শাপলা: এক রক্তাক্ত আমানত | পর্ব : দুই

মে ৬, ২০১৯

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী


[দুই]

বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে–এমন একটি সংস্থা DESH RIGHTS। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে সংস্থাটি শাপলা-হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে। The Dhaka massacre 6 May 2013: A Briefing নামে ঐ পর্যবেক্ষণে (পৃ:২) তারা বলছে–
“Human rights groups have confirmed this incident to be a massacre, and with time qualitative and quantitative information surrounding the incident is emerging despite a concerted official disinformation campaign. An early report by The Economist puts numbers killed at 50 citing EU diplomats. However, video footage and pictures have emerged, which, in addition to eyewitness reports indicate that at least 500 may have been killed. Video footage show scenes of chaos in which bodies are strewn around and protesters falling dead when police shoot liয়ve rounds. Verified films published on the Desh Rights website attests to this. We also published a survivor testimony of bodies being placed in dumptrucks by the authorities and removed from the scene.” (মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে, ঘটনাটি একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। আর ঘটনা সংঘটনের সময়কাল ও হতাহতের সংখ্যা বিচারে ঘটনাস্থলের চারদিকের তথ্য থেকে সেটা বোঝাই যাচ্ছিলো যদিও প্রশাসনের তথ্য-গোপন করার চেষ্টা ছিলো। দ্য ইকোনোমিস্ট-র প্রাথমিক এক রিপোর্টে য়ুরোপিয়ান য়ুনিয়নের কূটনীতিকদের বরাতে নিহতের সংখ্যা ৫০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যা হোক, বিভিন্ন ভিডিও-চিত্র আর ছবি দেখে যা অনুভব করা যায়, সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া বিবরণ যোগ করা হলে কমপক্ষে ৫০০ জন নিহত হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। গোলযোগের সময় গৃহিত ভিডিও-চিত্রগুলোতে দেখা যায়, চতুর্দিকে পুলিসের গুলিতে বিক্ষাভকারীদের দেহ লুটিয়ে পড়ছে। যাচা-বাছাইকৃত ভিডিও চিত্রগুলো দেশ রাইটসের নিজস্ব সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা যেসব আহতদের জীবিতাবস্থায় সরিয়ে ফেলার জন্য ট্রাকে তোলা হয় তাদের জবানবন্দীও প্রকাশ করেছি।)

যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ-মাধ্যম Ceasefire magazine। তারা ২০১৪ সালের ৫ মে শাপলা-হত্যাকাণ্ডের ওপর একটি বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে। তাদের শিরোনাম ছিলো– Who said this would be investigated?’ Bangladesh and the May 2013 Massacre। অর্থাৎ, ‘ কে বলেছে, এ ঘটনার তদন্ত করা হবে? বাংলাদেশ এবং ২০১৩ সালের মে’র হত্যাকাণ্ড।’ পর্যবেক্ষণটিতে ceasefire magazine বলছে–
The day before, the protesters had marched from six points around the city, an estimated million strong, wearing national flags and asserting their rights to protest against religious defamation, discrimination and violence against their community amongst other matters. Many had been attacked by ruling party cadres and government forces, with firearms and more intimate bladed and blunt weapons, mounted on riot cars and motorcycles. Protesters seeking refuge in the national mosque were attacked by gunmen on motorcycles. The savagery on show was witnessed by the nature of the injuries inflicted, survivor testimonials and social media video footage. Several of the deceased had been brought to Shapla Chottor on stretchers, while the walking wounded and dying filled the hospitals that would accept them. According to a deaf-mute grave digger interviewed by Al Jazeera (before they lost interest) several bodies found themselves buried in a pauper’s graveyard.
Later in the night, a passerby shared a heart-trembling eye-witness account of his patheticness in the face of police lines shooting at traditionally garbed protesters then pulling them out of the smoke and handing them to Awami League ruling party cadres to beat. ( ৫ মে দিনের বেলায় বিক্ষোভকারীরা ঢাকা শহরের ছয়টি পয়েন্ট থেকে মিছিল নিয়ে জমায়েত হয়। তারা সংখ্যায় ছিলো লক্ষ পরিমাণ, জাতীয় পতাকায় মোড়ানো। তারা ধর্ম-অবমাননা, বৈষম্য আর তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের প্রতিবাদ ও আরও কিছু বিষয়ে দাবি জানাচ্ছিলো। তাদের অনেকেই সরকারদলীয় ক্যাডার, নিরাপত্তা বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। আক্রমণকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি আর ভোঁতা-অস্ত্র নিয়ে মোটরবাইক আর দাঙ্গা-প্রতিরোধী গাড়িতে চড়ে আক্রমণ চালায়। হেফাজত-সমর্থকেরা জাতীয় মসজিদে আশ্রয় নিলে মোটর সাইকেল আরোহী বন্দুকধারীরা সেখানেও গুলি চালায়। সামাজিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও, ক্ষতচিহ্নের ধরন, আহতদের বর্ণনা সেদিনের বর্বরতার সাক্ষী হয়ে আছে। এর মধ্যে কয়েকজনের মৃতদেহ স্ট্রেচারে করে শাপলা-চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়, অন্যদিকে আহত ও মৃত্যু-পথযাত্রীতে হাসপাতাল ভর্তি হয়ে যায়। আল জাযিরা একজন কবর খননকারী থেকে জানতে পেরেছে, কিছু মৃতদেহকে বেওয়ারিশ হিসাবে মাটি দেওয়া হয়েছে।
পরে, রাতের বেলায় একজন প্রত্যক্ষদর্শী পথিক এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। নিজের চোখে দেখা হৃদয়কম্পিত সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন: পুলিশ লাইনের সামনে চিরাচরিত পোষাকপরা হেফাজত-সমর্থকদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এরপর তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে নির্যাতনের জন্য আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের হাতে তুলে দেয়া হয়।)

