শিক্ষা ও বর্বরতার এ বন্ধন কেন?

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক


করোনার কারণে দেশে এখন এক ধরণের অচল-জনজীবন চলছে।পরিস্থিতির কারণে এমন হতেই পারে।কিন্তু খেটে খাওয়া প্রান্তিক-মানুষের দুঃসহ জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে।এভাবে তারা আর ক’দিন পারবে তলপড়া পেট সামলাতে? কবি সুকান্তের “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়”হবার আর কতো পথ বাকি—সে কথা কি এ বাংলার হতদরিদ্র মানুষের ক্ষুধার মোচড় বোঝে? একদিকে রোগ ছড়াতে না পারার বন্দোবস্ত করা, অন্যদিকে কুটীরে-কুটীরে দু’মুটো আহার জোগানোর সংগ্রামের দ্বন্দ্ব বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়েছে এক সঙ্কটময় মোহনায়।সরকারের দেরিতে হলেও কিঞ্চিৎ সদিচ্ছা, তার সাথে মিশে থাকা মন্ত্রী-কর্তাদের রূপকথার বজ্রধ্বনিতে আমাদেরকে নিয়ে চলেছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ময় এক উপত্যকায়।

ক’দিন থেকে প্রশাসন আর সেনাবাহিনী দেশজুড়ে বেশ দৌড়ঝাঁপ করার চেষ্টা করছে মানুষকে বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে, সচেতন করতে।কিন্তু এ বাঙ্গালী কি বোঝে পেটের সামনে হাজারো করোনার আক্রমণের কথা? আমাদের সবার আগে চাই অন্তত ঊনোপেটে দুটো ভাত। এরপর বাকি জিন্দেগী্। তাই তো, করোনার মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করে ক্ষুধার মৃত্যুকে প্রতিহত করতে হতদরিদ্র বাংলার মানুষ লকডাউন পায়ে ঠেলে এখনও রাস্তায় রিযকের তালাশে।তাঁদের এক কথা—আগে ভাত দে, পরে কথা বলো।অনেকটা গৃহবন্দী থেকে নেট-দুনিয়ার পৃষ্ঠায় যখন দেখলাম, যশোরের মনিরামপুরের এক নারী সহকারী কমিশনার মুখে মাস্ক না পরার অপরাধে পিতার বয়সী দুই বৃদ্ধকে কান ধরিয়ে শাস্তি দিচ্ছেন—প্রচণ্ড বিবেকের কষাঘাতে আমার সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো।এ কি দেখলাম! একি কোন সভ্য-সমাজের চিত্র? ছবিতে দেখলাম, ঐ নারী কমিশনার তখন নিজহাতে ভিডিও করছিলেন অনলাইনে ছড়িয়ে দিতে। অবাককরা ব্যাপার হলো, ঐ নারী কমিশনার হিজাবও পরেছিলেন। কীভাবে এর ব্যাখ্যা করবো জানি না।কিন্তু আমার বারবার মনে হচ্ছে, এ চিত্র যখন দেশের বাইরে ছড়াবে, তখন আর যাই হোক, বাংলাদেশটা আবারও পরাজিত হবে, কলঙ্কিত হবে।এক সময় শুনতাম, শিক্ষায়-দীক্ষায় এ ব-দ্বীপের মানুষ পেছনে বলে তাদের সভ্য হবার রাস্তাটাও একেবারে সংকীর্ণ।কবি রবিন্দ্রনাথও তো সে-কথা বলে গেছেন—“সাত কোটি বাঙালিরে রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।” সঙ্গতকারণে, রবিবাবু এখানকার অমানুষদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় স্বাক্ষরও দিয়ে গেছেন।

বর্ণিত নারী কমিশনার কিন্তু অশিক্ষিত ছিলেন না, শিক্ষিত ছিলেন।তাই তো সরকার মহোদয়ের সদয় সম্মতিতে তিনি সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।ক’দিন আগে শুনলাম, কুড়িগ্রামের দায়িত্বে থাকা এক নারী জেলা প্রশাসক মধ্যরাতে এক সাংবাদিককে তুলে এনে অমানবিক নির্যাতন করেছেন।সেটা নিয়েও কম কথাবার্তা হয়নি।তবে আশার কথা হলো, উভয় ঘটনাতেই প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণে পিচ-পা হয়নি।বিশেষ করে, প্রথম ঘটনায় যেভাবে প্রশাসন তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছে, তা অবশ্যই ধন্যবাদের দাবিদার। আরও জানলাম, জনপ্রশাসন বিভাগের সম্মানিত সচিব উক্ত ঘটনায় নির্যাতিত বৃদ্ধ নাগরিকদের কাছে গিয়ে সরাসরি ক্ষমা চাইতে উক্ত নারী কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন।আমার মনে হয়, এ ধরণের পদক্ষেপ বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

