স্বাধীনতার ঘোষণা না দেয়া ছিল বঙ্গবন্ধুর কৌশলী সিদ্ধান্ত

মার্চ ৭, ২০১৬

ড. কামাল১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক দেন শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ই মার্চে দশ লাখ জনতার সামনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এখনও ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। সেই ভাষণের খসড়া প্রস্তুত থেকে শুরু করে জনসভার মঞ্চ পর্যন্ত সবখানেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা তুলে ধরেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ঐতিহাসিক ভাষণ। এই ভাষণ নিয়ে আলোচনা করতে হলে এর পটভূমি সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর আমরা লক্ষ্য করলাম যে গণপরিষদের অধিবেশন আর ডাকা হচ্ছে না। তখন ১৯৭১ সালের ১৪ ও ১৫ই ফেব্রুয়ারি সব নির্বাচিত সদস্যের সমাবেশ করা হলো ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে। সমাবেশে বলা হলো, যদি অবিলম্বে গণপরিষদের অধিবেশন ডাকা না হয় তাহলে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কী করতে চাই। ১৫ই ফেব্রুয়ারি এমন পরিবেশ সৃষ্টি হলো যে অনেক সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আজই কী স্বাধীনতার ঘোষণা করা হবে? সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা করা হলো না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শক্তভাবে দাবি জানালেন, অবিলম্বে গণপরিষদের অধিবেশন ডাকা হোক। এ সমাবেশের পরিপ্রেক্ষিেতে ৩রা মার্চ গণপরিষেদের অধিবেশন ডাকা হলো। আমারও সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করলাম। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। এ সময় আমাদের বলা হলো পহেলা মার্চ রেডিওতে কী যেন একটা ঘোষণা করা হবে ১টার সময়। আমি, তাজউদ্দীন আহমেদসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পার্টি অফিসে বসে আছি। এ সময় রেডিওতে বলা হলো, গণপরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি করা হয়েছে। এ ঘোষণায় আমাদের যে উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া ছিল তা বলার মতো নয়। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো ৩রা মার্চ বেলা ৩টায় হোটেল পূর্বাণীতে সংবাদ সম্মেলন করা হবে। ৩রা মার্চ সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য যখন পূর্বাণী হোটেলে রওনা হয়েছি, দেখি আমাদের যে প্রতিক্রিয়া তারচেয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া আরও জোরদার হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায়। স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা চলছিল। খেলা বন্ধ করে মানুষ রাস্তায় নেমে গেছে। সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস বয়কট করেছে। আমরা যখন হোটেল পূর্বাণীতে পৌঁছেছি, দেখি মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল করছে। মানি না মানবো না, আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু প্রথমেই বললেন, অধিবেশন মুলতবি করা এটি একটি মহা অন্যায়। তিনি বলেন, এই সামরিক সরকার অবৈধ। তাদের ক্ষমতায় থাকার কথা না। আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমরাই ক্ষমতার মালিক। তাই সব জনগণের কাছে আমাদের আহ্বান, এই অবৈধ সরকারের সঙ্গে সবাই অসহযোগ করবে সব ব্যাপারে। কোনো সহযোগিতা করবেন না এই সরকারের সঙ্গে। আমাদের জনগণ নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। কেউ অফিস আদালতে যাবে না। আকাশ, রেল ও সড়ক পথ বন্ধ থাকবে। এরপরে অসহযোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হলো ধানমন্ডির ২৫ নম্বরে। এর দায়িত্বে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ। জাগ্রত জনগণই ছিল আমাদের আন্দোলনের শক্তি। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে দাবি আদায় করা ছিল আমাদের লক্ষ্য। এরপরই সিদ্ধান্ত হলো ৭ই মার্চ জনসভা করার। যাতে আমাদের মূল কথাগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারি। বঙ্গবন্ধু বললেন, জনগণের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা আরও জোরদার করা দরকার। কারণ, মনে হচ্ছে পশ্চিমাদের নিয়ত ভালো না। তখন বঙ্গবন্ধুসহ ৫-৬ জন আমরা বসলাম ৭ই মাচের্র জনসভার ভাষণের খসড়া তৈরি করতে। কারণ, বক্তব্য সম্পর্কে জনগণের স্পষ্ট ধারণা হওয়া দরকার আমরা আপসহীনভাবে নেমেছি। আমাদের বক্তব্যের একটি বিষয় ছিল- হয় ছয় দফা না হয় এক দফা। তখন ছাত্রদের ভিতর থেকে দাবি ওঠে- ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হোক। আমরা আর কত সহ্য করবো। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম, জনসভাকে কেন্দ্র করে সামরিক শক্তি বাড়ানো হচ্ছে, ঢাকার উঁচু বিল্ডিংগুলোর উপর মেশিনগান ফিট করা হয়েছে। পশ্চিমাদের গণহত্যার পরিকল্পনা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। এ কারণেই সেদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি বঙ্গবন্ধু।

ড. কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধু কৌশলী সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বললেন, আমরা পুরো বিষয়টি এমনভাবে তুলে ধরবো যে, জনগণ বুঝতে পারবে আমাদের দাবি কি? আমাদের লক্ষ্য কি? মানুষকে গণহত্যা থেকে রক্ষা করবো। ৭ই মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা না করে বঙ্গবন্ধুর সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে মনে করেন কামাল হোসেন। তিনি বলেন, তা না হলে সামরিক শাসকরা জনসভায় গুলি চালাতো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিওতে সমপ্রচার না করার নির্দেশ দেন পাক সামরিক জান্তারা। তখন রেডিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বললো, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করতে দেয়া না হলে আমরা রেডিওর সমপ্রচার বন্ধ করে দেবো। পরে সরকার রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সমপ্র্রচার করতে বাধ্য হয়। ৭ই মার্চের জনসভার মতো সফল জনসভা পৃথিবীতে আর কখনো হয়নি। লাখ-লাখ মানুষের সামনে ভাষণ দিতে মঞ্চে উঠলেন বঙ্গবন্ধু। তাজউদ্দীন আহমেদকে দায়িত্ব দেয়া হলো কোনো পয়েন্ট এদিক সেদিক হলে বঙ্গবন্ধুকে ধরিয়ে দিতে। বঙ্গবন্ধু কখনোই লিখিত ভাষণ পাঠ করতেন না। আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। বঙ্গবন্ধু যে ভাষায় ভাষণ দিলেন এ ভাষা তো লিখিত ভাষা না। তিনি জানতেন কিভাবে মানুষকে উজ্জীবিত করা যায়। “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো। তবুও এ দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।” একথার মধ্যেই সবকিছু আছে। এখানে আলাদাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কোনো দরকার নেই। এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। পশ্চিমারা যে ষড়যন্ত্র করেছিল, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মাধ্যমে আমরা জবাব দিলাম। তখন পূর্ব পাকিস্তানে যে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা ছিলেন তারাও বলেছিলেন দশ লক্ষ মানুষের এত সুশৃঙ্খল সমাবেশ আমরা এর আগে কখনো দেখিনি।

মানবজমিন