সময় এখন অনলাইন সংবাদমাধ্যমের

জহির উদ্দিন বাবর | বার্তা সম্পাদক : ঢাকা টাইমস


এক দশক আগেও আজকের কোনো খবর জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হতো পরদিন সকাল পর্যন্ত। একটি সংবাদের বিস্তারিত জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হতো প্রায় ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু সেই দিন এখন আর নেই। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এখন খরব পেয়ে যাই। দ্রুততার সঙ্গে খবর পাওয়ার মূল মাধ্যম হচ্ছে অনলাইন গণমাধ্যম। টেলিভিশনেও আমরা দ্রুততার সঙ্গে খবর পাই। তবে এতোটা বিস্তারিতভাবে পাই না। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তৃতি বাড়ার কারণে সেখানেও অনেক সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে চলে আসে। তবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকে। এজন্য অনলাইন পত্রিকাগুলোই এখন আমাদের দ্রুত সংবাদ পাওয়ার প্রধান মাধ্যম।

বেশ কয়েক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ছয়জনই সংবাদ পেতে অনলাইন পোর্টালের দ্বারস্থ হন। আর বাকি চার ভাগ অন্যান্য গণমাধ্যমের দ্বারস্থ হন। এর দ্বারাই বোঝা যায় অনলাইন সংবাদমাধ্যম কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে বর্তমান বিশেষ। পঞ্চাশের দশকে ইন্টারনেট আবিষ্কার হলেও সর্বপ্রথম অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে, যার নাম ছিল নিউজ রিপোর্ট। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র তাদের ছাপা সংস্করণের পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণ চালু করে। তাছাড়া ইন্টারনেটের ক্রমান্বয়ে বিস্তৃতির ফলে শুধু অনলাইনেও অনেক সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে উন্নত বিশ্বের অনেক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা তাদের ছাপা সংস্করণ বাদ দিয়ে শুধু অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।

আমাদের দেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের যাত্রাটা খুব বেশি দিন আগের নয়। ২০০৫ সালে সর্বপ্রথম বিডিনিউজের মাধ্যমে অনলাইনের যাত্রা শুরু হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত হাতে গোনা দুই চারটি অনলাইন পোর্টাল ছিল। ২০১১ সাল থেকে মূলধারার বেশ কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল আত্মপ্রকাশ করে। পরে ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পোর্টালের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মোবাইলফোন ইন্টারনেটের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে নিউজপোর্টালের সংখ্যা বেড়েছে অনেক দ্রুত। দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়েছে। যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাদের বেশির ভাগই অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিয়মিত পাঠক।

