শাপলা : এক রক্তাক্ত আমানত | পর্ব : পাঁচ

মে ৯, ২০১৯

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী


[পাঁচ]
শেষপর্ব

সম্মানিত পাঠক, আমরা এখন আলোচনার গোধূলিতে এসে পৌঁছেছি। আলোচনার দীর্ঘ পরিক্রমায় আমরা দেখে এসেছি শাপলা-হত্যাকাণ্ডের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তথ্যসূত্রের বিবরণ; সরেজমিন-প্রতিবেদন। আশা করি, এসব তথ্য-উপাত্ত সুপ্রিয় পাঠকবর্গকে যেমন সন্দেহমুক্ত করবে, তেমনি তাঁদের বিশ্বাসের অনুকূলে দলীল হিসাবে বেঁচে থাকবে। যাক, সংবর্ধনা সভায় সরকারের সামরিক সচিবের বক্তব্যের সত্যমিথ্যাও আমরা খুব কাছ থেকে দেখে এলাম। ২০১৩ সালের ৫ ই মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা-চত্বরে রাতের আঁধারে একটি পূর্বনির্ধারিত হত্যাকাণ্ডের বাস্তবতাকে অস্বীকৃতির যে ভয়াবহ ও বেদনাত্মক নকশা আমরা তখন থেকেই দেখে আসছি, তা আজও যে সরকারের অনু-পরমাণুতে প্রবাহিত–সে-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর চেয়ে ঢের ভয়াবহ লেগেছে সচিবের বক্তব্য-পরবর্তী সংবর্ধনা-মঞ্চে উপস্থিত কওমী-জগতের একটি পরিচিত অংশের নীরব-সম্মতির দৃশ্য দেখে–যা বহির্জগতে এমন বার্তা দেয় যে, শাপলার-চেতনার প্রশ্নে কওমীদের ঐ অংশটিও সরকারের গভীর পরিকল্পনার সাথে অভিন্ন-মত পোষণ করেন।

এখানে আমরা একটি মৌলিক-প্রশ্নের সমাধানে ব্রতী হতে চাই। প্রশ্নটি হলো, শাপলা-ট্র্যাজেডিকে কেন ওরা কওমীদের মন থেকে মুছে দিতে চায়? প্রশ্নটি উপলব্ধি করছি শাপলা-ট্র্যাজেডি’র পর থেকে। এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য আমরা কওমীদের জানতে হবে শাপলাতে আমরা এসেছিলাম কেন? বলাবাহুল্য, পার্থিব কোন উদ্দেশ্য বা রাজনৈতিক ফায়দার জন্য হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে কওমী-জগৎ ঢাকা অবরোধে যায়নি। সবাই জানেন, ঐ সময়টাতে অনলাইনে একশ্রেণীর নাস্তিক ও ইসলাম-বিদ্বেষী ব্লগার ইসলাম, কুরআন, মহানবী সা. ইত্যাদি নিয়ে কুরুচিপূর্ণ অপবাদ দিতে থাকে; মন্তব্য করতে থাকে। এ বিষয়ে কওমী-জগৎ বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঐ নাস্তিকগোষ্ঠীর পেছনে সরকারের মদদ ও আশ্রয় জাতির কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নাস্তিক ব্লগার পাপিষ্ঠ রাজিব খুন হলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ’ আখ্যা দেয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের চরিত্র ফুটে ওঠে [আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ব্লগার রাজীব দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ। রাজীব চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রক্ত দিয়ে উজ্জীবিত করে গেছেন তরুণ প্রজন্মকে (প্রথম আলো ১৬.০২.১৩)]। শুধু তাই নয়, ২০১৩ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারী যখন পাপিষ্ঠ রাজিব খুন হয় সরকার প্রধান শেখ হাসিনা সেদিন বিকালে রাজিবের বাসায় গিয়ে সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে বলেন–“এই যে তরুণ সমাজ তারা মনে হল একাত্তরের পর আবার সমগ্র বাঙালী জাতির চেতনায় এতটা উন্মেষ ঘটাতে পেরেছে। আর সেই চেতনা যখন তারা এমন জাগ্রত করলো সে সময় প্রথম শহীদ সে। এবং এটা সবাই ধরেই নিতে পারে কারা করছে। তবে এটুকু কথা দিতে পারি এদের ছাড়বো না” ( প্রথম আলো)। তাহলে, জাতি কী বুঝলো? জাতি বুঝলো, যারা মহান আল্লাহ তায়ালা, কুরআন, মহানবী সা. ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা বলবে তারাই একাত্তরের চেতনার ধারক আর যাঁরা এদের বিরোধিতা করবেন তারাই দেশের শত্রু।

