আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে মামলা, যা বলছেন বাদী মুফতী হাবিবুর রহমান কাছেমী

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অবস্থিত নাজিরহাট মাদরাসা ইস্যুতে হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি জানিয়ে হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষকদের সম্মিলিত বিবৃতি প্রকাশের পরিপেক্ষিতে এর পতিক্রিয়া জানিয়েছেন মামলার বাদী মুফতী হাবিবুর রহমান কাছেমী।

পাঠকদের জন্য মুফতী হাবিবুর রহমান কাছেমী প্রেরিত বিবৃতিটি হুবহু তুলে ধরা হলো-


শতবর্ষী একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতেই আমি মহামান্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি

মুফতী হাবিবুর রহমান কাছেমী : ভারপ্রাপ্ত পরিচালক, নাজিরহাট বড় মাদরাসা

আল-জামিয়াতুল আরাবিয়া নাছিরুল ইসলাম নাজিরহাট বড় মাদরাসা ফটিকছড়ি চট্টগ্রাম একটি শতবর্ষী স্বনামধন্য দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মাদরাসাটি এ পর্যন্ত কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ কার্যকরী পরিষদ শূরা কমিটি এবং মাদরাসার নিজস্ব ওয়াকফনামা মোতাবেক সুচারুরূপে পরিচালিত হয়ে আসছে।

গত ২৮ মে ২০২০ ইং তারিখে মাদরাসার নিয়মতান্ত্রিক পরিচালক আল্লামা শাহ ইদ্রিস সাহেব রহ. ইন্তেকাল করেন। এতে উক্ত পদ শূণ্য হয়ে পড়লে আমার উপর দায়িত্বভার আসে। যেহেতু দীর্ঘ সতেরো বছর যাবত আমি শূরা কর্তৃক নিযুক্ত নায়েবে মুহতামিম তথা সহকারী পরিচালক।

আমি সকলের মুরুব্বি আহমদ শফী সাহেবসহ মাদরাসার সকল শিক্ষকগণকে আশ্বস্ত করি যে, করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণপূর্বক দ্রুত একটি শূরার আয়োজন করে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা করা হবে। শূরা যাকে মনোনীত করে আমরা তার অনুগত হয়ে মাদরাসার কাজ করে যাবো,ইন-শা আল্লাহ।

কিন্তু মাদরাসার জনৈক শিক্ষক মাওলানা সেলিমুল্লাহ নিজের দুর্নীতি, খেয়ানত আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঢাকতে আল্লামা আহমদ শফী দা.বা.কে ব্যবহার করে নিজেকে মুহতামিম পদে বসাতে তৎপর হয়। এর মধ্যে গত ৭ জুন ২০২০ইং কথিত এক শূরার ভুয়া, বাজারি খাতার ছিন্ন একটি রেজুলেশন পাতা দেখিয়ে নিজেকে মুহতামিম দাবি করে। যাতে শূরা বৈঠকের স্থান সময় কিছুই উল্লেখ নাই। তবু তাদের মৌখিক দাবির ব্যাপারে আমরা যাচাই করে জানতে পারি সেদিন হাটহাজারী মাদরাসায় কোনো বৈঠকই হয়নি। তথাপি সেই বৈঠককে প্রত্যাখ্যান করে শূরার মুরুব্বিগণ সেদিন আহমদ শফী হুজুর বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। কথিত রেজুলেশনে যাদের নাম দেখানো হয়েছে তারা কেউ শূরার সদস্য ছিল না। হাটহাজারী মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক বসে কীভাবে অপর একটি মাদরাসার এতবড় গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে? স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে একমাত্র আল্লামা আহমদ শফী সাহেব শূরার সদস্য থাকলেও তিনি এর দু’দিন আগ থেকে ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। এবং সেদিন তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার দেখানো স্বাক্ষরটি নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। উপস্থিতদের মধ্যে আল্লামা শেখ আহমেদ সাহেব, মুফতি জসিমউদদীন সাহেব এবং মাওলানা উমর ফারুক বিন মান্নান খান ছিলেন না বলে আমাদের সাফ জানিয়েছেন। এতগুলো অসঙ্গতিপূর্ণ একটি বৈঠক কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয় তা বুঝে আসে না।

তদুপরি মাদরাসার ওয়াকফনামায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, মাদরাসার শূরা বৈঠক নাজিরহাট বড় মাদরাসায়ই হতে হবে এবং সকল সদস্যদের মধ্যে পাঁচজন অনুপস্থিত থাকলে তা বৈঠক বলে গণ্য হবে না। উক্ত বৈঠকে আহমদ শফী সাহেব ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না।

নাজির মাদরাসাটি বেফাকুল মাদারিস বাংলাদেশ এর অধীনে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ইহার নীতিমালার ৪ নং ধারায় সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, শুরার বৈঠকে মুহতামিম এর উপস্থিতি আবশ্যক। তার অনুপস্থিতিতে কোন মিটিং করা যাবে না। সংবিধানে আরো উল্লেখ আছে যে, মুহতামিম পদাধিকার বলে শুরার সেক্রেটারী এবং তিনিই মিটিং আহবান করবেন। অথচ বিগত ৭ তারিখে কথিত শুরার বৈঠক সম্বন্ধে আমি কিছুই জানিনা এবং আমি মিটিং ও আহবান করিনি এবং উক্ত বৈঠকে শুরার ১২ জন সদস্যের মধ্যে১১ জনই অনুপস্থিত ছিলেন। আল্লামা আহমদ শফি সাহেব হুজুর ওই দিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আই সি ও -তে ভর্তি হন। তার অবর্তমানে তাকে সাভাপতি দেখিয়ে শুরার কথিত মিটিং দেখিয়ে মাওলানা সলিমুল্লা সাহেবকে মুহতামিম দেখিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সুতরাং এ অসাংবিধানিক ও কল্পিত শুরার অজুহাত দেখিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি রোধ করার জন আমি আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।

