আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পর্যালোচনা

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক


সম্প্রতি দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মুহাদ্দিস ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সংগ্রামী মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত দু’টি গুরুতর অভিযোগ নিয়ে দেশে বিস্তর আলোচনা চলছে। অভিযোগ দু’টি হলো: এক, ২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকার মতিঝিলে সংঘটিত শাপলা হত্যাকাণ্ডের দায় এবং দুই, জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্টতা। স্মরণে থাকা দরকার, বর্ণিত অভিযোগ নিছক সাদামাটা অভিযোগ নয়।এর সাথে সম্পৃক্ত আছে, রাজনীতি, রাষ্ট্রশক্তির প্রভাব ও হাটহাজারী মাদরাসার অভ্যন্তরে বিকাশমান শোকরানাপন্থী আধিপত্যবাদী শক্তির কূটনীতি। যা হোক, আমরা এখানে আজ কেবল বর্ণিত অভিযোগ সম্পর্কে পর্যালোচনা করবো। তার আগে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, অভিযোগ করতে দলীলের প্রয়োজন পড়ে না, অভিযোগের জবাব দিতে দলীলের প্রয়োজন হয়, বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। তা’হলে খতিয়ে দেখা যাক আল্লামা বাবুনগরীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগদ্বয়।

এক: সম্প্রতি (১৭ জুন ২০২০, বুধবার) হাটহাজারী মাদরাসার অনুষ্ঠিত শুরার অধিবেশনে মাদারসার পরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের পক্ষ থেকে শুরার অন্যতম সদস্য মাওলানা নুরুল আমীন সাহেব হযরত বাবুনগরীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু লিখিত অভিযোগ পড়ে শোনান—যার মধ্যে একটি গুরুতর অভিযোগ ছিলো, শাপলা হত্যাকাণ্ডের জন্য বাবুনগরীর দায়। সবাই স্বীকার করবেন, প্রতিটি বিষয়ের নির্ধারিত একটি স্থান থাকে। যেমন, কিতাবের স্থান টেবিল, আলমিরা; কলমের স্থান কলমদানি; শোয়া-বসার স্থান বিছানা-পাটি; দরসের স্থান মাদরাসা-মসজিদ ইত্যাদি। এখানে প্রথম প্রশ্ন হলো: মাদরাসার শুরা হলো মাদরাসাসংশ্লিষ্ট বিবিধ বিষয়ের আলোচনার শীর্ষ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ফোরাম। যদিও হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালক মুহতারাম মাওলানা আহমদ শফী সাহেব হেফাজতে ইসলামের আমীর এবং মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের মহাসচিব, তাই বলে মাদরাসার শুরায় হেফাজত নিয়ে কোন আলোচনা হওয়া যে কোন নিয়মের পাল্লাতেই বোধগম্য নয়। ধরুন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে। সেখানে কি সরকার-প্রধান তাঁর আওয়ামী লীগের সদস্যদের অভিযোগ নিয়ে শুনানী করবেন? সেটা কি গ্রহণযোগ্য হবে? তাই যদি না হবে, তবে বলুন, হাটহাজারী মাদরাসার মতো একটি বৃহৎ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শুরার অধিবেশনে মাদরাসাসংশ্লিষ্ট নয় এমন সংগঠনের সাংগঠনিক কথাবার্তা কীভাবে সম্ভব? এটাই বা কতোটুকু আইনসম্মত? যেখানে ইসলামী শরীয়ার ইন্তিযাম বা ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়, সেখানে এমন অব্যবস্থাপনার কী ব্যাখ্যা হতে পারে? এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, শুরার অধিবেশনে হেফাজতের মহাসচিব পরিবর্তনের প্রস্তাব। আমরা জানি না, প্রস্তাবগুলো কে বা কারা রচনা করেছেন, কারাই বা সেগুলো শুরার অধিবেশনে উত্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। তবে সামগ্রিক দৃশ্য: যা বিভিন্নভাবে প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে বলা যায়, এর পেছনে কলকাঠিনাড়া ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ আইনের নীতিগত পদ্ধতি অনুসরণের চেয়ে যেনতেন উপায়ে অভিযোগ আনার দিকেই বেশি মনোনিবেশ করেছিলেন বা তারা আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। হেফাজতের বিষয় হেফাজতের সাংগঠনিক ধারায় উপস্থাপিত হওয়া উচিৎ–শুরার অধিকাংশ সদস্যদের এমন মতামত নিঃসন্দেহে যুক্তিপূর্ণ। যেভাবেই হোক, এ ধরনের প্রচেষ্টাকে সামগ্রিকভাবে পদ্ধতিবিরুদ্ধ, অবৈধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।

শাপলা হত্যাকাণ্ডে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর দায় কতোটুকু, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। আমি জানি, জনাব বাবুনগরীর কাছে শাপলার অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এমনসব তথ্য রয়েছে যা ফাঁস হলে অনেক বড়বড় রুই-কাতলারা জালে আটকে যাবেন। তাঁকে একান্তই বাধ্য করা হলে আসল কারিগররা যে কতোটা নিজেদের বিপদ ডেকে আনবেন তা সময়েই বলে দেবে। এখানে কতোগুলো বিষয় বিচার্য:

ক) অবরোধ থেকে আকস্মিকভাবে শাপল-চত্বরে প্রবেশের ঘটনা কীভাবে ঘটলো?