Human Rights Watch (HRW) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বব্যাপী বহুল পরিচিত একটি মানবাধিকার সংস্থা। তারা ফী-বছর প্রত্যেক দেশের মানবাধিকার-পরিস্থিতি নিয়ে স্বতন্ত্র প্রতিবেদন তৈরি করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৩ সালের ১লা আগস্ট বাংলাদেশের উপর ( ফেব্রু-মে) একটি রিপোর্ট উপস্থাপন করে। রিপোর্টটির শিরোনাম হলো Blood on the Streets যার বাংলা অর্থ হলো–রাস্তায় রক্ত। সেখানে শাপলা-হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলা হচ্ছে:
“The worst violence took place near Dhaka’s central mosque, Baitul Mokaram. Protesters set fire to shops, two office buildings, and a bus, and clashed with police. The security forces retaliated with tear gas, rubber bullets, and live fire. Video footage shows police officers using heavy sticks to beat apparently unarmed protesters lying on the street. Hundreds of people were taken to nearby hospitals. A 25-year-old Hefazat-e-Islam volunteer described the incident to Human Rights Watch:

We took shelter in the Baitul Mokarram mosque. The police called us to come out. When we did, they fired at us. Bullets hit my face, and when I fell down they came and shot me in my knee and abdomen and shoulder. They shot from barely 10 feet [3 meters] away. All were rubber bullets with lead balls. I was not armed, I did not have a stick. I was hit 19 times. I said to them, “Why are you shooting at me? I’m a volunteer.” Now I cannot see anything from my right eye, and after an operation I can see only a little bit from my left eye.