প্রথমে শূরা হয়েছে দাবি করলেও হাসপাতাল থেকে ফিরে আল্লামা আহমদ শফী সাহেব নাকে-মুখে রাইস টিউব অবস্থায় বারবার এডিট করা একটি ৪২ সেকেন্ডের ভিডিও বার্তা দেয়। তাতে মাওলানা সেলিমুল্লাহকে এককভাবে মুহতামিম ঘোষণা করে। অথচ কোনো মাদরাসার মুহতামিম এককভাবে নিয়োগ করতে পারে না। এটা কওমী মাদরাসার বিধির খেলাফ। ভিডিও থেকে আমরা বুঝতে পারি, কথিত শূরা বিষয়ে হুজুর কিছুই জানেন না। জানলে নিশ্চয়ই সেটা উল্লেখ করতেন।

হুজুরের ভিডিওর কয়েকদিন পর হুজুরের নামে আদেশনামা নামক একটি চিঠি প্রাপ্ত হই আমি। চিঠিতে তিনি আমাকে তার আদেশ অবৈধ বে-আইনী হলেও মেনে নেবার আদেশ দেন৷ আমি সেটি প্রত্যুত্তরে বেশকিছু আবেদন ও প্রশ্ন রেখে বিভিন্ন মাধ্যমে হুজুরের কাছে সেটি পৌঁছালেও কোনো জবাব মেলেনি।

আমি একজন ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হিসেবে নিয়মমাফিক দায়িত্ব হস্তান্তর করে সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা আমার দায়িত্ব ও আমানত। আমি সে চেষ্টার ত্রুটি করিনি। বারবার বলেছি, ওয়াকফনামা ভিত্তিক শূরার আয়োজন করে শূরা যাকেই খুশি মনোনীত করে আমরা তাকে সাদরে মেনে নেবো। এর জন্য শূরার মুরুব্বিগণ থেকে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কাওকে বাদ রাখিনি। কিন্তু কোনোভাবে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে মাওলানা সেলিমুল্লাহ আমার অফিস থেকে আমার অনুপস্থিতিতে পেছনের দরজা ভেঙে মাল-সামানা চুরি করে নিয়ে যায়। আমাকে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। আমি এসবের পরোয়া না করে শূরা বৈঠকের অপেক্ষা করি।

আমি কোথাও নিজে মুহতামিম হবার আকাঙ্খা পেশ করিনি। একটি গ্রহণযোগ্য শূরার দাবি করেছি। তারপরও সেটি সম্ভব না হওয়ায় অবশেষে দীর্ঘ আড়াই মাস অপেক্ষা করে অপারগ হয়ে মুরুব্বিগণ এবং মাদরাসার মুহিব্বীনদের পরামর্শে মহামান্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।

যেহেতু শূরার সংশ্লিষ্ট ব্যাপার তাই শূরার সকল সদস্যকে বিবাদী করা হয়েছে। এতে অনেক মুরুব্বি, আত্মীয় স্বজনও আছেন। আদালতের নিয়মমতে এ ছাড়া উপায় ছিল না। আদালতের বিষয় আদালতী তারিকায় সমাধান হবে এটাই প্রত্যাশা রাখি। একটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার জন্য এ ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিলো না। এটা প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার। তদুপরি এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার। আমার ব্যক্তিগত কিছু নয়।

মামলা প্রত্যাহার করতে আমাকে হুমকি-ধমকিসহ বিভিন্নভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা চলছে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে আমি এসবের পরোয়া করতে পারি না। মুরুব্বিদের পরামর্শে মুরিব্বিদের প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা আমার দ্বীনি ফরিযা। এটা পালনে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবো। ইন-শা আল্লাহ আমার সাথে মহান আল্লাহ এবং মাদরাসার হিতাকাংখীরা আছেন।

আদালতের বিষয়টা আদালতের তারিকায় সমাধান করার চেষ্টা করাই যৌক্তিক পন্থা। অসাধু ও দুর্বৃত্তের মতো হুমকি-ধমকি দিয়ে এসব ঠেকানোর চেষ্টা করা অন্তত আলিমদের লেবাস পরা লোকদের শোভা পায় না।

ইহা একটি সিভিল সোর্ট তথা দেওয়ানি এবং প্রাতিষ্ঠানিক মামলা। এ জাতীয় মামলায় যাদের কে বিবাদী করা হয় তাদের অসম্মানের কিছুই নেই। প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রী বা উচ্চ পর্যায়ের সরকারি আমলাকে বিবাদি করে প্রতিদিন শত শত মামলা হাইকোর্টে দায়ের হচ্ছে।

তথুপরি যেখান থেকে আমরা কওমী সমাজ ন্যায় বিচারের আশাবাদি ছিলাম আজ সেখান থেকে যখন অবিচার করা হচ্ছে সুতরাং নাগরিক অধিকার হিসেবে আমি মাননীয় আদালতের শরণাপন্ন হলাম।

অতঃপর মহামান্য আদালত যদি আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে আমি সেটা মাথা পেতে মেনে নেবো। কিন্তু হুমকি-ধমকি দিয়ে এর কোনো আইনি সমাধান হবে না।