শাপলা : এক রক্তাক্ত আমানত | পর্ব : চার

মে ৮, ২০১৯

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী


[চার]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা The Economists ২০১৩ সালের ৭ ই মে শাপলা-হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের খবরের শিরোনাম ছিলো, Violance on the streets অর্থাৎ, সড়কে সহিংসতা। প্রতিবেদনটিতে তারা লিখছে:
It took place in the commercial district of Dhaka, Bangladesh’s capital. At least 37 were killed and hundreds more injured in clashes between security forces and members of an extreme Islamic group, Hefajat-e-Islam.
………Details of precisely what happened on May 6th remain unclear. Graphic pictures and video footage of the violence show bloodied bodies strewn on the streets of Dhaka’s Motijheel commercial district. The government closed two pro-Islamic television stations that had been broadcasting live images of the attacks. That leaves only one pro-opposition television channel (BanglaVision) functioning.
[ ঘটনা ঘটে রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকায়। নিহতের সংখ্যা ন্যূনতম ৩৭ জন এবং নিরাপত্তা-বাহিনীর সাথে চরমপন্থী দল হেফাজতে ইসলামের সংঘর্ষে আহত শতাধিক।
……৬ ই মে আসলে কী ঘটেছিলো তা সবিস্তারে স্পষ্ট নয়। সহিংসতায় তোলা ছবি, ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে আছে। সরকার দু’টো ইসলামপন্থী টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয় যারা আক্রমণের খবর ও ছবি সরাসরি সম্প্রচার করছিলো। সে-সময় বিরোধী সমর্থক টিভি চ্যানেল কেবল বাংলা ভিশন সচল ছিলো।”]

বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা The Guardian.। ২০১৩ সালের ৬ ই মে সংবাদপত্রটি ‘Bangladesh protest violence leaves more than 30 people dead’ ( বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ তিরিশ জনের বেশি লোকের প্রাণহানি) নামে শাপলা হত্যাকাণ্ডের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়:
“At 2.30am local time on Monday, about 5,000 law enforcement personnel, including members of the police and paramilitary troops, proceeded towards the gathering of at least 70,000 Hefazat activists.

In the darkness, with power to the area cut, police reportedly charged into the gathering, lobbing tear gas and stun grenades and firing into the crowd.

Earlier, they had ordered the Hefazat activists to leave using megaphones. At least 22 people died in the clashes, most of them supporters of Hefazat, according to police and hospital sources. Doctors at Dhaka Medical College Hospital said many of those dead had been shot in the head.”
[ সোমবার, স্থানীয় সময় ভোররাত ২.৩০ টা। পুলিস, প্যারামিলিটারি বাহিনীসহ ৫০০০ নিরাপত্তা-বাহিনী কমপক্ষে ৭০,০০০ হেফাজত কর্মীর সমাবেশের দিকে অগ্রসর হয়।
চারদিকে অন্ধকার, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে নিরাপত্তা-বাহিনী টিয়ারগ্যাস, গ্র্যানেড ব্যবহার করে ও গুলি চালিয়ে করে সমাবেশ আক্রমণ করে।
আগে তারা হেফাজত কর্মীদেরকে মাইক বন্ধ রাখতে বলে। হামলায় কমপক্ষে ২২ জন মারা গেছে। তাদের অধিকাংশই হেফাজত সমর্থক। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডাক্তাররা জানিয়েছেন, নিহতদের বেশির ভাগই মাথায় গুলিবিদ্ধ ছিলো।]

এবার আমরা দেখবো, দেশীয় সংবাদ-মাধ্যমের রিপোর্ট। শাপলা হত্যাকাণ্ড নিয়ে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার রিপোর্ট এখানে প্রণিধানযোগ্য। ২০১৩ সালের ৭ ই মে পত্রিকাটি ‘যুদ্ধ বিধ্বস্ত রূপে মতিঝিল-পল্টন’ শীর্ষক একটি সরেজমিন রিপোর্ট ছাপে। রিপোর্টটি তৈরি করেন দুই প্রতিবেদক নুরুজ্জামান ও উৎপল রায়। ৫ ই মে’র রাত থেকে ৬ ই মে’র দিনের আলো পর্যন্ত মতিঝিল ও আশেপাশের হাল-হাকীকত তুলে ধরা হয় রিপোর্টে। রিপোর্টে বলা হয়:

