‘আদিম মানুষ জ্ঞান ও বিবেক সম্পন্ন ছিল, তাঁরা অসভ্য ছিল না’

জানুয়ারি ২০, ২০২০ । আরিফুল ইসলাম



তিনিই সে সত্ত্বা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমীনে রয়েছে সে সমস্ত। তারপর তিনি মনোসংযোগ করেছেন আকাশের প্রতি। বস্তুত তিনি তৈরী করেছেন সাত আসমান। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবগত। -সুরা বাকারা ২:২৯

আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বললো, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে হাঙ্গামা সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরাইতো আপনার প্রসংশাসহ তাসবিহ ও পবিত্রতা ঘোষনা করি, তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি যা জানি তোমরা তা জানো না। – সুরা বাকারা ২:৩০

আর আল্লাহ তা’আলা আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন,তারপর সে সকল ফেরেশতাদের সামনে পেশ করলেন এবং বললেন ,তোমরা এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও যদি তোমরা সত্যবাদী হও। -সুরা বাকারা ২:৩১

তারা বললো, আপনি মহান পবিত্র, আমাদেরতো কোন জ্ঞান নেই, যা আপনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন তা ব্যতিত, নিশ্চয় আপনি মহাজ্ঞানী মহাবিজ্ঞ। -সুরা বাকারা ২:৩২

তিনি বললেন, হে আদম, ফেরেশতাদেরকে বলে দাও এসবের নাম। তারপর যখন তিনি বলে দিলেন সে সবের নাম, তখন আল্লাহ তা’আলা বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি , আমি আসমান ও জমীনের যাবতীয় গোপন বিষয় সম্পর্কে খুব ভাল করেই অবগত রয়েছি? এবং সেসব বিষয়ও জানি যা তোমরা প্রকাশ কর, আর যা তোমরা গোপন কর! -সুরা বাকারা ২:৩৩

এই আয়াতগুলোর সুস্পষ্ট বক্তব্য হল প্রথম মানুষ দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। পৃথিবীর এবং পৃথিবীর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কিছুর জ্ঞানই প্রথম মানবকে দিয়ে মানব জাতিকে ফেরেশতাদের থেকে সম্মানিত করা হয়েছে। এটা এমন জ্ঞান যা ফেরেশতাদের দেওয়া হয়নি। নচেৎ ফেরেশতাদের যুক্তি ছিল রক্তপাত এবং ঝগড়া ফাসাদ মুক্ত হয়ে ইবাদত তো তারা করছেই। তবে মানব সৃষ্টির প্রয়োজন কি ? এর জবাবে আল্লাহ তা’আলা প্রথম মানব সৃষ্টি করে তাকে রক্তপাত বা ফাসাদমুক্ত হিসাবে মালাইকাদের সম্মুখে পেশ করেননি। বরং আদম আ. কে জ্ঞান দিয়ে মালাইকাদের সামনে প্রমান করেছেন যে এই মানব গোষ্ঠী জ্ঞানের দিক থেকে তোমাদের থেকে উত্তম। তাই যদিও তারা ফাসাদ করবে রক্তপাত করবে তবুও তাদেরকে জমিনের খলীফা হিসাবে মনোনয়ন দান করা সঠিক সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ ফেরেশতাগন কেবলমাত্র তাদের জানা দিকটি বিবেচনা করেছে। কিন্তু তাদের জানার বাইরেও আরো দিক রয়েছে।

এই আলোচনাতে মূলত আদিম মানুষ বর্বর হওয়া , অশিক্ষিত হওয়াকে সম্পূর্ন নাকচ করে দেয়।

ফেরেশতাদের প্রতিউত্তর আপনি পবিত্র! আমরা কোন কিছুই জানি না, তবে আপনি যা আমাদিগকে শিখিয়েছ (সেগুলো ব্যতীত) নিশ্চয় তুমিই প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন, হেকমতওয়ালা” দ্বারা প্রমানিত হয় ফেরেশতাগন জগতের বিষয়ে যে জ্ঞান রাখেন তা মানুষের তুলনায় সীমাবদ্ধ। আল্লাহ আদম আ. কেই কেবল পৃথবীর খলীফা তথা প্রতিনিধি করেননি বরং তার বংশকেও করেছেন। তাই সৃষ্টিগতভাবে কেবল আদম আ. ই নন বরং আদম আ. এর বংশধর সকল মানব সন্তানই আল্লাহ প্রদত্ত সেই জ্ঞান সম্পন্ন।

এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো আল্লাহ সমগ্র মানব জাতিকেই জমিনের প্রতিনিধি বানিয়েছেন। আর জমিনের প্রতিনিধি বানানোর ক্ষেত্রে তাদের যে যোগ্যতা উত্থাপন করেছেন তা হলো জ্ঞান। প্রশ্ন উত্থাপিত হয় আদম আ. কে আল্লাহ জমিনের সকল জিনিসের নাম শিখিয়েছেন তথা জ্ঞান দান করেছেন, সেই জ্ঞান সকল মানব সন্তানের মধ্যে আমরা দেখতে পাই না কেন ? এর উত্তর হল, এই জ্ঞান প্রতিটি মানব সন্তানের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক আকল তথা বিবেক যার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে জগতের সকল কিছুই সে জানতে ও বুঝতে সক্ষম এবং এর উপর আধিপত্য বিস্তার করে আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিনিধিত্বের হক আদায় করতে সক্ষম। এই সক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রকাশ আদম আ. এর মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়ে আল্লাহ ফেরেশতাদের সম্মুখে প্রমান করেছেন যে জমিনের খলীফা বা প্রতিনিধিত্ব করার হক মানুষেরই আছে।