অল্প সময় হলেও আমাদের দেশে অনলাইন নিউজপোর্টালের সংখ্যাটা বেড়েছে বিস্ময়করভাবে। গত কয়েক বছরে দেশে এক হাজারের বেশি অনলাইন পত্রিকা হয়েছে। যদিও এর বেশির ভাগই ভুঁইফোঁড়। মোটামুটি পেশাদারিত্ব বজায় রেখে টিকে আছে এমন অনলাইন পত্রিকার সংখ্যা শ’য়ের কোটা পেরোবে না। অনলাইন পত্রিকার সংখ্যাটা এভাবে রাতারাতি বাড়ার কারণ হলো এটি শুরু করা অনেক সহজ। মোটামুটি এক হাজার টাকা দিয়ে একটি ডোমেইন কিনে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে একটি সাইট তৈরি করলেই হয়। বেশির ভাগ সাইটে নিজস্ব কনটেন্ট থাকে খুবই কম। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো থেকে কপি করাই তাদের কাজ। অনলাইন পত্রিকার অস্বাভাবিক এই বেড়ে যাওয়ার কিছু ক্ষতিকর দিকও আছে। এর কারণে একটি নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক এ ধরনের অনলাইন পত্রিকা খুলে মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করছে বলেও অভিযোগ আছে। এছাড়াও নানা গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে এসব পোর্টাল বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এজন্য সরকার অনেক দিন ধরে একটি অনলাইন নীতিমালা প্রণয়ন এবং অনলাইন পত্রিকাগুলো নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। যদিও এখনও সেই নীতিমালাটি আলোর মুখ দেখেনি। এই নীতিমালার মাধ্যমে সরকার অনলাইন গণমাধ্যমের বিকাশ রুদ্ধ করতে চায় বলে কারও কারও অভিযোগ আছে। তবে বাস্তবতা হলো, ন্যূনতম একটি নীতিমালা থাকা উচিত। কারণ না হলে এই অঙ্গনে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে তাতে ভুগতে হবে সবাইকে। তাছাড়া এর কারণে মানসম্পন্ন ও পেশাদার সাইটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অনলাইন পত্রিকাগুলোর কিছু ভালো দিক আছে। যেমন এখানে সাধারণত পাঠকদের কোনো খরচ নেই। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে যেকোনো পত্রিকা ফ্রি পড়তে পারেন। অনলাইন মিডিয়া করা তুলনামূলক খরচ অনেক কম। বর্তমানে মিডিয়ার নাম নিলেই যেখানে কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন সেখানে অনলাইন লাখের কোঠাতেও করা সম্ভব। অনলাইনে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে অতি দ্রুত। অনলাইনের কারণে এখন আর কোনো সংবাদ গোপন করার সুযোগ নেই। অনলাইনের কারণে সংবাদপত্র শিল্প আরও বিকশিত হচ্ছে। অনলাইন মিডিয়ার বিস্তৃতির কারণে ব্যাপক হারে সাংবাদিক সৃষ্টি হচ্ছে; অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। অনলাইন সাংবাদিকতায় প্রতিযোগিতা বেশি, এজন্য ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য বেশি প্রচারিত হয়। পাঠককে আকৃষ্ট করার জন্য অনেকে নীতি-নৈতিকতা পরিপন্থি কাজ করেন। টিকে থাকার জন্য কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ব্লাকমেইল করে বিজ্ঞাপন আদায় করেন। দ্রুততার কারণে অনলাইন সাংবাদিকতায় সারবত্তা ও কোনো বিষয়ের গভীরে যাওয়ার প্রবণতা কম। কোনো নীতিমালা না থাকার কারণে ব্যাঙের ছাতার মতো অনলাইন পত্রিকা জন্ম নিচ্ছে। এগুলো নানাভাবে পাঠককে বিভ্রান্ত করছে। অনলাইন সংবাদের ওপর পাঠক পুরোপুরি আস্থাশীল হতে পারে না। সর্বোপরি অনলাইনে সৃজনশীলতার চেয়ে কপি-পেস্টের প্রবণতা বেশি।
সবকিছুর পরও তরুণ প্রজন্মের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে অনলাইন পত্রিকাগুলো। কারণ এর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন যেকোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই রেডিও টিভির মতো এতে প্রকাশ করা যায়। এমনকি রেডিও টিভি ঘটনার বিস্তারিত জানাতে না পারলেও অনলাইনে তা সম্ভব। অনলাইনে প্রকাশিত রিপোর্টের স্থায়িত্ব অনেক বেশি। প্রকাশিত রিপোর্টগুলো আর্কাইভ করে রাখার ব্যবস্থা থাকায় তা যেকোনো সময় দেখা যায়। অন্য যেকোনো মিডিয়ার (প্রিন্ট, রেডিও ও টিভি) চেয়ে এটা খুঁজে বের করা অনেক সহজ। অনলাইন সংবাদপত্রে লেখার পাশাপাশি গ্রাফিক্স, অডিও, গান, ভিডিও ফুটেজ ও অ্যানিমেশন সংযুক্ত করা সম্ভব। ফলে এটা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। তাছাড়া অনলাইন সাংবাদিকতা একটি ইন্টার-অ্যাকটিভ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে পাঠকের মতামত জানা ও পাঠককে নিজের মতামত দ্বারা প্রভাবিত করার সুযোগ রয়েছে। এখানে একটি লেখার সঙ্গে একই বিষয়ের অন্যান্য লিংকও দেয়া যায়। ফলে পাঠক খুব সহজেই একই বিষয়ে অন্যান্য লেখা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে পারে।

অনলাইনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এখানে জায়গার কোনো সমস্যা নেই। কিংবা রেডিও টিভির মতো সময়েরও সীমাবদ্ধতা নেই। ফলে একজন অনলাইন সাংবাদিক তার স্টোরিকে বিভিন্ন তথ্যে সমৃদ্ধ করে প্রকাশ করতে পারেন। আবার প্রিন্ট মিডিয়ায় একবার প্রকাশিত হয়ে গেলে তা আর সংশোধনের সুযোগ থাকে না। কিন্তু অনলাইনে এ ধরনের কোনো সমস্যা নেই। এ জগতের সাংবাদিকরা ঘটনা ঘটার সঙ্গেই তা আপডেট করে দিতে পারেন। ভুলভাল কিছু চলে গেলে তা সংশোধনেরও সুযোগ পান।

জেনারেল ধারার অনলাইন পত্রিকার পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে ইসলামি ধারার বেশ কয়েকটি অনলাইন পত্রিকাও বাজারে এসেছে। সম্ভবত এগুলোর মধ্যে ইনসাফ সবার আগে যাত্রা শুরু করেছে। আলেম-উলামাদের যেখানে কোনো মিডিয়াই ছিল না সেখানে এই পোর্টালগুলো তাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। যেহেতু এই অঙ্গনে অনেকগুলো অনলাইন পত্রিকা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে এজন্য তাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতাও আছে। তবে এই প্রতিযোগিতাটা নেতিবাচক কিছু নয়, এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটা দরকার। শুনেছি পোর্টালগুলোর সম্পাদকরা মাঝে একসঙ্গে বসেছিলেন। সত্যিই আশা জাগানিয়া খবর। তাদের প্রতি পারস্পরিক যোগাযোগটা আরও বাড়ানোর প্রত্যাশা রাখি। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে, আপনাদের প্রতিযোগিতাটা নিজেদের মধ্যে যত না এর চেয়ে অনেক বেশি বাইরের জগতের সঙ্গে। সেই প্রতিযোগিতাটা আদর্শের। সুতরাং নিজেদের মধ্যে যেন অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

ইসলামি ধারার যে অনলাইন পত্রিকা ইতোমধ্যে বাজারে এসেছে প্রায় সবাই সংকটে আছে। প্রধান সংকটটা অর্থনৈতিক, আর দ্বিতীয় সংকটটা হলো যোগ্য লোকের অভাব। বড় আকারে মিডিয়া করার আগে ইসলামপন্থীদের উচিত ছোট ছোট এই উদ্যোগগুলো টিকিয়ে রাখা। প্রতিযোগিতার বাজারে তারা যেন টিকতে পারে সে ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা করা। কোনো ধরনের সহযোগিতা না করে পান থেকে চুন খসলেই সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করা উচিত নয়। আজ ছোট ছোট উদ্যোগগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিলে একদিন বড় উদ্যোগও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

আমাদের মিডিয়া নেই এই আক্ষেপ অনেক শুনেছি। যারা এই আক্ষেপগুলো করেন ছোটখাট উদ্যোগগুলো টিকে থাকার জন্য তারা কী ভূমিকা রেখেছেন? জানি, সেটা খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হবে। এজন্য আমরা চাই না আর হতাশ হতে। আসুন আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইসলামি মিডিয়ার ছোটখাট উদ্যোগগুলোকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করি। এভাবেই একদিন কাঙ্ক্ষিত মিডিয়া গড়তে পারবো এবং মিডিয়া নিয়ে আমাদের আক্ষেপ ঘুচে থাকবে।
ইনসাফের ষষ্ঠ বছর পূর্তিতে অনলাইন পত্রিকাটির সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য রইল শুভকামনা। ইনসাফ শতায়ু হোক সেই প্রত্যাশা রইল।

Previous post ইনসাফ দেশ ও জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম হবে
Next post ইনসাফের শুভক্ষণে-শুভকামনা