সতর্ক হোন উলামায়ে কেরাম!

জানুয়ারি ২৩, ২০২০

 মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক



সাম্প্রতিক সময়ে কিছু তরুণ আলিমে দ্বীনের হঠাৎ গুম হয়ে যাওয়া নিয়ে আমরা চিন্তিত। বিষয়টি ঘটতে শুরু করেছে অদূর অতীত থেকে। এর আগে দেশের দু-একজন ইমাম-মুয়াযযিনের গুপ্তহত্যার ঘটনায় আমরা দারুণভাবে আতঙ্কিত হয়েছিলাম। ঘটনাগুলোর আজব্ধি কোন সুরাহা হয়নি। সরকারও কোন বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসবের সমাপ্তি টানতে পারেনি। যা হোক, কিছু তরুণ আলিমে দ্বীনের গুম হওয়া নিয়ে কিছু কথা এখানে বলতে হচ্ছে।

যেসব আলিম গুম হয়েছেন, এখনও পরিস্কার নয় কেন তাঁরা গুম হচ্ছেন। সম্প্রতি ঢাকার দু’জন তরুণ আলিমের গুম হওয়া ও পরবর্তীতে র্যাবের হেফাজতে তাঁদের সন্ধান পাওয়া আমাদের দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগেও যাঁরা গুম হয়েছেন তাঁদেরকে র্যাবের হেফাজতেই পাওয়া যায়। খবরে জানেছি, ঢাকার উক্ত দু’জন আলিমকে সাধারণ জিজ্ঞাবাদের পর র্যাব ছেড়ে দিয়েছে। প্রশ্ন জাগে, সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে এঁদেরকে অজ্ঞাতে তুলে নেয়া হলো কেন? তাঁদেরকে তো ফোনে ডেকে নিলেই হতো। বিষয়টি রহস্যজনক বৈ কি। আমার মনে হয় এখানে এমন কিছু বিষয় কাজ করছে যা এখনও দেশের আলিম-সমাজ খুব বেশি বিবেচনায় নেয়নি।

প্রথমত,
উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকে স্বীকৃতির কৌশল গ্রহণের আগ পর্যন্ত দেশের কওমী আলিম-সমাজ ও মাদরাসার বিরুদ্ধে সরকারীমহলের নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বলয় থেকে অপপ্রচার হয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। এমন কি কয়েকটি কওমী মাদরাসার কুরবানীতে ব্যবহৃত দা-ছুরিকে দেশীয় অস্ত্র আখ্যা দিয়ে মাদ্রাসাগুলোকে জঙ্গী-কারখানা প্রমাণ করার চেষ্টাও হয়।বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের একশ্রেণীর অপসাংবাদিকতায় পারদর্শী দৈনিকে ওসব ভিত্তিহীন কথা রিপোর্ট আকারে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে কওমীদেরকে তড়িঘড়ি করে সনদ গিলানোর পর সরকারের বাহ্যকণ্ঠে সুর কিছুটা পরিবর্তিত হয় বটে কিন্তু প্রশাসনের অভ্যন্তরে বিমার আগের মতোই থেকে যায়। কারণ, আওয়ামী লীগের প্রশাসন প্রধানত সেক্যুলার ও ভারতীয় আধিপত্যবাদনির্ভর হয়ে গড়ে ওঠে। ফলে, দেশের আলিম-সমাজ ও মাদরাসা-মসজিদ নিয়ে তীর্যকভাব আপন গতিতেই চলতে থাকে। দেশের কোথাও কোন সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই সন্দেহের প্রথম কাতারে পড়ে যেতো আলিম-সমাজ। জাতীয় সংসদে বামপন্থী সাংসদ মেনন-ইনু-বাদলদের মাদরাসা-মসজিদ ও আলিমের প্রতি বিদ্বেষসূচক বক্তব্য আশা করি ভুলে থাকবার কথা নয়। শাপলার বর্বর হত্যাকাণ্ড ও তেতুল বিষয়ক আল্লামা আহমদ শফী দা.বা.-র একটি বক্তব্যের রেশ ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কদর্য ভাষণ জাতি অনেকদিন মনে রাখবে। অনেকেই জানেন, শাপলার ঘটনার পর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে প্রধান আসামী করে কয়েক হাজার অজ্ঞাত হেফাজতকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, যা এখনও প্রত্যহৃত হয়নি। ২০১৩ সালে শাপলার হত্যাকাণ্ডের পর দেশের কওমী মাদরাসা ও আলিম-সমাজ নিয়ে সরকার, প্রথম আলো, জনকণ্ঠ, সমকাল, যুগান্তর, কালের কণ্ঠ, কোলকাতার আনন্দবাজার ও বিবিসি বাংলা যে উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালায়–তা মুছে যাবার কথা নয়। এসব অপপ্রচার দিয়ে শত্রুপক্ষ একটি উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। তা হলো, দেশের আলিম-সমাজ ও মাদরাসাগুলোকে ধীরে-ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিপজ্জনক হিসাবে চিত্রায়িত করা। এখানে একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। কিছুটা ব্যতিক্রমভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের ক’জন উর্ধতন কর্মকর্তা মাঝেমাঝে কওমী আলিম ও মাদরাসা কথিত ‘জঙ্গীবাদ’ সংশ্লিষ্ট নয় বলে বিবৃতি দিয়ে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করলেও মূলধারায় কিন্তু কওমী আলিমদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাসংস্থাগুলোর তৎপরতা থেমে থাকেনি। এটাকে কেউকেউ সমন্বয়হীনতা বলতে পারেন, আমি বলবো–সবদিককে নিয়ন্ত্রনে রাখার নীতি।

