স্মরণে ড. জসিম উদ্দিন নদভী

মাওলানা মাহমুদ মুজিব | শিক্ষক : জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম


একটি অঙ্কুর ধীরে ধীরে বড় হয় এবং সবুজ বৃক্ষে পরিণত হয়, ফল ও ফুল দেয়। তারপর শুকিয়ে যায় এবং মানুষ তার কথা ভুলে যায়। তবু অঙ্কুর বড় হয় এবং সবুজ বৃক্ষ হয়। ফল ও ফুল দান করে।
একটি কলি ধীরে ধীরে বড় হয় এবং সুন্দর ফুল হয়। সুবাস ছড়ায়, তারপর শুকিয়ে যায়, ঝরে যায়, মানুষ তাঁকে ভুলে যায়। তবুও বাগানে কলি আসে, ফুল ফোটে, ফুল হাসে।
একটি মুকুল ধীরে ধীরে বড় হয় এবং সুস্বাদু ফল হয়। তারপর মানবের ভোগের অনাচারে শেষ হয়ে যায় এবং মানুষ তার কথা ভুলে যায়। তবু গাছে মুকুল আসে এবং সুস্বাদু ফল হয়ে মানুষের সেবা করে।
অঙ্কুরের মত, কলি এবং মুকুলের মত মানব শিশু পৃথিবীর বাগানে আসে এবং শৈশব, যৌবন অতিক্রম করে পরিপূর্ণ মানুষ হয়। তারপর আসে বার্ধক্য, জরা ও মৃত্যু মানুষ তাকে ভুলে যায় পৃথিবী থেকে তার স্মৃতি মুছে যায়। তবুও মানব শিশু পৃথিবীতে আসে এবং বড় হয়ে বড় কিছু করে পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করে। তবে সান্তনা এই যে, ফুল ঝরে যায় এবং হারিয়ে যায়। কিন্ত মানুষ হারিয়ে যায়না। অনন্ত জীবনের অধিকার পায়। মানুষ পৃথিবীতে আসে সেই অনন্তের সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করতে।

ড. জসিম উদ্দীন নদভীও সেরকম একটি জীবনে আজ থেকে ৫৫বছর আগে দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর অন্তর্গত মাতারবাড়ি ইউনিয়নের রাজঘাট গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৬৮ ইং সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ড. জসিম উদ্দীন নদভী, পিতা জনাব আলহাজ্ব মুহাম্মদ ইসমাইল, মাতা বেগম সুরুন নাহার। তাঁর শশুর হলেন মহেশখালীর রত্ন ও গৌরব, বাংলাদেশের শীর্ষ ও বিশ্ববরেণ্য আলেমেদ্বীন, শায়খুল হাদীস, আরবী সাহিত্যিক, চট্টগ্রাম জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী।

শিক্ষাজীবন:
তিনি চট্টগ্রাম পটিয়ার আল-জামেয়া ইসলামিয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস করেন।
এরপর তিনি ১৯৯০ সালে ভারতের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা হতে ২ মেয়াদি ‘আলমিয়্যাত’ তথা আরবি ভাষা সাহিত্যে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। ১৯৯৫ সালে সৌদি আরবস্থ মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হতে ‘লিসান্স’ তথা অনার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৯৭ সালে দারুল ইহসান থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কুরআনিক সায়েন্স বিভাগ থেকে তিনি ২০০৮ সালে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৭ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার পিএইচডির বিষয় ছিল ‘একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামী দাওয়াতের পন্থা ও মাধ্যম’।

পারিবারিক জীবন:
পরিবারে তাঁর এক স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছেন। তাঁর পিতা-মাতা দুজনই জীবিত আছেন।
এছাড়া তিনি বাংলাদেশের প্রবীণ আলেমে দ্বীন, বিশ্ববরেণ্য আরবি সাহিত্যিক, জামেয়া দারুল মা‘আরিফ আল-ইসলামিয়া চট্টগ্রাম এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী’র কনিষ্ঠ জামাতা।

কর্ম-পরিধি:
১৯৯৬ সালে জামেয়া দারুল মা‘আরিফ আল-ইসলামিয়া চট্টগ্রাম-এ সিনিয়র মুহাদ্দিস ও আরবি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা। দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ’৯৬ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি জামেয়ার বিভিন্ন দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে আসছিলেন। দীর্ঘদিন জামেয়ার সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শিক্ষকতা, লেখালেখি ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

রাজনৈতিক পরিচিতি:
ছাত্রজীবনে তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য না থাকলেও পরবর্তীতে এসে তিনি “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ”কর্তৃক মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।তবে তাকে সব ঘরনার রাজনীতিবিদদের সাথে তার সুসম্পর্ক ছিলো।

