মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী


দেশের কওমী-মাদরাসার হাল-হাকীকত নিয়ে দেদার বলা হচ্ছে, লেখা হচ্ছে। শিক্ষা, শিষ্টাচার, আদব-কায়দা, বিনয়াচরণ ইত্যাদিতে প্রশ্ন উঠছে অনেক। অবশ্য গড়পড়তা সবাই যে প্রশ্নের অধীন–তা নয়। হাতে গোনা হলেও এমন কিছু শিক্ষার্থী আছেন, যাঁরা আদর্শের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা রাখেন। সাথে-সাথে স্বীকার করতে হয়, অধিকাংশ কওমী ছাত্র আজ সঙ্কটের সম্মুখীন। এ সঙ্কট চরিত্রের, শিক্ষার্জনের, শিক্ষার্জনে আন্তরিকতার, শিক্ষকবৃন্দের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের, কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের।

কেন এমন হচ্ছে? প্রকৃতপক্ষে কওমী-জগতে এমন পতনের শুরু খুব আগের নয়। বছর বিশেক আগেও কওমী মাদরাসার দারস-তাদরীস, আমল-আখলাক একটা মানের পর্যায়ে ছিলো। সেই মান এখন প্রশ্নের সম্মুখীন বলে মনে করছেন সচেতন ও বিজ্ঞ আলিমবৃন্দ। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দু’টো বিষয়ের আধিপত্য কওমী ছাত্রদের অবস্থানগত পতনের জন্য প্রধানত দায়ী। বিষয় দু’টি হলো: এক, স্মার্টফোন ও দুই, ছাত্র-রাজনীতি।

স্মার্টফোন
স্মার্টফোন বা মোবাইল-সংস্কৃতি এখন দেশব্যাপী মহামারী হিসাবে দেখা দিয়েছে। স্মার্টফোনের ভয়াল-থাবার শুরু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে। কওমী ছাত্রদের কাছে স্মার্টফোন বেশ লোভনীয়, আকর্ষণীয় ও আরাধ্য বস্তু। এতদিন পর্যন্ত যেসব বিষয়কে তারা হারাম বা নিষিদ্ধ মনে করতো ধর্মীয় দিক থেকে, স্মার্টফোনের কল্যাণে সেগুলো এখন হালাল, উপরন্তু আফযলও বটে। অবচেতন মনেই ওরা ছবি তুলছে, সেলফি তুলছে, নানা রঙেঢঙে ভিডিও করছে, বেফাঁস ও অভদ্র মন্তব্য দিচ্ছে। মাঝেমাঝে মনে হয়, স্কুল-কলেজের ছেলেদের সাথে কওমী ছাত্রদের পার্থক্য কেবল, টুপি, দাড়ি আর পোশাক-আশাকে। মননে-চলনে বর্তমানে খুব দূরত্ব আছে বলে মনে হয় না। এসবের জন্য প্রধানত দায়ী স্মার্টফোন।

কওমী-ছাত্রদের মধ্যে যখন স্মার্টফোনের দৌরাত্ম্য বাড়তে শুরু করে তখন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে নযর দিতে ব্যর্থ হন। ফলে ভেতরে-ভেতরে রোগ বেড়েছে খরগোস-গতিতে। এটাকে নিঃসন্দেহে কর্তৃপক্ষের অসচেতনতা বলা যায়। যখন তাঁরা ভাবতে শুরু করেন তখন ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে সারা দেহে। বছর দশেক আগে আমি নিজে এ বিষয়ে চট্টগ্রামের একটি বৃহৎ মাদরাসার সম্মানিত পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি অনেকটা অবজ্ঞাভরে যে প্রতিক্রিয়া দেখান তা রীতিমতো হতাশাজনক। তিনি বলেন: এটা ছাত্রদের নিজেদের টাকায় কেনা, ওখানে হস্তক্ষেপ করা উচিৎ হবে না। ওগুলো ওদের ব্যক্তিগত বিষয়। এখানে মাদরাসার করার কিছু নেই। বলুন তো, এ ব্যাখ্যা কতোটুকু গ্রহণযোগ্য? এ ধরনের ব্যাখ্যা কেবল ব্যক্তিবিশেষের নয়, খুঁজে দেখুন আরও পাবেন।