এমতাবস্থায় ২০১৩ সালের ৬ ই এপ্রিল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম-সমাজের ধর্মীয় ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে, জাতীয় সংহতি রক্ষার প্রয়াসে এবং বিভক্তি থেকে দেশক্ষার তাগিদে আল্লামা আহমদ শফী দা.বা.-র আহ্বানে ও নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকামুখী লংমার্চের ডাক দেয়। দেশের একমাত্র সুসংগঠিত সামাজিক শক্তি কওমী-জগতের আহ্বানে সেদিন ঢাকা অভিমুখী সকল সড়কে সর্বস্তরের জনমানসে যে অভূতপূর্ব প্রেরণার সৃষ্টি হয় তা স্বচক্ষে দেখার দূর্লভ অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিলো। রাস্তার দু’পাশের বাসাবাড়ি থেকে পর্দানশীন মহিলারা পর্যন্ত বেরিয়ে লংমার্চের মুসাফিরদের মুখে দু’ফোঁটা শরবত তুলে দিতে যে আকুতি বিছিয়ে দেয় তা যুগের পর যুগ ইতিহাসের পাতাকে কেবল অশ্রুসিক্তই করবে না বরঞ্চ এই জনপদের হৃদয়ে-হৃদয়ে ইসলাম আর ইসলামের মহানবী সা.-র প্রতি নিঃসৃত অনন্ত ভালবাসার মিনার হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সেদিন যে চেতনা এই জনপদের আকাশ-বাতাস প্রত্যক্ষ করে তার মূল-প্রেরণাদাতা ছিলো হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একথা অনস্বীকার্য। এই চেতনা– হাজার বছরের চেতনা, যা আরবের হেরার আলোর অনস্বীকার্য ও অনিবার্য উত্তরাধিকার। সন্দেহ নেই, এ উত্তরাধিকারের পথ ধরে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে কওমী-জগৎ ঢাকা-অবরোধে যোগ দেয় ২০১৩ সালের ৫ ই মে’র মর্মান্তিক দিনে। জড়ো হয়েছিলো শাপলা-চত্বরে সেই আসমানী চেতনা হেফাজতের লক্ষ্য নিয়ে ১৩ দফা দাবির ব্যানারে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হেফাজতে ইসলামের এই চেতনা ঐতিহ্যবর্জিত ছিলো না, স্বল্পকালের কোন বিশ্বাস বা আচারনির্ভর সংস্কৃতিও ছিলো না। উপমহাদেশে এই চেতনার প্রথম উম্মেষ ঘটে ১৫ শ শতকে মুজাদ্দিদে আলফে সানী আল ইমাম শেখ আহমাদ আল ফারূকী আস্ সারহিন্দি রহ. (১৫৬৪-১৬২৪)-র পরাক্রমশালী মোগল সম্রাট আকবরের ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র বিরুদ্ধে ইসলামের শাশ্বত-ইনকিলাবের মধ্য দিয়ে। এরপর এই সংগ্রামী চেতনার দ্বিতীয় উম্মেষ ঘটে ১৭ শতকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা শহীদ রহ-র ইংরেজ-বিরোধী অভিযানে। যদিও পলাশীর আম্রকাননে বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজের দৃশ্যমান পরাজয় ঘটে কিন্তু চেতনা থাকে অপরাজেয়। সেই চেতনার তৃতীয় উম্মেষ ঘটে ১৮ শতকে যখন ভারতে শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.( ১৭০৩-১৮২৩) ইংরেজ শাসিত ভারতকে ‘দারুল হারব’ বা শত্রু-কবলিত দেশ ফতোয়া দিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের ঘোষণা দেন এবং সেই ফাতওয়ার উপর ভিত্তি করে মহীশুরের সিংহখ্যাত ফতেহ আলী সুলতান টিপু শহীদ রহ. ইংরেজ-বিরোধী সশস্ত্র জিহাদে নেতৃত্ব দিয়ে ১৮৯৯ সালের ৪ ঠা মে মহীশুরের যুদ্ধে শহীদ হন নিজের বিশ্বস্ত মীর সাদিকের বিশ্বাসঘাতকতায়। এরপর আসে ১৮৩১ সালের ৬ ই মে সংঘটিত ‘বালাকোটের জিহাদ’। এদিন সেই হেরার চেতনার চতুর্থ উম্মেষ ঘটে যখন বালাকোটের প্রান্তরে সায়্যিদ আহমাদ শহীদ রহ. (১৭৮৬-১৮৩১)-র নেতৃত্বে ইসমাঈল শহীদ রহ.সহ ৩০০ মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। অবশেষে ১৮৫৭ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজের নেতৃত্বে ইতিহাসে জায়গা করে নেয় সেই সংগ্রামী চেতনার পঞ্চম উম্মেষ। ১৮৫৭ সালের চেতনার পথ ধরেই ১৮৬৬ সালে ভারতের সাহারানপুর জেলার বস্তি দেওবন্দে ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ঘটে সেই মহান চেতনার ষষ্ঠ উম্মেষ। বৃটিশ-শাসিত ভারতে হাজী শরীয়তুল্লাহর ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ এবং তিতুমিরের ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম উপরোক্ত সংগ্রামী চেতনারই ধারক ও বাহক হয়ে ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল পাতায় জ্বলজ্বল করে চলেছে। এবং এই ধারাবাহিক চেতনার অনিবার্য পরিণতি শাপলার চেতনা।

