যে লোকটি আফগানিস্তান থেকে আমেরিকাকে বিতাড়িত করেছেন

আফগানিস্তানে আমেরিকান বাহিনীর প্রথম সংঘাতে মোল্লা ইব্রাহিম সদরকে যুদ্ধের যে নৃশংস বাস্তবতা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, তা তিনি কখনো ভোলেননি। পরবর্তী সময় যারা তাকে তালেবানের মধ্যে ক্রমশ ওপরে ওঠতে দেখেছে এবং আল-কায়েদার সর্বোচ্চ পর্যায়ে শ্রদ্ধা পেতে দেখেছেন, তারা জানেন যে ওই ঘটনার পর থেকে তার উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট ছিল।

তখন ছিল ২০০১ সালের শরৎকাল। ইব্রাহিম সদর তখন ছিলেন তালেবানের মধ্যম পর্যায়ের ফিল্ড কমান্ডার। তাকে কাবুল রক্ষার আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমেরিকান বিমানবাহিনী নগরীতে বোমা বর্ষণ করল। তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল স্থল বাহিনীর হামলা প্রতিরোধ করতে, আর রাসায়নিক অস্ত্রের শিকার হতে হবে, এমন ভুল ধারণায় তাকে গ্যাস মাস্কও দেওয়া হয়েছিল। আকাশ থেকে আমেরিকার প্রচণ্ড হামলায় তার কৌশল ও সেকেলে সরঞ্জাম অকার্যকর প্রমাণিত হলো।

একটি বোমা পড়লেই কাবুলের সব পর্বত কাঁপত, স্মরণ করেন তার দলের সদস্য হাজি সৈয়দ। যারা পালাত না, তারা হয় মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকা বি-৫২ বিমানের বোমায় কিংবা তালেবানের আফগান শত্রুদের নিয়ে গঠিত আগুয়ান মিলিশিয়াদের হাতে মারা পড়ত। সদর দীর্ঘ সময় তার অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।

কিন্তু পরে দেখলেন, এভাবে টিকে থেকে লড়াই করার কোনো অর্থ নেই। তখন তিনি সরে পড়েন। তার সরে যাওয়ার সাথে সাথেই তালেবান শাসনের পতন ঘটে। তিনি দক্ষিণে কান্দাহার চলে যান। তারপর তিনি গায়েব হয়ে যান। তার অবস্থান জানতেন কেবল তার ঘনিষ্ঠ জনেরা।

ইব্রহিম সদরের অল্পের জন্য পালিয়ে যেতে পারাটা আমেরিকার ইতিহাসে দীর্ঘতম যুদ্ধের ফলাফলের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

পরের ১৯ বছরে ওই প্রথম তিক্ত পরাজয়ের স্বাদকে তালেবানের পর্যুদস্ত, ক্ষমতাচ্যুত সরকার থেকে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর গেরিলা সেনাবাহিনীতে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। তা সত্ত্বেও আফগানিস্তান বা আমেরিকার খুব কম লোকই তার নাম শুনেছে। এর কারণ হলো তার কাজ করার গোপন প্রকৃতি।

তালেবানের সামরিক প্রধান হলেন সদর। আফগানিস্তানে বিদ্রোহ হচ্ছে তার নেতৃত্বেই। তার তদারকিতেই আত্মঘাতী হামলা, রাস্তার পাশে বোমা হামলা, গুপ্তহত্যা, বড় ধরনের নগর হামলা ঘটছে।

২০০১ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে সাড়ে তিন হাজারের বেশি আমেরিকান সৈন্য ও লাখ লাখ আফগান বেসামরিক নাগরিক মারা গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সাথে চুক্তির আলোকে আমেরিকা অবশেষে দেশটি থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অনন্যসাধারণ কৃতিত্ব অর্জনের পরও সদর কেন প্রচারের আলোর বাইরে থাকেন, তা তার ঘনিষ্ঠজনদের অবাক করে না। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বন্ধু ও পরিচিতজনেরা তাকে প্রতিভাধর কমান্ডার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি খ্যাতির ব্যাপারে আগ্রহী নন। ১৯৯০-এর দশক থেকে তিনি তালেবান নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ়ভাবে অনুগত থেকে আছেন।

তিনি ১৯৬০-এর দশকে জন্মগ্রহণ করেন আফগানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ হেলমন্দের জগারান গ্রামে। তার জেলায় উর্বর এলাকায় আনার আর পপি চাষ হয় ব্যাপকভাবে। এখানে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রচণ্ড লড়াইও হয়েছে।

আলাকোজাই গোত্রের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন পশতু পরিবারের মধ্যম সন্তান সদর তার তারুণ্যে জন্মের সময় রাখা খোদাইদাদ নামে পরিচিত ছিলেন। সদর নামটি এসেছে অনেক পড়ে। ১৯৭৮ সালে কাবুলে এক অভ্যুত্থানে আফগান কমিউনিস্টরা ক্ষমতা গ্রহণ করার পর এবং সোভিয়েত বাহিনী দেশটিতে হামলা চালানোর এক বছর পর তিনি ও তার পরিবার ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দেন।

বাবার সাথে সদরও আফগানিস্তানের অন্যতম বৃহত্তম মুজাহিদিন দল জামায়াতে ইসলামিতে যোগ দেন। তাদের সাথে যুদ্ধ করা সানজিনের এক অধিবাসী বলেন, এটি ছিল বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। জামায়াত আমাদের সর্বোত্তম খাবার ও অস্ত্র দেওয়ায় আমরা তাদের সাথে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