স্মার্টফোনের আরেকটি বড় ভয়ানক দিক হলো, কওমী মাদরাসা ও কওমী-ব্যক্তিত্বের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। কওমী-মাদরাসার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় যা প্রকাশযোগ্য নয়, অবারিতভাবে চলে যাচ্ছে ফেইসবুক ও অন্যান্য যোগাযোগ-মাধ্যমে। যেমন ধরুন, হাটহাজারী মাদরাসার সম্মানিত পরিচালক, আমীরে হেফাজত আল্লামা আহমদ শফী দা.বা.-র কথা। তাঁর সাধারণ ব্যক্তিগত উঠাবসা, কাজ করা, ব্যক্তিগত আলাপ যা বাইরে আসা উচিৎ নয়, নির্বিঘ্নে চলে এসেছে অনলাইনে। গেন্জিপরা তাঁর একান্ত ছবি সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। এ ছাড়া, মাদরাসার ভেতরের বিভিন্ন ছবি যা প্রকাশে নিরাপত্তার অভাব ঘটে, ফেইসবুকে দেদারসে প্রদর্শিত হয়েছে, হচ্ছে। এগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় অপ্রীতিকর ও অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো কারা করছে? বাইরের কওমী-বিরোধীশক্তি? না, এগুলো যারা করছে তারা মাদরাসারই ছাত্র। মাদরাসার ভেতরে কখন কোথায় কি হবে, না হবে; কে কোথায় কি বলছেন বা বলেছেন; কার কোথায় কি প্রোগ্রাম ইত্যাদি অবলীলায় চলে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। গোয়েন্দাদের যে কাজ গতর খেটে করার কথা সে কাজ মুফত করে দিচ্ছে কওমী ছাত্রেরা স্মার্টফোনের মাধ্যমে।

হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস ও হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর কথাই ধরা যাক। হযরতেরও বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয় অনলাইনে এসেছে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। হযরতের পাসপোর্ট নিয়ে চলা আন্দোলনের কথা সবাই কমবেশি জানেন। পাসপোর্ট একজন নাগরিকের খুবই সংবেদনশীল ও ব্যক্তিগত বিষয়। এর তথ্য বাইরে প্রকাশযোগ্য নয়। কিন্তু হযরত বাবুনগরীর পাসপোর্ট হস্তান্তরের আধা ঘণ্টার মধ্যেই পাসপোর্টের ভেতরের ছবি অনলাইনে প্রকাশিত হয়ে যায় সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে। তাহলে, হযরত বাবুনগরীর নাগরিক নিরাপত্তা কতোটুকু ঠিক থাকলো, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আমীরে হেফাজতের মতো হযরতেরও গেন্জিপরা ব্যক্তিগত ছবি ফেবুতে আলোচনার জন্ম দেয়। হযরত এখন কোথায় আছেন, কোথায় যাবেন, কি বলছেন ইত্যাদি বাইরে থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে হয় না, সেগুলো সহজলভ্য হয়ে উঠে ফেইসবুকে। এতে কি তাঁদের নিরাপত্তা বিপদাপন্ন হচ্ছে না?

স্মার্টফোনের আরেক বিপদ হলো, কওমী ছাত্রদের পাঠ্য, নৈতিক ও মানসিক হুমকি। উল্লেখ্য, কওমী-জগতে পাঠ্যের প্রতি একচ্ছত্র মনযোগের কোন বিকল্প নেই। এখানে যে বা যারা অমনোযোগী তারা কওমিয়্যাতের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। হাল-আমলের স্মার্টফোন কওমী ছাত্রদের এ দুর্গে আঘাত করেছে ভয়ানকভাবে। ফলে, দেখা যায়, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কওমী ছাত্র পাঠ্য ও নৈতিক অনুশীলনে বিপর্যস্ত হয়ে দিশাহীনভাবে দিনাতিপাত করছে। অধিকাংশ সময় অনলাইন ব্যবহারে পাঠে অমনোযোগিতা, মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতা এক অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে–যেখান থেকে ফিরে আসা দুষ্কর। স্বীকার করতে হয়, কওমী ছাত্রদের সিংহভাগ আসে নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার থেকে। কওমী মাদরাসায় এসব ছাত্রের বিনামূল্যে পড়া-খাওয়া বা স্বল্পমূল্যে খোরাকির ব্যবস্থা হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় চা-নাস্তার খরচ মেটাতে পরিবারকে হিমসিম খেতে হয়। এমতাবস্তায় স্মার্টফোনের খরচ মেটাতে এসব ছাত্র অসদুপায় অবলম্বন করা শুরু করে। ফলে, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যয়ের খরচের পাল্লায় ছাত্রেরা এক অস্থিতিশীল অবস্থায় পতিত হয়। এভাবে তারা পড়ালেখা থেকে দূরে সরতে থাকে।