দ্বিতীয়ত,
বাংলাদেশের কওমী আলিম-সমাজ ও মাদরাসা নিয়ে বেশি অস্বস্তি ভারতীয় আধিপত্যবাদের। বিশেষত, ভারতের গোয়েন্দাসংস্থা ‘র’ এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা বাংলাদেশের কওমী আলিম ও মাদরাসাগুলোকে তাদের প্রধানবাধা মনে করে। সে কারণে, তারা তাদের কথিত জঙ্গির তালিকায় আলিম-সমাজ ও মাদরাসাগুলোকে চোখ বন্ধ করে ঢুকিয়ে দেয়। কোন দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না। আমার মনে আছে, ২০০১ সালে বিএনপি’র আমলে জনাব এ, কিউ, এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারত-সরকার বাংলাদেশকে তাদের ভাষায় এখানকার বেশ কিছু জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবিরের তালিকা দেয়। তালিকায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম, সিলেটের কয়েকটি মাদরাসার নামও অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঐ তালিকায় চট্টগ্রামের যে মাদরাসার নাম ও আপারভিউ দেয়া হয় সেটা দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী। এখন বলুন, হাটহাজারী মাদরাসা কি কখনও জঙ্গি প্রশিক্ষণ-শিবির ছিলো? তালিকাটিতে তখন অনেক ভিত্তিহীন নাম পাওয়া যায়। ভারতীয় আধিপত্যবাদ সবসময়েই বাংলাদেশের ইসলামপন্থী মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের ঘোর দুশমন হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০১৩ সালে শাপলার গণহত্যায় ভারতীয় গোয়েন্দাসংস্থার একটা হাত ছিলো বলে খবর প্রচারিত হয়েছিলো এবং বিভিন্ন সংবাদ-ইঙ্গিত থেকে মানুষ সেটাকে এখনও অবিশ্বাসের খাতায় ফেলে দেয়নি। তখন এও প্রকাশিত হয়েছিলো যে, শুধুমাত্র ঢাকাতেই ভারতীয় গোয়েন্দাসংস্থার ১০-১২টি গোপন অফিস রয়েছে। তখন এসব খবর প্রকাশের কারণে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা, সাংবাদিক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিলো। বলছিলাম, এ দেশের কওমী আলিম-সমাজ ও মাদরাসাগুলোর বড় শত্রু হলো, ভারতীয় আধিপত্যবাদ।

