পাকিস্তান-আফগান উভয়সঙ্কট থেকে ভারতের মুক্তি নেই!

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত ১২ সেপ্টেম্বর দোহায় আন্তঃআফগান আলোচনার উদ্বোধনী দিনে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে অনলাইনে বক্তৃতা করেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে কোনো একটি পর্যায়ে তালেবানের সাথে সরাসরি আলোচনায় রাজি হতে পারে ভারত। আর আফগানিস্তানবিষয়ক বিশেষ মার্কিন প্রতিনিধি জালমি খালিলজাদ চলতি বছরের মে মাসে উল্লেখ করেন, আমেরিকা এ ধরনের আলোচনাকে সমর্থন করে। এটি হবে ভারতের নীতির বড় ধরনের পরিবর্তন।

চলতি বছরের প্রথম দিকে কার্নেগি ইন্ডিয়ার স্কলার রুদ্র চৌধুরী ও শ্রেয়াস শিন্দে লিখেছেন যে ভারতের আফগানিস্তান নীতি ভারতীয় স্বার্থের অনুমিত ঝুঁকির মাধ্যমে অবয়ব লাভ করেছে: আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব এবং কাবুলে বিভক্ত সরকার। আফগানিস্তানে অব্যাহত মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এসব ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস করত। তবে তালেবান ও আফগানিস্তানের অন্যান্য পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহার পুরোপুরি হয়ে যাবে। ফলে আন্তঃআফগান আলোচনা, পাকিস্তান, ইরান বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক খেলোয়াড়ের সঙ্গে নয়া দিল্লীকে খুবই কম কার্ড নিয়ে খেলতে রাজি থাকতে হবে কিংবা পুরোপুরি সাইডলাইনে থাকতে হবে।

কিংবা আর যে কাজ করতে পারে তা হলো, তালেবানের সাথে ভারত সরাসরি আলোচনায় বসতে পারে এবং ভারতের স্বার্থ রক্ষার বিনিময়ে তাদেরকে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সুযোগের প্রস্তাব দিতে পারে। পাকিস্তানের সাথেও ভারত আলোচনা করতে পারে এবং কাশ্মীরসহ বৃহত্তর বিষয়াদি আলাচনায় আসতে পারে।

তবে এসব সম্ভাবনার কোনোটিই আশাবাদী মনে হচ্ছে না।

৮ সেপ্টেম্বর ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়, আফগানিস্তানের শান্তির প্রতি সমর্থনের বিনিময়ে তালেবানের জন্য একটি রোড নেটওয়ার্ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। তালেবানের সাথে ঘনিষ্ঠ এক পাকিস্তানি উপজাতীয় নেতা পত্রিকাটিকে বলেন, চীনা প্রতিশ্রুতির মধ্যে আফগানিস্তানজুড়ে একটি রোড নেটওয়ার্ক নির্মাণের কথা রয়েছে। এ ধরনের একটি নেটওয়ার্ক হবে ছয় লেনের মহাসড়ক। চীনারা বলছে, এতে করে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। কাবুল ও বেইজিং ইতোমধ্যেই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় একসাথে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, তালেবানকে কাছে টানতে চাইছে চীন। চীনা এক বিশেষজ্ঞ বলছে, তাদের প্রকল্পটি আফগানিস্তানের গরিব অর্ধেক মানুষের জন্য সহায়ক হবে।

অবশ্য এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানে চীনের বিনিয়োগ খুবই কম দেখা যাচ্ছে। সে তুলনায় ভারতের বিনিয়োগ অনেক বেশি।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করা। তবে আফগানিস্তান বা কাশ্মীর যে ইস্যুতেই আলোচনা হোক না কেন, শুরুর আগেই তাতে অচলাবস্থা দেখা দেবে। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকার প্রকাশ্যেই পাকিস্তানের সাথে আলোচনার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছে। কাশ্মীর বিরোধ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কোনো সম্ভাবনাই বলতে গেলে নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আফগানিস্তান প্রসঙ্গে ভারতের কথা পাকিস্তান মেনে নেবে কিনা তা পুরোপুরি অস্পষ্ট। কিংবা আফগানিস্তানে তালেবানসহ তার প্রক্সিদের দিয়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে কিনা তাও বিবেচ্য বিষয়।

একইভাবে ইরানের সাথে ভারতের আফগানিস্তান নীতির সমন্বয় সাধনও অসম্ভব। কারণ ইরানে ভারতের প্রকল্পগুলো সমাপ্ত করতে পারেনি নয়া দিল্লী।

এর ফলে ভারতকে নির্ভর করে থাকতে হবে উপসাগরীয় এলাকার সুন্নি দেশগুলো ও রাশিয়ার ওপর। নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্রনীতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমান তালেবানের প্রতি কঠোর কৌশলগত নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে তালেবানের ওপর কতটুকু প্রভাব তিনি রাখতে পারেন, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে তালেবানের সাথে আরব আমিরাতের সম্পর্কও ভালো নয়। গত বছর প্রকাশিত এক খবর অনুযায়ী, ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন জায়েদ তালেবান নেতাদের হত্যা করার প্রস্তাব করেছেন। রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্কই বরং অনেক বেশি আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। কারণ ভারতের আফগানিস্তান স্বার্থ নিয়ে কথা বলছে রাশিয়া, তবে তা পরিমিত মাত্রায়।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ও ডিপ্লোম্যাট