ছাত্র রাজনীতি
আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষার দিকে তাকালে শিক্ষার অনগ্রসরতা কারণ হিসাবে ছাত্র রাজনীতিকে দায়ী করেন সিংহভাগ মানুষ। এ-দেশে ছাত্র রাজনীতির মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, মূল রাজনীতির বাজারে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার পথ তৈরি। ক্ষমতাশীনেরা নিজনিজ স্বার্থে ছাত্র রাজনীতিকে ব্যবহার করেন মাত্র। নির্যাস হিসাবে ধ্বংস হয় অগণিত সন্তানের শিক্ষাজীবন। দেশে ছাত্র রাজনীতির কৃপায় কী পরিমাণ হত্যা, গুম, খুন ও মানুষ পঙ্গু হয়েছে তা অবশ্য পরিসংখ্যানের বিষয়। ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী জার্মান রেডিও’র বাংলা বিভাগ থেকে প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে বলা হয়: রাজনৈতিক সহিংসতায় স্বাধীনতার পর গত চার দশকে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত দেড়শ’ ছাত্র প্রাণ হারিয়েছে৷ আহত হয়েছেন হাজার৷ ২০১২ সালের ১৮ মার্চ দৈনিক প্রথম আলো জানিয়েছিলো, গত চার দশকে দেশের চারটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন সব মিলিয়ে ১২৯ জন ছাত্র ৷ এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ছাত্র মারা যান৷ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম দুই মেয়াদে ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রতিপক্ষ বা নিজেদের মধ্যে প্রায় ৫০০ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে৷ এসব সংঘর্ষে মোট ৭১ জন মারা যান৷ এর মধ্যে ৫৫ জনই নিহত হন নিজেদের কোন্দলে৷ বিএনপি আমলেও একইভাবে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়েছিল ছাত্রদল৷ ছাত্রদলের মধ্যে টেন্ডারবাজিতে পড়ে বুয়েট ছাত্রী সনি গুলিবিদ্ধ হয়। চিত্রটি এখানে আনতে হয়েছে ছাত্র রাজনীতির পরিণতি বোঝাতে।

আমাদের কওমী মাদরাসা অবশ্য সাধারণ শিক্ষার কোন প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা দেয়া হয়; অানুগত্যের অনুশীলন শিক্ষা দেয়া হয়। তাই বলে কি ছাত্র রাজনীতির করুণ পরিণতির যুক্তি এখানে অযৌক্তিক হবে? স্মরণ করুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, সাধারণ বিষয়াবলীর পাশাপাশি কুরআন-হাদীস, আরবী সাহিত্য, উর্দু-ফার্সী পাঠ্য হিসাবে পড়ানো হতো। সে সুবাদে উমহাদেশের বিখ্যাত মুহাদ্দিস, হাকীমুল উম্মাহ হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ.-র বিশিষ্ট ছাত্র ও খলিফা আল্লামা জাফর আহমদ উসমানী রহ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। তখনই বিশ্ববিখ্যাত বহুভাষাবিদ ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ রহ. ও মরহুম নবাব সলিমুল্লাহ জাফর আহমদ উসমানী রহ.-র কাছে কুরআন-হাদীস শিক্ষা করে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এবার বলুন, এখন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে অবস্থায় আছে? ধীরে-ধীরে, কৌশলে সব বিদায় করে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন সেক্যুলার প্রজননকেন্দ্র। এখান থেকেই স্বঘোষিত নাস্তিক আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আযাদের মতো লোক বেরিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে এতো হানাহানির ছাত্র রাজনীতি ছিলো না। শিক্ষার অধঃগতি ছিলো না। ছাত্রদের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি ও সচেতনতা সৃষ্টির নামে যে রাজনীতির উপাদান সেদিন বপণ করা হয়, সেটারই মহীরুহ আজকের সহিংস রাজনীতির বর্বর-চেহারা।