তৃতীয়ত,
দেশের অভ্যন্তরে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এমন কিছু শক্তি কাজ করছে, যারা মূলত ইসলাম ও মুসলিম-বিদ্বেষে প্রভাবিত। কোন দলিল-প্রমাণ ছাড়াই এরা দেশের আলিম-সমাজ ও মাদরাসাগুলোকে কলঙ্কিত করতে সচেষ্ট। দেশের একশ্রেণীর গোয়েন্দাসংস্থা এমন কাজে সংশ্লিষ্ট বলে ভুক্তভোগীদের কাছে শুনেছি। কিছু মাদরাসাওয়ালা যারা কোন না কোনভাবে রিমান্ডের শিকার হয়েছেন তাদের কয়েকজনের ভাষ্য শুনে আন্দাজ করা যায়, এসব সংস্থায় ইসলামের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন কেমন কর্তারা চেয়ার সামলাচ্ছেন। ইউটিউবে মজলুম জননেতা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার যুক্ত আছে। সেখানেও হযরত বাবুনগরী তাঁর সাথে রিমান্ড চলাকালীন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের যে অভদ্র ও কদর্য ব্যবহারের বর্ণনা দিয়েছেন তাতে প্রশ্ন ওঠে, ওসব কর্তারা কি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের না কি ইসরাঈলের? রিমান্ডের এক ভুক্তভোগী আমাকে সরাসরি বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদের ধরন দেখে তাঁর নাকি মনে হয়েছে লোকগুলো হয় ইসরাঈলের অথবা ভারতের। বলছিলাম, বাংলাদেশে সক্রিয় প্রশাসনাশ্রিত আলিম ও মাদরাসাবিদ্বেষী গোপনশক্তির কথা। এখানেও ভারতীয় আধিপত্যবাদের অভিযোগ উঠেছে বরাবর। উক্ত শক্তি মাঝেমাঝেই তরুণ কওমী আলিমদের তুলে নিয়ে একটি চিত্র অঙ্কনে সচেষ্ট বলে মনে হয় যেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এদেশের মাদরাসাপন্থীদেরকে কথিত জঙ্গি বলে সন্দেহযুক্ত করা যায়। ঢাকার সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদেরকে সেদিকেই নিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে তারা কওমী-জগতের কাছে সম্ভবত একটি বার্তা দিতে চাচ্ছে বলে মনে হয়।

চতুর্থত,
আমাদের কওমীদের অভ্যন্তরীণ গুপ্তশত্রুর অবস্থান অত্যন্ত বিবেচ্য। এরা কওমীদের ভেতরে থেকে প্রশাসনে বিভিন্ন তথ্য প্রেরণ করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ মতভেদ সৃষ্টি ও জিইয়ে রাখতে সদা তৎপর। এদেরকে সবাই চেনেন, জানেন। এরাই শাপলার রক্তে ব্যবসা পেতেছিলো অত্যন্ত গোপনে। হেফাজতের মঞ্চে যেমন এরা লোক-দেখানো ঝাঁঝালো বক্তৃতা ছুঁড়ে দিয়ে মাঠ গরমের দায়িত্ব বহন করে অন্যদিকে লোভনীয় ব্যবসার দোকান খু্লে পুরো কওমী-জগতকে কলঙ্কিত করে তোলে। এরাই ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের বিতর্কিত কথিত শোকরানা মাহফিলের প্রেক্ষাপট তৈরি করে এবং ব্যবসা সফলের জন্য সংবর্ধনা-বিরোধী বলে সারা বাংলাদেশের ১৫০ জন কওমী মূলধারার আলিম-ব্যক্তিত্বের নাম গোয়েন্দাসংস্থাকে সরবরাহ করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দেয়। উক্ত ১৫০ জন কওমী আলিমের তালিকার শীর্ষে আছে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দা.বা. ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা.-র নাম। উক্ত কালোতালিকা সরবরাহের পর থেকে গোয়েন্দাসংস্থা বিভিন্নভাবে তালিকাভুক্তদের খোঁজ-খবর নিতে শুরু করে। এখনও তাদের কারো-কারো কাছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ফোন আসে বলে জানা গেছে। হেফাজতের ভেতরের এ অশুভশক্তি বেশ প্রতাপের সাথে এখনও তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। উক্ত তালিকার কেউ কোন সময়ে গুম হলে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

পরিশেষে বলবো,
কওমীদের এখন অধিকমাত্রায় সতর্ক হতে হবে। কারণ ভেতরে-বাইরে সব শত্রু। আমাদের কওমী আলিম-সমাজের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন: শতধা বিভক্ত না থেকে এক দল না হোক, অন্তত সমন্বয়যুক্ত সব ক’টি দলের একটি ঐক্যবদ্ধ ফোরাম যা আমাদের দাবি-দাওয়া ও অবস্থানকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ করবে এবং করণীয় নির্দেশ করবে। অন্যথায়, আচানক গুমের গহ্বরে আমরা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে থাকবো। এভাবে শতধা বিভক্ত হয়ে যতো চিল্লাচিল্লিই করি না কেন, আমরা কখনও নিরাপদ হবো না। আল্লাহু হাফিয।