যুগেযুগে উক্ত চেতনা শিকার হয়েছে বহুমুখী ষড়যন্ত্রের। সেটাকে থামাবার, নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে বিভিন্নভাবে। শাপলার চেতনার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। শাপলার চেতনা নতুন কিছু নয়– এ হেরার চেতনা, কওমী চেতনা। এ চেতনা অন্যায়কে মেনে না নেবার চেতনা, অসুন্দর আর অন্ধকারের সাথে আপোষ না করার চেতনা। এ চেতনা জুলম আর অধর্মের বিরুদ্ধে বিরতিহীন সংগ্রামের চেতনা। বৃটিশ আমলে লেখা ইংরেজ লেখকদের বইগুলো পড়লে বোঝা যায় বেনিয়াগোষ্ঠীর সব শক্তি আর ক্ষমতা প্রয়োগ করেও এ চেতনাকে থামানো যায়নি–নির্মূল করা যায়নি। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের লেখা ‘আওয়ার ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ সে কথার অনবদ্য এক দলীল।

বাংলাদেশেও সেক্যুলার আর নাস্তিক্যবাদীগোষ্ঠী এই চেতনাকে মুছে দিতে চেষ্টা করেছে বারবার, নির্মূল করতে চেয়েছে রাষ্ট্রীয় বল-প্রয়োগে। কারণ, শাপলাকে মুছে দিতে পারলে কওমী আর কওমী থাকবে না। দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে নাস্তিক্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা যাবে। নতুন জন্ম দেয়া দালাল শ্রেণীর মাধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে শাপলার চেতনা বিনাশের। কিন্তু প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়েছে নির্লজ্জভাবে, পরাজিত হয়েছে আদর্শের ময়দানে। তারা তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে বেকসুর মানুষ হত্যার মাধ্যমে, অন্যায় রক্তপাতের মাধ্যমে। কিন্তু যে চেতনায় আমরা হেরার আলোকে আলিঙ্গন করতে শিখেছি সেই চেতনার কেশাগ্রও ওরা স্পর্শ করতে পারেনি। যুগেযুগে সেই চেতনার ধারক-বাহক হয়ে জন্ম নিয়েছে মুজাহিদ আলিম-সমাজ যাঁরা সকল লোভ-লালসার হাতছানিকে পাযে দলে হেরার চেতনাকে রক্ষা করে গেছেন এবং যাচ্ছেন এখনও।

সামরিক সচিবের সেদিনের বক্তব্য সেই চেতনা-শত্রুদের ঐতিহাসিক ধারাবাহিক পরিণতি বৈ কিছু নয়। মঞ্চে বসে যাঁরা সেই অপচেষ্টাকে নীরবে বিনা প্রতিবাদে যেতে দিয়েছেন তাঁরা ইতিহাসের সৌভাগ্যের মালা পরতে পারেননি, দুর্ভাগ্যের পাতাতেই নাম লিখিয়েছেন। ইতিহাস একদিন সেই বিচার অবশ্যই করবে।

পরিশেষে, মনে রাখতে হবে শাপলা একটি চেতনার নাম; এক রক্তাক্ত আমানতের নাম। হাজার স্বীকৃতির পোষাকে সেই চেতনাকে আড়াল করা যাবে না। কওমী-জগতকে এই আমানতকে রক্ষা করে যেতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। আসুক আরও হাজার রক্তাক্ত শাপলা। তবুও এ চেতনাকে আমরা কোনদিন ভুলবো না। মনে রাখতে হবে, শাপলাকে হারালে কওমী-জগৎ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে। বড়ো মনে পড়ছে যাকী কাইফি’র সেই মহান ছন্দ:

یہ بات عیاں ہے دنیا پر ھم پھول بھی ہیں تلوار بھی ہیں
یا بزم جہاں کو مہکائیں گے یا خوں میں نہاں کر دم لیں گے