কিন্তু আজ জাতির প্রশ্ন: কেন এমন হলো? কেন শিক্ষার সাথে বর্বরতার এমন বন্ধন? উপরের দু’টি ঘটনাতে জড়িত কর্মকর্তা লিঙ্গে নারী।আর নারীর এক ভূষণ হলো—মমতাময়ী।তাই তো যুগযুগ ধরে আমরা পড়ে এসেছি, মমতা নারীত্বের হৃৎপিণ্ডরূপ।পিতা যখন সন্তান ফেলে হারিয়ে যায়, মা-ই তখন সেই সন্তানকে না খেয়ে আগলে রাখে—এ চিত্র তো আবহমান কালের।আর আজ জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন ও সহকারী কমিশনার সায়েমা হাসানের চরিত্রে জাতি যা দেখলো, তা কি মমতাময়ী কোন নারীর বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে? আমি তো বলবো, তারা যে পরিমাণ নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা দেখিয়েছেন, তা নিষ্ঠুর কোন পুরুষকেও লজ্জা দেবে। আজ-ই খবরে দেখলাম, আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মূখ্যমন্ত্রী শ্রীযুক্ত মমতা বন্দোপাধ্যায় রাস্তায় হেঁটে-হেঁটে দুঃস্থ মানুষকে মাস্ক দিচ্ছেন।দেখে সত্যিই সম্মানবোধ জাগলো একজন মূখ্যমন্ত্রীর এমন দায়িত্বশীল ও মমতাপরায়ন সেবা দেখে।মুসলিম-হিন্দু বলে কথা নয়, মমতায় যিনি মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিতে পারবেন—তিনিই তো ইতিহাসের অনিবার্য অংশ।অথচ মমতা বন্দোপাধ্যায় যেমন নারী, তেমনি ঐ দুই বাংলাদেশী কর্মকর্তাও নারী; ব্যবধান গড়েছে কেবল নারীত্বে।

জাতি তার সন্তানদেরকে শিক্ষালয়ে পাঠায় শিক্ষা অর্জন করে সেবার প্রত্যয়ে।কিন্তু ঐ দুই কর্মকর্তা যা করলেন, তা তো পুরো জাতিকেই লজ্জিত করেছে। আসলে এর শেঁকড় অন্য কোথাও নয়, এ সরকারের সেক্যুলার মানস ও শিক্ষায়।সেক্যুলার শিক্ষার নামে যেভাবে নীতি-নৈতিকতাকে আমাদের ছাত্র-ছাত্রী থেকে উৎখাত করা হয়েছে—সে-সবের অবধারিত পরিণাম: পারভীন আক্তার ও সায়েমা হাসানেরা।এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।সাবেক বামপন্থী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে দায়িত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় যে অপূরণীয় ভুল করেছেন, তার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে।এখন না আছে পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ, না আছে মানুষের প্রতি মানুষের মমতাবোধ।দেশের নাস্তিক্যবাদী উপাদানের প্ররোচনায় সেক্যুলার শিক্ষার নামে পাঠ্যপুস্তকগুলো থেকে নীতিজ্ঞান, মহানবীর (সা.) জীবনচরিত, আরবীয় উদারতার চিরাচরিত কাহিনী, মোগলদের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস ইত্যাদি বাদ দিয়ে দেয়া হচ্ছে পৌত্তলিক ও বস্তুবাদী শিক্ষা। ফলে, আজ বাবার বয়সী, নানা-দাদার বয়সী মানুষের সাথে চলছে অভদ্রতা আর অশালীনতা।এসবের দায় এ সরকারকে নিতেই হবে।

সবকিছুর উপর বলা যায়, যদি ওসব ঘৃণ্য কাণ্ডের বিরুদ্ধে এবারকার মতো ব্যবস্থা নেয়া অব্যাহত থাকে, বলা যায় সমাজ ও রাষ্ট্রের কিছুটা হলেও উপকার হবে।পরবর্তী প্রজন্ম সতর্ক হবে; আমাদের মাঝে সম্মানবোধ জাগবে।প্রশাসন যদি সকল প্রকার স্বজনপ্রীতির উর্ধে থেকে সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে পারে, জাতি কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। সরকারকেও বুঝতে হবে, সেক্যুলার-শিক্ষা নয়, নীতিজ্ঞান ও দ্বীনি শিক্ষায় প্রকৃত জাতি গঠনের পথ উম্মুক্ত হবে; অন্তত, শিক্ষার সাথে বর্বরতার বন্ধন আমরা দেখতে পাবো না।