“রাস্তায় দুই পাশে ছাই আর ধ্বংসাবশেষ। রাস্তায় ইট পাথর ছড়ানো -ছিটানো। বিদ্যুতের খুঁটি ভাঙ্গা। ডিভাইডারগুলো ভেঙ্গেচুরে একাকার। দোকান, গাড়ি, আসবাব পুড়ে পুড়ে আছে রাস্তায়। রক্ত, কাদামাখা হাজার হাজার জুতার স্তুপ। রক্তমাখা টুপি, পান্জাবি পড়ে আছে এখানে-সেখানে। দু’দিন আগেও রাস্তাজুড়ে সেখানে ছিল সবুজ গাছের সারি। টবসহ তুলে ফেলে রাখা হয়েছে রাস্তায়। ৫ ই মে’র সহিংসতা ও রাতের যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর এ চিত্র ছিল রাজধানীর মতিঝিল ও পল্টন এলাকার। এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোন এলাকার দৃশ্য। সকাল থেকে দিনভর সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নের কাজ করলেও পুরো স্বাভাবিক হয়নি।

সকালে দেখা যায় পিচ ঢালা পথে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গুলির খোসা। সঙ্গে ঝোপ ছোপ রক্তের দাগ। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে পরিচ্ছন্ন কর্মীরা তা সরিয়ে ফেলেন। সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ট্রাকযোগে বিভিন্ন ভাগাড়ে ফেলে দেয়া হয়। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা জানান, রূপালী ব্যাংক ভবনের সামনের রাস্তায় ছোপ ছোপ রত্তের দাগ ছিল। অনেক জায়গায় রক্তাক্ত মাংসের টুকরা পড়ে ছিল। এ ছাড়া হাজার হাজার স্যান্ডেল, ব্যাগ, পান্জাবি, গেন্জি ও পানির বোতল সরিয়ে ফেলেছেন তারা। এর মধ্যে যত্রতত্র অবস্থায় ছিল অসংখ্য গুলি ও টিয়ার শেলের খোসা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত মুহুর্মুহু গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সময়ে নানা বয়সী মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসে। এর ঘণ্টাখানেক পর সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল মতিঝিল এলাকা। সূত্রমতে, ঘুটঘুটে অন্ধকারে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান ও মুহুর্মুহু গুলিতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে।”

মজার ব্যাপার হলো, শাপলার হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদ-সম্মেলন করে বলা হয়: কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। যেমন, ২০১৩ সালের ৬ ই মে’র সরকারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয়:
“গতকাল রাতে (৫ ই মে) হেফাজতের শত শত লাশ গুম হয়েছে’—বিএনপির নেতা এম কে আনোয়ারের এমন দাবির বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী কোনো প্রাণহানি না ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে হেফাজতের কর্মীদের মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে বের করে দিয়েছে। সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।’
আজ বিকেলে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হানিফ এ দাবি করেন। দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।…… আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘মতিঝিলে একটি সফল অভিযান পরিচালনার জন্য র্যাব, পুলিশ ও বিজিবিকে অভিনন্দন জানাই। কোনো হতাহতের ঘটনা ছাড়াই হেফাজতকে ঢাকা থেকে বের করে দেওয়ায় রাজধানীবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।’ ………… আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা হেফাজতের ওপর কোনো হামলা করেনি দাবি করে হানিফ বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা করলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিহত করে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মী হেফাজতের ওপর হামলা করেনি” (দৈনিক প্রথম আলো)। শাপলা-হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারের এ অবস্থান এখনও বহাল আছে। সরকার-প্রধান শেখ হাসিনাও হত্যাকাণ্ড পরবর্তীকালে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ‘কোন হতাহত হয়নি’ বলে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেন। বরঞ্চ তিনি আরও ক’কদম বাড়িয়ে “হেফাজত কর্মীরা গায়ে রঙ মেখে শুয়েছিলো, পুলিশ দেখে দৌড় দেয়” মর্মে উপহাসসূলভ বক্তব্য দিয়ে জাতিকে অবাক করে দেন।

