আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা বিদায় নিলে তালেবানরা কি ক্ষমতা পাবে?

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মাহবুব শাহীন


আমেরিকা এবং তাদের মিত্ররা আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে একটা চরম বিপর্যয়ে গিয়ে পৌঁছেছে। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে তরিগরি করেই পদক্ষেপ নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। চরম ব্যায়বহুল ও পরাজিত এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মার্কিন ও ন্যাটো সেনাদেরকে ফিরিয়ে আনতে চান তিনি। সব কিছু মিলে আফগানিস্তান কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে?

ভিয়েতনামে ছয় বছর যুদ্ধ করার পর ১৯৬৯ সালে আমেরিকা যে অবস্থানে ছিল, এখন তারা সেই অবস্থানেও নেই। কিংবা আশির দশকে আফগানিস্তানে যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন যেখানে ছিল, আমেরিকা এখন সেখানেও নেই। আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সামরিক শক্তি সরিয়ে নিতে চায়, কিন্তু মুখ রক্ষার জন্য কিছু একটা করতে চায় তারা।

মার্কিন ও তাদের মিত্রদের সেনা প্রত্যাহারের জন্য ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা তালেবানদের সাথে চুক্তি করেছে। আফগানিস্তানের যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমাধান আনার জন্য এই চুক্তিকে তারা অনেক বড় কিছু বলে প্রচারণাও চালাচ্ছে। শান্তি অর্জনের ক্ষেত্রে তালেবানদের অংশীদারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কোন অনীহা দেখাননি ট্রাম্প।

আফগানিস্তানে অবস্থানকারী সর্বশেষ ১৪,০০০ সেনার মধ্যে ৫,৩০০ সেনাকে আমেরিকা এরই মধ্যে নিজ দেশে নিয়ে গেছে। নভেম্বরের মধ্যে বাকি সেনাদের নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন ট্রাম্প। এদিকে মার্কিন বিশেষ দূত জালমাই খলিলজাদ তার কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। খলিলজাদের লক্ষ্য হলো তালেবান এবং কাবুলে মার্কিন মদদপুষ্ট সরকারসহ আফগানিস্তানের অন্যান্য পক্ষগুলোকে একটা রাজনৈতিক সমাধানে আসার জন্য উৎসাহিত করা।

তবে, অনেকগুলো কারণ রয়েছে, যেগুলোর কারণে আমেরিকার মদদপুষ্ট আফগান সরকারের জন্য টিকে থাকার সম্ভাবনাটা খুবই ক্ষীণ। তালেবানের সাথে আমেরিকার চুক্তিতে অস্ত্রবিরতির কথা উল্লেখ নেই। তাছাড়া তালেবানরা অন্যান্য পক্ষের সব দাবিকে মাথা নত করে মেনে নিবে – এমন শর্তও নেই চুক্তিতে।

চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা ও তালেবানরা একে অন্যের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করেছে কিন্তু মার্কিন মদদপুষ্ট আফগান ন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্সের বিরুদ্ধে তালেবানদের অভিযান বন্ধ হয়নি। চুক্তি যেহেতু হয়ে গেছে, তাই ঘানি সরকারের হামলার পরে তালেবানরা তাদের অভিযানের মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। ফলে পরবর্তী মাসগুলোতে সামরিক মৃত্যু হয়েছে অনেক বেশি। যদিও অনেকের প্রাণহানির জন্য আফগান ও তাদের মিত্র বাহিনীরও দায় রয়েছে।

তালেবানরা আফগানিস্তানের একমাত্র সশস্ত্র সংগঠন নয়। অন্যান্য গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে আল কায়েদা। আল কায়েদার সাথে তালেবানদের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা যায়। আমেরিকা যদি আশা করে থাকে যে, তালেবানরা আল কায়েদা, বা এমনকি নিজেদের কিছু বিচ্ছিন্ন গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তাহলে সেটা হবে একটা বিরাট ভুল।

মার্কিন মদদপুষ্ট কাবুল সরকার খুবই দুর্বল। দেশটির সামান্য জায়গায় তাদের বিচরণ। আফগানকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মতো তাদের শক্তি বা সক্ষমতা নেই।

২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মার্কিন মদদপুষ্ট প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। ৩৭ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশে নির্বাচনে ভোট পড়েছে মাত্র এক মিলিয়ন এবং নির্বাচনের ফল নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তার প্রধান প্রতিপক্ষ আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ এবং আরও পাঁচজন প্রার্থী তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।

ওয়াশিংটনের শক্ত হস্তক্ষেপের পর পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হয়েছে। ঘানি প্রেসিডেন্ট পদে বহাল আছেন এবং আব্দুল্লাহকে নতুন গঠিত হাই কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল রিকন্সিলিয়েশানের চেয়ারম্যান করা হয়েছে, যেটা সরকারের নির্বাহী কাঠামোর বাইরে থাকবে।

আফগানিস্তানের পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, এখানে স্থায়ী ও টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে গেলে আমেরিকাকে নাজেহাল হতে হবে। সম্মানজনকভাবে প্রস্থান করতে চাইলে আমেরিকাকে দ্রুতই আফগান ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। কোনো বৈদেশিক মদদে আফগানের সরকার ব্যবস্থা জনগণের জন্য সুখকর হবেনা। একটা স্থিতিশীল আফগানিস্তানের জন্য আফগান জাতিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ও দ্য স্ট্র্যাটেজিস্ট