Some of the victims were bystanders, like shopkeeper Raqibal Huq, who died of a gunshot wound to the head. Most were Hefazat supporters like 20-year-old Saidul Islam who was killed by a sharp blow to the head, and 20-year-old Sadam Hussein, whose corpse had gunshot wounds and large cuts to the back.
[ সহিংস ঘটনাটি ঘটে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের কাছে। বিক্ষোভকারীরা দু’টি দোকান, দু’টি বিল্ডিং এবং একটি বাসে আগুন দেয়। সেখানে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের উপর পাল্টা টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট ও তাজা গোলাবারুদ ব্যবহার করে। ভিডিও-চিত্র থেকে দেখা যায়, পুলিশ মোটা লাঠি দিয়ে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদেরকে রাস্তায় ফেলে পেটাচ্ছে। প্রায় শ’খানিক আহতকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পঁচিশ বছর বয়সী একজন হেফাজত কর্মী হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে সংঘর্ষের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন–” আমরা বায়তুল মোকাররমে আশ্রয় নিলাম। পুলিস আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে বললো। আমরা বেরিয়ে আসতেই তারা গুলি চালাতে শুরু করে। আমার মাথায় বুলেট আঘাত করলো। আমি পড়ে গেলাম। পুলিস এসে আমার হাঁটুতে, তলপেটে, কাঁধে গুলি করলো। তারা মাত্র দশ ফুট দূর থেকে আমাকে গুলি করছিলো। এর সবই ছিলো রাবার বুলেট সাথে সীসার গুলি। আমি নিরস্ত্র ছিলাম; আমার কাছে কোন লাঠি ছিলো না; আমাকে উনিশবার গুলি করা হয়। আমি তাদের কাছে জানতে চাইলাম: তোমরা আমাকে গুলি করছো কেন? আমি তো স্বেচ্ছাসেবক। আমি এখন ডান-চোখে দেখতে পাই না। অপারেশনের পর বাম-চোখে সামান্য দেখতে পাই।”
আক্রান্তদের কেউকেউ ছিলেন পথচারী। তাদের মধ্যে রকিবুল হক একজন–যিনি মাথায় গুলির আঘাতে মারা যান। নিহতদের অধিকাংশ ছিলো হেফাজত-কর্মী। আক্রান্তদের বেশির ভাগই হেফাজত-কর্মী। এমনই একজন ২০ বছর বয়সী সাইদুল ইসলাম–যে মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা গেছে। সমবয়সী সাদ্দাম হোসেনের লাশ পড়েছিলো ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়। তার ছিলো গুলির আঘাত আর পিঠে গভীর কাটাচিহ্ন।]

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র ঐ রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে:
“Journalists and protestors who witnessed the event told Human Rights Watch that on several occasions the security forces opened fire at close range even after unarmed protesters had surrendered. The security forces did not just fire rubber bullets, but also shotgun pellets. Many witnesses spoke of seeing corpses. As already noted, video footage shows police and RAB men beating what appear to be severely injured protesters.

One journalist remembers shaking 25-30 bodies and checking their pulses and is convinced some were dead. Another reporter saw RAB soldiers dragging four bodies near the offices of Biman Bangladesh airlines and loading them onto a truck. When he went to inquire about them, a soldier hit him with a stick on the side his head. The same journalist later checked the pulse of a boy who was lying on the steps of the Sonali Bank and was told by a police officer that the boy was dead. He remembers seeing a lot of bruising around his neck and chest.”
[ প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন সাংবাদিক ও বিক্ষোভকারী হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীরা নিরস্ত্র অবস্থায় আত্মসমর্পণ করার পরও নিরাপত্তা-বাহিনী খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। নিরাপত্তা-বাহিনী যে কেবল রাবার বুলেট ছুঁড়েছে তাই নয়, শর্ট গান দিয়েও গুলি চালায়। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী মৃতদেহ দেখেছেন। যেমনটি বলা হয়েছে, ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে: পুলিস ও র্যাব সদস্যরা মারাত্মকভাবে আহতদেরকে যেখানে পেয়েছে বেধড়ক পিটিয়েছে।
একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, তিনি পড়ে থাকা ২৫ থেকে ৩০ জনের শিরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যাদের কয়েকজন তখন মৃত। একজন রিপোর্টার দেখেছেন, কিছু র্যাব সদস্য চারটি মৃতদেহকে টেনে-হিঁচড়ে ট্রাকে তুলছে। তিনি যখন তাদের কাছে মৃতদেহ সম্পর্কে জানতে চান একজন র্যাব সদস্য রিপোর্টারের মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। পরবর্তীতে সেই রিপোর্টার সোনালী ব্যাঙ্কের সিঁড়িতে পড়ে থাকা একটি বালকের শিরা পরীক্ষা করার সময় একজন পুলিস কর্মকর্তা ছেলেটি মারা গেছে বলে দাবি করেন। ঐ রিপোর্টার বলেন, প্রচণ্ড মারের কারণে ছেলেটির ঘাড় ও বুকের হাঁড় ভেঙ্গে গেছে।]

(চলবে)