তিনি সারিবদ্ধ সেনাদলের কেন্দ্রবিন্দু (আরিশে) অবস্থান করে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তখন তিনি আপন রবের নিকট এতো বেশি দোয়া করতেন যে তার চাদর মোবারক খুলে পরে যেতো। তারপর আবু বকর সিদ্দিক(রাঃ) এসে বলতেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার রবের কাছে আপনি যথেষ্ট প্রার্থনা করেছেন। নিশ্চয় তিঁনি আপনাকে দেওয়া তাঁর প্রতিশ্রুত বিনিময় দিবেন। অতপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেন,
(إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَٱسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِّنَ ٱلْمَلاۤئِكَةِ مُرْدِفِينَ)আনফাল:৯

তারপর নবী(সাঃ)
{سَيُهْزَمُ ٱلْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ ٱلدُّبُر}[ক্বমার:৪৫]

এই আয়াতটি বলতে বলতে তাবু থেকে বের হয়ে যান।

এবং তিনি মুশরিকদের মুখ লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক কোরআনে কারীমে উল্লেখ করেন,
{وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ رَمَىٰ} [আনফাল:১৭]

উতবা ইবনে রবীয়াহ সামনে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের সূচনা হয়। তার দেখাদেখি তার ছেলে ওয়ালিদ এবং আপন ভাই শাইবাও সামনে অগ্রসর হয় এবং দুজনেই তাদের সাথে লড়াই করার জন্য বিপক্ষের সাহসীদের চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকে। আনসারীদের কিছু নওজোয়ান সামনে অগ্রসর হলে তারা তাদের সাথে লড়াই করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তাদের চাচাদের গোত্রের বংশধরদের সাথে লড়াইয়ে প্রত্যাশী বলে জানায়। অতপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনে আবু তালেব, হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং উবাইদা ইবনুল হারেস (রিদওয়ানুল্লাহি আলাইহিম) কে লড়াইয়ের আদেশ দেন। তখন হযরত হামজা(রাঃ) উতবাকে এবং হযরত আলী(রাঃ) শাইবাকে হত্যা করে ফেলেন। হযরত উবাইদা(রাঃ) ও ওয়ালিদের মাঝে প্রচন্ড লড়াই হয় তারা দুজনের লড়াই ফলাফল শূন্য থেকে যায়। তারপর হযরত আলী ও হামজা (রাঃ) ওয়ালিদের দিকে এগিয়ে যায় এবং তাকে হত্যা করে এবং তারা হযরত উবাইদা(রাঃ)কে বহন করে নিয়ে আসে। এই লড়াইয়ের ফলাফল কুরাশদেরকে খুব বিচলিত করে ফেলে এবং শুরু হয় মুহুর্মুহু আক্রমণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের আদেশ দিয়েছিলেন তারা যেনো মুশরিকদেরকে তীর নিক্ষেপ করে যদি তারা তীরের নাগালে মুসলমানদের কাছাকাছি চলে আসে।

মুসলিমরা আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তরে ও বাইরে সামরিক দক্ষতা এবং যুদ্ধের নতুন পদ্ধতিতে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিল। আবু জাহল বিন হিশাম এবং উমাইয়া বিন খালাফ নিহত হওয়া ছাড়াও কুরাইশদের ক্ষয়ক্ষতির পাল্লা অনেক ভারী ছিল।

অতপর উভয় দল ব্যাপকভাবে ঘোরতর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যায়। যুদ্ধের দিন আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে ফেরেশতা মারফত সাহায্য করেছিলেন। কোরআনে কারীমে আল্লাহ পাক বলেন,
{إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَٱسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِّنَ ٱلْمَلاۤئِكَةِ مُرْدِفِينَ * وَمَا جَعَلَهُ ٱللَّهُ إِلاَّ بُشْرَىٰ وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُمْ وَمَا ٱلنَّصْرُ إِلاَّ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ} [আনফাল:৯-১০].

মুখোমুখি তুমুল লড়াইয়ে ৭০জন মুশরিককে হত্যা করে মুসলিম বাহিনী। এবং তাদেরকে হত্যা করেছেন ঐ সমস্ত আহলে বদর যোদ্ধা যাদের নাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের পূর্বে ঘোষণা করে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছিলেন। তাদের মধ্য হতে কেউই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্ধারণ করা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হন নি। আর তারা যাদেরকে হত্যা করেছিলেন তাদের মধ্যে কিছু ছিল কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। আর তারা হল,,আবু জাহেল,,আমর ইবনে হিশাম। আবু জাহেলকে মোয়াজ ইবনে আমর ইবনুলজুমুহ এবং মুয়াজ ইবনে আফরা নামী দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক দুঃসাহসী সাহাবী হত্যা করেছিলেন তবে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাঃ) তাকে চূড়ান্তভাবে নিঃশেষ করে দেন। হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ(রাঃ) আনসারীদের একটি দল ও অন্যান্যদেরকে সাথে নিয়ে উমাইয়া ইবনে খালফ ও তার পুত্রকে হত্যা করেছিলেন। অতপর রাসুল (সাঃ) মৃত মুশরিকদেরকে বদর প্রান্তরের কূপসমূহে অপসারণ করার নির্দেশ দিলে সাহাবায়ে কেরাম তাদের লাশগুলো সেখানে নিক্ষেপ করেন। কুরাইশদের বন্দী সংখ্যাও ছিল ৭০ সত্তর জন আর বাকি মুশরিকরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালানোর সময় প্রচুর গণিমতের মাল রেখে গিয়েছিল এমনকি তারা একটিবারের জন্যেও পিছন ফিরে তাকানোর সাহস পায়নি। পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের শহীদদেরকে দাফন করেন। আর মুসলিমদের পক্ষে শহীদ হয়েছিলেন ১৪ চৌদ্দ জন সাহাবী।