এবার আমরা দেখবো, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান। ৭ ই মে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি কেন্দ্রীয় বক্তব্য আসে জাতীয় কয়েকটি দৈনিকে। বক্তব্যের শিরোনাম ছিলো–‘৩ হাজার নেতা-কর্মীর শাহাদাত॥ আহত ১০ সহস্রাধিক॥ নিখোঁজ অসংখ্য’। হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগরীর যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা জাফরুল্লাহ খান কর্তৃক প্রেরিত উক্ত বিবৃতিতে বলা হয়:
“পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি’র সমন্বয়ে যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যুগপৎ হামলায় রাজধানীর মতিঝিলস্থ শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে রোববার গভীর রাতে ঘুমন্ত আলেম-ওলামাদের ওপর নির্বিচারে গুলী, বোমা, গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার আলেম-ওলামা ও হেফাজত নেতা-কর্মীদের হত্যা এবং শহীদদের লাশ গুমের তীব্র নিন্দা-প্রতিবাদ ও শহীদদের রূহের মাগফেরাত কামনা করে বিবৃতি দিয়েছেন সংগঠনের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ”( দৈনিক সংগ্রাম)। উল্লেখ্য, হেফাজতে ইসলামের এ অবস্থান এখনও বহাল আছে, কোন পরিবর্তন হয়নি বক্তব্য প্রত্যাহার করে।

২০১৩ সালের ৭ ই মে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আরও একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়। সম্ভবত, সেটি চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো হয়। হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও মাওলানা মাইনুদ্দীন রূহী কর্তৃক প্রেরিত উক্ত বিবৃতির শিরোনাম ছিলো–‘শাপলা চত্বরের ঘটনা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যা ॥ সারা দেশে তাওহীদি জনতাকে রাজপথে অবস্থান নেয়ার নির্দেশ’। বিবৃতিটিতে বলা হয়:
“হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকে রোববার ৫ মে’র ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে সরকারের পেটোয়াবাহিনী, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও শাহবাগী নাস্তিকরা সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যা সংঘটিত করেছে। বিভিন্নস্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের কোনও সম্পর্ক নেই। সরকার নজিরবিহীনভাবে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে পুলিশ, বিজিবি র‌্যাব ছাড়াও প্রচুর সংখ্যক বিদেশী-সশস্ত্র ও লোক দিয়ে আচমকা সমাবেশস্থলে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা সেই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞে কমপক্ষে দুই সহস্রাধিক নেতাকর্মী শাহাদাত বরণ করেছেন। আহতের সংখ্যা আড়াই হাজারের মতো। অনেক লাশ গুম করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের ময়লা বহনের গাড়িতে করে বিপুলসংখ্যক লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আমাদের বহু নেতাকর্মীর এখনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। সংগত কারণে আহত ও নিহতের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে জানানো সম্ভব হচ্ছে না”(দৈনিক সংগ্রাম)।

উল্লেখ্য, ঘটনা পরবর্তীকালে অভিন্ন ভাষায় হেফাজতে ইসলামের পক্ষে আরও যেসব নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন দৈনিকে বিবৃতি দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন:
ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, উপদেষ্টা মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, সদস্য সচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, যুগ্ম-আহ্বায়ক মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, মুফতী তৈয়্যেব, মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী, মাওলানা মনজুরুল ইসলাম, প্রচার সেলের প্রধান মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াছেল, মাওলানা শফিক উদ্দিন, মাওলানা মহি উদ্দিন ইকরাম, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মাওলানা শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা রিয়াজতুল্লাহ, মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ আরমান, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আলতাফ হোসাইন প্রমুখ।

(চলবে)