ঠিক এক-ই যুক্তিতে কওমী ছাত্রদের সচেতন করার কথা বলে এক শ্রেণীর ইসলামী রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ কওমী মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৈশরের মতো আজ হয়তো কওমী মাদরাসার ছাত্র রাজনীতি সহিংসতার রূপ লাভ করছে না কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় (আল্লাহ না করুন) ভবিষ্যতে যে সহিংস রাজনীতির উদ্ভব হবে না–সে নিশ্চয়তা কে দেবে? অতীতে কওমী মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির কোন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিলো না। ৮০-র দশকে হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ-র খেলাফত আন্দোলন চলাকালীন প্রশ্ন ওঠে মাদরাসায় ছাত্রেরা রাজনীতিতে যুক্ত হবে কি না। এ প্রশ্নে মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ., শাইখুল হাদীস মাওলানা আজিজুল হক রহ.ছাত্র-রাজনীতির পক্ষে মতামত দেন, পক্ষান্তরে, লালবাগ মাদরাসার তৎকালীন পরিচালক মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ সাহেব রহ. ও মুহাদ্দিস মাওলানা ছালাহ উদ্দীন সাহেব রহ. মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির বিপক্ষে মতামত দেন। মুহতারাম মাওলানা আব্দুর রহীম ইসলামাবাদী সাহেব যিনি সে-সময় খেলাফত আন্দোলনের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন, এমনটাই বললেন আমাকে। এখান থেকেই খেলাফত আন্দোলনের ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং শেষোক্ত দুই হযরত লালবাগ ছেড়ে জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি প্রতিষ্ঠা করে চলে যান। অর্থাৎ, বহুল আলোচিত খেলাফত আন্দোলনের ভাঙ্গনের শুরুর কারণ ছিলো মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির প্রসঙ্গ। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি কতোটা ক্ষতিকর হতে পারে। ১৯৮৫ সালে এর সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের কওমী আদর্শ পরিপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র-সংগঠন চট্টগ্রামের দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে হামলা চালায় এবং সীমাহীন অরাজকতা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটে ফটিকছড়ির জামিয়া আরবিয়া নছিরুল ইসলাম নাজিরহাট মাদরাসায়ও। এসব ঘটনার সূত্র ধরে কওমী ছাত্রদের যে নৈতিক ক্ষতি হয়েছে তা বলা বাহুল্য।

কওমী মাদরাসার মৌলিক শর্তাবলীর দিকে তাকালে ছাত্র-রাজনীতি কখনোই অনুমোদনযোগ্য নয়। ইলমে দ্বীনের সাথে একচ্ছত্র সংযোগ ও আনুগত্যের শিকলে জীবন গড়ে তোলাই কওমী মাদরাসার ছাত্রদের মৌলিক দায়িত্ব। ভিন্ন কোন বিষয়ে মনযোগ দেয়ার অবকাশ এখানে নেই। এখানে আলোচনার মৌলিক বিষয় হলো, মাদরাসার ছাত্রদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং মাদরাসার অভ্যন্তরে রাজনীতি। বিষয়টি নিয়ে আমি খেলাফত আন্দোলনের সাবেক নেতা মাওলানা আব্দুর রহীম ইসলামাবাদীর সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করেছি। তাঁর কথা হলো: রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কওমী ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিয়ে আমাদের উলামায়ে কেরামের মধ্যে উভয়দিকে অবস্থান ছিলো। কিন্তু মাদরাসার অভ্যন্তরে রাজনীতি না করার বিষয়ে সবারই শক্ত অবস্থান দেখা গেছে।
এখন যা হচ্ছে, তা হলো, ঘোষিতভাবে মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি হচ্ছে না, অঘোষিতভাবে কমবেশি হচ্ছে। প্রতিজ্ঞাপত্রে রাজনীতি না করার শর্ত দেয়া হচ্ছে কিন্তু গোপনে প্রতিষ্ঠানে যে রাজনীতিচর্চা হচ্ছে তা কর্তৃপক্ষ জানার পরও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। অবশ্য ব্যাপারটি সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, একশ্রেণীর মাদরাসা-শিক্ষকও কোন না কোন ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত এবং ছাত্রদেরকেও গোপনে জড়িত করাচ্ছেন। বিষয়টি অস্বীকার করার মতো নয়।