যুদ্ধের ফলাফল:

অবশেষে মুসলমানদের গোড়া পাকাপোক্ত হল। এবং গোটা আরব উপদ্বীপে তারা হয়ে উঠল অন্যতম পরাশক্তি। এতে মদিনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান আরো মজবুত হয়। সেখানে ইসলামের নক্ষত্র আরো উপরে উন্নীত হয়।

যারা নতুন দ্বীনের আহবানে সন্দেহবাদী তারা সন্দেহ পোষন করতে, মদিনার মুশরিকরা তাদের কুফুরী প্রকাশ করতে ও ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করার দুঃসাহস করেনি। ফলে কপটতা, ষড়যন্ত্র এবং ধোকাবাজি প্রকাশ পেল। তারা নবী ও সাহাবীদের সামনে ইসলাম জাহির করতো। আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি মুসলমানদের বিশ্বাস দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, মুশরিকীনে কুরাইশদের মধ্য হতে বেশকিছু লোক ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করেছিলেন। এগুলোর ফলে যারা তখনো মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন তাদের হিম্মত বাড়তে থাকে, তাদের অন্তরাত্মা আল্লাহ’র সাহায্যের আনন্দে ভরে উঠতে থাকে। তারা ভিতরে ভিতরে আশ্বস্ত হচ্ছিলেন যে বিজয় অতি সন্নিকটে। তাদের ঈমান আরো দৃঢ় হতে থাকে এবং তারা তাদের একত্ববাদের ঈমানে অটল থাকে।

মুসলিমরা আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তরে ও বাইরে সামরিক দক্ষতা এবং যুদ্ধের নতুন পদ্ধতিতে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিল। আবু জাহল বিন হিশাম এবং উমাইয়া বিন খালাফ, উতবা ইবনে রবীয়াহ ছাড়াও আরো কাফের নেতৃবৃন্দ যারা ছিল কুরাইশদের মধ্যে অত্যাধিক সাহসী, শক্তিশালী ও প্রভাবশালী তারা নিহত হওয়া ছাড়াও কুরাইশদের ক্ষয়ক্ষতির পাল্লা অনেক ভারী ছিল। এই পরাজয়ের ফলে মুশরিকীনে কুরাইশদের শুধুমাত্র যুদ্ধলব্ধ ক্ষতিই হয়নি বরং এই যুদ্ধের ফলে তাদের নৈতিক পরাজয়ও ঘটেছিল। আর তা হল, এই পরাজয় শুধুমাত্র উক্ত অঞ্চলে তাদের বাণিজ্যকে হুমকিতে ফেলেনি বরং সমগ্র হেজাজে তাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে ফেলে দিয়েছিল হুমকির মুখে। এ কারণেই আল্লাহ পাক উক্ত দিনটিকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ তথা সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যের দিন নামে পবিত্র কোরআনে পাকে অভিহিত করে বলেন,
{وَمَآ أَنزَلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا يَوْمَ ٱلْفُرْقَانِ يَوْمَ ٱلْتَقَى ٱلْجَمْعَانِ} [আনফাল:৪১]

এই যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা হক এবং বাতিলের মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। এবং তিঁনি হকের কালিমাকে বাতিলের কালিমা থেকেও সুউচ্চে উন্নীত করেছেন, তাঁর দ্বীনকে প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং তাঁর নবী ও তার যোদ্ধাদেরকে সাহায্য করেছেন।

  • ১~ইমাম তাবারী: তারীখুল উমাম ওয়ার রুসুল ওয়াল মুলূক যা তারীখে তাবারী নামে প্রসিদ্ধ। খঃ২য়। পৃঃ৪০৪।
  • ২~আলী সাল্লাবী: ‘আস সীরাতুন নাবাওয়িইয়্যাহ’ এবং ‘আরজু ওয়াকাইয়ীন ওয়া তাহলীলু আহদাসীন’। পৃষ্ঠা নং যথাক্রমে ৫৫৩ এবং ৫৯০।
  • ৩~মোহাম্মদ আল আবেদ: হাদিসুল কোরআনী আন গাজওয়াতী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। খঃ১ম। পৃঃ ৯১-৯৯।
  • ৪~মাহমুদ শিত খাত্তব: গাজওয়াতু বদরিল কুবরাল হাসিমাহ। পৃঃ২৩-২৪।
  • ৫~ইমাম মুসলিম: সহীহ মুসলিম।অধ্যায়, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার। বাব,ফেরেশতা কর্তৃক বদর যুদ্ধে সাহায্য ও গণিমতের সম্পদের বৈধতার আলোচনা।খঃ৩য়। পৃঃ ১৩৮৪।
  • ৬~মাহদী রিজকুল্লাহ আহমদ: আস সীরাতুন নাবাওয়িইয়াতু আলা দূয়িল মাসাদিরিল আসলিয়্যাহ। অধ্যায়, দিরাসাতু তাহলীলিয়্যাহ।
  • ৭~ইয়াকুত আল হামাওয়ি: মু’জামুল বুলদান। খঃ ১ম। পৃঃ৩৫৭।