১৯৯২ সালে আফগান কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর সদর বিভিন্ন মুজাহিদ দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া গৃহযুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি পড়াশোনা করার জন্য পাকিস্তানের পেশোয়ারের একটি মাদরাসায় ভর্তি হন।

এই পর্যায়ে তিনি তার প্রথম নাম ইব্রাহিম বদল করেন। তার নেতৃত্বের সহজাত গুণের কারণে তার সহপাঠীরা তাকে সম্মানের সাথে সদর নামে ডাকতে থাকে। ফারসি ভাষায় এর অর্থ হলো ‘প্রেসিডেন্ট’। তিনি এটিকেই তার ডাকনাম হিসেবে গ্রহণ করেন।

আফগানিস্তানজুড়ে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তালেবান আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এগিয়ে আসে। সদর এই ডাকে সাড়া দেন। কান্দাহারের ব্যবসায়ী ও অনেক দিন ধরে সদরকে চেনেন, এমন এক সাবেক তালেবান যোদ্ধা বলেন, তিনি নেতাদের খুব কাছের। কিন্তু তাদের পাশে নীরব থাকেন, কখনো কমান্ডার হিসেবে কাজ করেন না।

১৯৯৬ সালে কাবুলে তালেবান ক্ষমতা দখলের আগে পর্যন্ত সদরের তেমন পরিচিতি ছিল না। তাকে ওই সময় রাজধানীর বিমানবন্দরের প্রধান এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ কাবুলের বিমান বাহিনীর প্রধান করা হয়। তার দায়িত্ব ছিল সোভিয়েত আমলের যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমানগুলো তদারকি করা।


ওই সময়ের বেশির ভাগ তালেবান নেতার মতো সদরও সাদামাটা জীবনযাপনে গর্ব অনুভব করতেন। তিনি দক্ষিণ আফগানিস্তানের ধার্মিক পশতু লোকদের মতো ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতেন। এমনকি সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়ও সালওয়ার কামিজ ও কালো পাগড়ি পরতেন। তবে প্রখ্যাত গেরিলা নেতার ক্যারিশমা ও উচ্চাভিলাষ তখনই দৃশ্যমান হয়েছিল।

কাবুলের বিমান বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে তিনি তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে থাকা স্থানীয় বিরোধীদের গুঁড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাবেক কমিউনিস্ট, যুদ্ধবাজ ও পরে আমেরিকান সমর্থনপুষ্ট নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধে তার পাইলটরা বিমান হামলা চালায়। মর্যাদা বাড়ার সাথে সাথে তিনি কয়েকজনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যা পরে খুব কাজে লাগে।

বিশেষ করে তিনি ভবিষ্যতের তালেবান নেতা মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুরের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ওই সময় তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি কাবুলে মোতায়েন বিদেশী যোদ্ধাদের সাথেও দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে আমেরিকার হামলার সময় তিনি কাবুলের ঠিক উত্তরে শমালিতে দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। অবস্থান ধরে রাখতে না পেরে তিনি কাবুলের দক্ষিণ দিকে চলে যান। এখানেই তিনি তার লোকদের গ্যাস মাস্ক দিয়েছিলেন বলে জানান তার সহকর্মী হাজি সৈয়দ।

পরের কয়েক বছর পর্যন্ত সদরের ঠিকানা ও কার্যক্রম সম্পর্কে সামান্যই জানা যায়। ধারণা করা হয়, তিনি তালেবান সামরিক বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পান ২০১৪ সালে। এর বছরখানেক আগে তালেবান আন্দোলনের নেতা মোল্লা ওমর ইন্তেকাল করেন।

মোল্লা ওমরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন সাবেক বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী মোল্লা মনসুর। তিনিই তাকে সম্ভবত ওই পদে নিয়োগ করেছিলেন। ২০১৬ সালের ২১ মে পাকিস্তানে এক আমেরিকান ড্রোন হামলায় মনসুর নিহত হন। কিন্তু সদর ততদিনে প্রমাণ করেছেন, তিনি ওই দায়িত্ব পালনে সক্ষম।

চলতি বছরের প্রথম দিকে খবর আসে যে তালেবানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রশমন করতে মোল্লা ওমরের এক ছেলেকে সদরের স্থানে নিয়োগ করা হয়েছে। তবে এশিয়া টাইমস সূত্র জানায়, যেকোনো পরিবর্তনই কৃত্রিম। সদর এখনো আন্দোলনের সামরিক বিভাগের দায়িত্বে আছেন। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও একথা সমর্থিত হয়।

ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সাথে হওয়া শান্তিচুক্তি অনুযায়ী, আগামী বছর আমেরিকান সৈন্যরা আফগানিস্তান ত্যাগ করবে।

আমেরিকান সৈন্যদের চলে যাওয়ার পর তালেবান বিদ্রোহের অবসান ঘটিয়ে মার্কিন মদদপুষ্ট আফগান সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে না-কি শক্তি দিয়ে ক্ষমতা দখল করবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তালেবানকে। আর তাতে সদরের মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সাউথ এশিয়ান মনিটর

About |

Check Also

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্বেও রাশিয়া থেকে এস-৪০০ কিনবে তুরস্ক

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্বেও রাশিয়া থেকে এস-৪০০ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করা থেকে ফিরবে না …