লেখক ও লেখালেখি ভালোবাসতেন:
লেখালেখি ভালোবাসতেন। লিখতেন প্রচুর। অন্যদেরকে খুউব উৎসাহিত দিতেন। কারো লেখা পত্রিকা ছাপাতে দেখলে খুব খুশি হতেন। এবং ডেকে উৎসাহিত এবং পুরস্কৃত করতেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লিখতেন। পরবর্তীতে দারুল মা’আরিফ কর্মজীবনে তাঁর লেখালেখির কর্মক্ষেত্রতা অনেকটা বিস্তৃত ও বিশদ। আরবী এবং বাংলা উভয় ভাষায় লিখতেন তিনি। লেখার রচনাশৈলী ছিলো খুবই চমৎকার ও প্রাঞ্জল। অবশ্য দেখা গেছে বাংলার চেয়ে আরবীতে লিখতে তিনি বেশ সানন্দবোধ করতেন। দেশের যেকোন গুরুত্বপূর্ণ ট্রাজেডি/ঘটনায় তিনি তাঁর ফেসবুকে আরবীতে উনার মতামতগুলো প্রকাশ করতেন যেগুলো অনেক প্রাজ্ঞতার পরিচয় দেয়। উনার বেশ কয়েকটি আর্টিকেল ছেপেছে আন্তজার্তিক অনেক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে। “মানারুশ শরক” ও “আর-রাহিক” সহ বেশ কয়েকটি আরবী পত্রিকা সম্পাদনায় তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।

জামেয়া দারুল মা’আরিফে তার ভূমিকা :
তিনি জামেয়া দারুল মা’আরিফে দক্ষতা ও সুনামের সাথে প্রশাসনিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। জামেয়ার সাথে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ স্হাপনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। অপরদিকে জুমার ইমামতি করেছেন দীর্ঘ বছর। অবকাঠামোগত নানা কাজ তিনি সম্পাদন করেছেন। জামেয়ার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার নির্মানে তার অবদান অনস্বীকার্য।

ছাত্র পরিষদ গঠনে তার অবদান :
দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জামেয়ার অনেক প্রাক্তন ছাত্র। সবার পক্ষ দাবী ওঠে প্রাক্তন ছাত্রদের একটি প্লাটফর্মে একত্র করার। নানা সময় কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৮ সালে তার সাহসী পদক্ষেপে এই পরিষদটি গঠিত হয়।

উদ্যোগ-সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনঢ় :
মাদরাসায় যে কোন কার্যক্রমে তিনি সম্পৃক্ত থাকতেন। সুন্দর সুন্দর উদ্যোগ নিতেন। আর তার বাস্তবায়ন করতেন।

উৎসাহ দান :
তিনি সবাইকে নিজ নিজদক্ষতা ও যােগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের উৎসাহ দিতেন। যখন শুনতেন কেউ মাদরাসা শিক্ষা থেকে ফারেগ (সম্পন্ন) হয়েছে, তখন তাকে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে আরাে কিছু দিন পড়াশােনা করতে বলতেন। কেউ কিতাবের অনুবাদ করলে বা নিজে নিজে কিতাব প্রকাশের কথা বললে তাকেও মােবারকবাদ জানাতেন।

সমালােচনার জবাব না দেওয়া :
আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর মুখে কারো সমালোচনা শুনিনি।সমালােচনার জবাবে সমালােচনা করেননি। এটা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ কাজ।

উদারতা:
ড. জসিম সাহেব রহঃ এর মহত্ব ও উদারতার কারণে যে কাউকে করে নিতেন আপন। যে কোন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে তার সাথে মিশে কথা বলতে ভয় পেলেও তাঁর ব্যক্তিত্ব ও উদারতার ফলে পরবর্তীতে তিনি হয়ে যেতেন তাঁর আপনজন।

মেহমানদারি ও আতিথেয়তা:
তার বাসায় বা অফিসে কেউ গেলে তিনি যথােপযুক্ত সম্মান ও আপ্যায়ন করতেন।

সমাজসেবায় তাঁর সম্পৃক্ততা:
সমাজসেবার ভাবনা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “মাতারবাড়ী হিলফুল ফুজুল কল্যাণ সংস্থা।” “আল্লামা সুলতান যওক নদভী ফাউন্ডেশ বাংলাদেশ” এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সাথে জড়িত ছিলেন। উক্ত সংস্হাদ্বয়ের মাধ্যমে তিনি মসজিদ নির্মাণ, এতিম, বিধবা ও অনাথদের সহযোগীতা প্রদান, নলকূপ প্রদান, রোহিঙ্গাদের অনুদান প্রদানসহ নানান সেবা করে গেছেন।

উল্লেখযোগ্য শিক্ষকবৃন্দ:
আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী, আল্লামা আব্দুল হালিম বোখারী, আল্লামা ফুরকানুল্লাহ খলীল, আল্লামা মুফতি শামসুদ্দীন জিয়া।

উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দ :
ড. নুরুল আমিন নুরী, ড. সাদিক হোসাইন, মাওলানা এনামুল হক মাদানি, মাওলানা শোয়াইব উদ্দীন মক্কী, মাওলানা আফীফ ফুরকান মাদানি।

মৃত্য:
গত ০৮ এপ্রিল, ২০১৯, সোমবার দিবাগত রাত ৩টায় সৌদি আরবের মক্কা নগরীর কিং ফয়সাল হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। স্ত্রী ও মাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ওমরাহ পালনে গিয়েছিলেন। মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে তাঁর জানাযা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে তাকে অসংখ্য সাহাবা কেরামের স্মৃতি ও পুণ্যধন্য জান্নাতুল মুআল্লায় দাফন করা হয়। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিন। আমিন।