আর তাই মানব সভ্যতার প্রাথমিক অবস্থাটা জংলী ও বর্বর থাকার ধারনা অসত্য।

মানুষের মধ্যে যদি জ্ঞানের সক্ষমতার মৌলিক গুন না থাকতো তবে বর্তমান সময়ে এসেও মানুষ অজ্ঞই থাকতো। জগতে এমন কোন প্রাণ নেই যাদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে সভ্য হওয়ার নূন্যতম কিছু পাওয়া গিয়েছে। অথচ স্বাভাবিক কিছু বিচার বুদ্ধি (যেমন প্রাকৃতিক সমস্যাগুলো থেকে বাচা, জীবন ধারনের বিষয়ে চিন্তা করা) ইত্যাদী গুণ তাদের মধ্যেও রয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে সেই বিবেক বুদ্ধির কোন উৎকর্ষ আমরা দেখি না। অন্য সকল প্রাণীকূল সৃষ্টির আদি হতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে একই অবস্থায় বিরাজমান। কারণ তাদের ঐটুকু জ্ঞান দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে। অপরদিকে মানুষের মধ্যে সুপ্ত রয়েছে পৃথবীর সকল বিষয়ের জ্ঞানের। সেই সুপ্ত জ্ঞান বিবেকের মাধ্যমে মানুষ ক্রমান্বয়ে ডিসকভার করে। তারা তাদের পূর্বপূরষ থেকে উন্মোচিত জ্ঞানগুলো গ্রহণ করে এবং বিবেক খাটিয়ে আরো জ্ঞানকে উন্মোচন করেন। এই জ্ঞানের সম্পূর্ন অংশই সৃষ্টিগতভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে রয়েছে। এটি আসলে মূলত নিজেকেই জানা। এই জানার জন্য সে বিভিন্ন মাধ্যম গ্রহণ করে থাকে মাত্র।

এছাড়া পাঠক, আপনি খেয়াল করুন, প্রত্যেক প্রাণীর পৃথক পৃথক বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে। তন্মধ্যে কিছু জ্ঞান যথেষ্ট জটিল। যেমন মৌমাছি একটি ক্ষুদ্র রাজ্য পরিচালনা করে। পিপিলীকা শীতের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে। এছাড়া প্রাণীকূলের একেকটির মধ্যে আমরা একেক ধরনের অনুভূতি পাই। এত জ্ঞান এবং বৈচিত্র সত্বেও তারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের প্রাথমিক পর্যায় থেকে উন্নত হতে পারেনি। কেউ যদি দাবি করে যে প্রাণীরা তাদের মধ্যে জ্ঞানের আদান প্রদান করতে পারে না তবে সেটাও হবে সম্পূর্ন অযৌক্তিক একটি দাবি। মৌমাছির প্রতি লক্ষ করুন। তারা যেভাবে নিয়ম মেনে চলে তাতে এটা স্পষ্ট যে তারা শুধু নিজের উপর নয় বরং তারা অন্য মৌমাছির কার্যকলাপের প্রতিও দৃষ্টি রাখে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের জ্ঞান সৃষ্টির আদি থেকে আজ পর্যন্ত কোনরূপ বিকাশ লাভ করেনি। অথচ মানুষের করেছে। এইসব পর্যবেক্ষণ আমাদের কাছে সুস্পষ্ট করে যে, মানুষের মাঝে জমিনের সকল জ্ঞান সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। যদি না থাকতো তবে মানুষ কেয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করেও তার জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে পারতো না, যেমনিভাবে অন্য সকল প্রাণী পারে না।

তাহলে আমরা পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে অনুভব করতে পারছি যে আমাদের বিকশিত জ্ঞানের সবটুকুই মৌলিকভাবে প্রথম মানুষের মধ্যে ছিল। আর তিনি তার সন্তানদের সেই সম্পূর্ন জ্ঞান থেকে ততটুকু সরাসরি উন্মোচন করেছেন যতটুকু তার সন্তানদের প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন ছিল। আর তার সন্তানগনও সেটিকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হওয়ার কারণ হলো সন্তানগনের মধ্যে সুপ্তভাবে সেই জ্ঞানের অস্তিত্ব সৃষ্টিগতভাবে থাকা। যদি না থাকতো তবে যেমনটা আমি ইতোপূর্বে বলেছি , তারা অন্যান্য প্রাণীর মতোই জীবন ধারণের প্রাথমিক জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। আর এই পর্যবেক্ষন আমাদের কাছে এই সত্য বিবেকগতভাবে উন্মোচন করে যে আদিমযুগের মানুষ বর্বর ছিল না। (আল্লাহই অধিক অবগত)