যা হোক, ছাত্র-রাজনীতির বিষয়টি এখন মাদরাসার জন্য বেশ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তি-পাল্টাযুক্তি দিয়ে তর্ক-বিতর্কের উঠোন হয় তো বড় করা যেতে পারে কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফলাফল সকল যুক্তিকেই পরাজিত করছে এখন। ছাত্র-রাজনীতি কওমী মাদরাসার মধ্যে এখন দু’টো মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে: এক, ছাত্রদের মধ্যে বিভক্তি ও দুই, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা হ্রাস। যেহেতু ছাত্রেরা তাদের পছন্দানুযায়ী দল করে, সেখানে একেক দলের একেক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনুসারী ছাত্রেরাও ভিন্নভিন্ন দৃস্টিভঙ্গিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শুরু হয় নিজ-দলের দৃষ্টিভঙ্গিকে অপর-দলের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রাধান্য দেয়ার পালা। জন্ম নেয় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতা, নিজদলের নেতাদের প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন আর অন্যদলের নেতাদের ছোট করে দেখার মানসিকতা। এগুলোই ধীরে-ধীরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের প্রতি দায়বদ্ধতাকে ব্যহত করে। ছাত্রেরা দলকে সবকিছুর উর্ধে স্থান দেবার চেষ্টা করে। যে শিক্ষক তার দলকে সমর্থন করে না বা বিরোধিতা করে, সে-শিক্ষককে তির্যক-দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা শুরু হয়। এখান থেকে জন্ম নেয় অভদ্র আচরণ বা শৃঙখলা ভঙ্গের মতো নিন্দনীয় কাজ। অনেক সময় দেখা যায়, একটি দলের অনুসারী কোন ছাত্রের বিরুদ্ধে মাদরাসা ব্যবস্থা নিলে সে-দলের অন্যেরা প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়। মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির অতীত থেকে আমি নিজে সে-সব তিক্ত-ঘটনার কথা জেনেছি। ১৯৮৫ সালে হাটহাজারী মাদরাসায় কওমী আদর্শ পরিপন্থী একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মী-সমর্থক কর্তৃক হামলার ঘটনায় উপরের সব উপাদান উপস্থিত ছিলো। ওসব কারণে পরবর্তীতে ফটিকছড়ির নাজিরহাট বড় মাদরাসায়ও হামলার ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে দেশের কওমী মাদরাসাগুলোতে কমবেশি অঘোষিত ছাত্র রাজনীতি চলছে। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মাদরাসায় সক্রিয় বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে অসুস্থ সম্পর্ক ও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। এখন যে হারে নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে, তাতে বলা যায়, সময়ের পরিক্রমায় মাদরাসার ছাত্র-রাজনীতি সহিংস হয়ে উঠলে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এসব দলের ছাত্রদের পারস্পরিক যে কদর্য বাদ-অপবাদ ও তর্ক করতে দেখা যায়–তাতে উপরোল্লেখিত সাধারণ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানের আদলে সহিংস-ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নাকচ করা যায় না। এখন থেকে এসব বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক না হলে কওমী-জগতকে ভবিষ্যতে কঠিন মূল্য দিতে হবে।

শেষকথা
কওমী মাদরাসাগুলোতে ছাত্রদের স্মার্টফোন ব্যবহার বন্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি। ছাত্রদের নৈতিক ও চারিত্রিক পতন ঠেকাতে এর কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে যেভাবে স্মার্টফোনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। একবার একটি আইন করে, তল্লাশি চালিয়ে কিছু জব্দ করে এ পতন ঠেকানো সম্ভব নয়। আইন জারি করে সে-আইন সার্বক্ষণিক বলবতের ব্যবস্থা রাখা ও তদারকি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে কক্ষে-কক্ষে সিসি ক্যামেরার কথা ভাবা যেতে পারে। তা সম্ভব না হলে, বাছাইকৃত স্থানে গোপন ক্যামেরার সাহায্যে তদারকি করা যেতে পারে। ভর্তির সময় স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার শর্তারোপ করে অমান্যকারীকে বহিস্কারের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কোন বিকল্প নেই বলে মনে হচ্ছে। ছাত্র-রাজনীতির সুযোগে কওমী পরিপন্থী রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। কওমী ছাত্রদের সার্বিক ব্যক্তিত্ব গঠনকে রক্ষা করতে হলে মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ করার বিকল্প নেই। ছাত্রেরা এখানে কেবল কুরআন-সুন্নাহ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করবে, অভিজ্ঞ হবে; এরপর তারা রাজনীতি করুক–তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু যে ছাত্র-জীবনে নিজেকে যথার্থভাবে গড়ে তোলার কথা, সেখানে রাজনীতির মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে মনযোগী হয়ে আসল কাজ থেকে দূরে সরে পড়বে–তা মেনে নেয়া যায় না। কোন বিবেকবান এটা মানতে পারেন না। আমরা চাই আমাদের ছাত্রেরা আগে যোগ্য হোক, আদর্শবান হোক, তারপর অন্য কিছু করুক। স্মার্টফোনের মতো মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি বন্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেয়া হোক। এতে ছাত্রদের মধ্যে দলাদলি-হানাহানির মানসিকতা নিয়ন্ত্রিত হবে। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে এমন ব্যবস্থা নেয়া এখন অপরিহার্য।