খ) যেখানে বাংলাদেশের কোন বৃহৎ রাজনৈতিক দলও মতিঝিল দূরে থাক, ঢাকার আশেপাশেও সমাবেশ করার অনুমতি পায়নি, সেখানে হেফাজত কেমন করে ঘণ্টাখানিকের মধ্যে শাপলা-চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি পেয়ে গেলো?

গ) ৫ই মে’র রাত্রে আমীরে হেফাজতকে শাপলায় এনে সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণার চেষ্টা ভণ্ডুল করেছিলো কারা?

ঘ) শাপলায় আসলে অনেক আলিম-উলামা ও সাধারণ সমর্থক শহীদ হয়েছিলেন কি না।

ঙ) পূর্ব-সিদ্ধান্তের বাইরে শাপলায় রাত্রি যাপন করাতে গোপনে ষড়যন্ত্র করেছিলো কারা?

চ) ৫ই মে শাপলা-চত্বরের মঞ্চ থেকে ক্ষমতা পরিবর্তনের হুমকি দিয়ে উগ্র ও উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়েছিলো কারা?

ছ) ৫ই মে’র হত্যাকাণ্ডের পর হাজার-হাজার হেফাজত কর্মী ও সমর্থককে অরক্ষিত রেখে পালিয়ে গিয়েছিলো কারা?

উপরোক্ত সাত বিষয়ের রহস্য ভেদ করা গেলে উঠে আসবে শাপলার দায় আসলে কার বা কাদের উপর বর্তাবে। আমার আশ্চর্য লাগে, এতো বড়ো একটি ঘটনা ঘটার পরও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেদিন কোন তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদেরকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেনি। এখন যারা মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে শাপলার জন্য দায়ী করছেন তাদের কাছে প্রশ্ন: উপরের বিচার্য বিষয়গুলোর সাথে হযরত বাবুনগরীর সম্পৃক্ততা কতো শতাংশ? তাহলেই উত্তরটা সহজে বের হয়ে আসবে। ভাবতে হয়, কতো অকৃতজ্ঞ আমরা। যিনি শাপলার হত্যাকাণ্ডের শিকার আহত-নিহতদের, দিকভ্রান্ত অসহায়দের ফেলে পালিয়ে আসেননি; নিজের জীবনটুকুও মরণের প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন; রিমান্ডে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন; রাষ্ট্রশক্তির শত প্রলোভনেও যাঁর মস্তক নত হয়নি—সেই তাঁকেই কিনা শাপলার আহত-নিহতদের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে! ধিক্ আমাদের মানবতাবোধ!

এবার আসুন, এ বিষয়ে আমীরে হেফাজতের সরাসরি বক্তব্য শোনা যাক। পাঠকমাত্রই জানেন, ৬ই মে রাতে আল্লামা আহমদ শফী তাঁর ছেলে মাওলানা আনাস মাদানী ও খাদেমসহ সরকারের দেয়া ৭টি বিমানের টিকেটের মধ্যে চারটি ফেরৎ দিয়ে তিনটি বিমানের টিকেট নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে চলে আসেন। আসার কিছুদিন পর তিনি ‘দ্বিতীয় আলো’ নামে একটি চ্যানেলকে ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সেখানে তিনি যা বলেন তা হুবহু এমন— “……..তো আমাদের উপর যে আক্রমণ কইরছে রাত্রে, পৃথিবী হইছে হইতে বোধ হয় এই ধরনের আক্রমণ, ঘুমন্ত অবস্থায়; জিকির-আযকার কইত্তেছে অবস্থায়, তাদের উপর আক্রমণ হয়েছে, আপনারা জানেন। নাস্তিকবাদীরা চাইর-পাঁচ মাস পর্যন্ত, তিন-চার মাস পর্যন্ত উলঙ্গ-উলঙ্গ হইয়া মহিলা-পুরুষ, এইভাবে রাস্তার উপর, রাস্তা দখল করে যে কাজ করেছে, সবাই জানেন, তাদেরকে গুলি করা হয় নাই; কয়েক মাস পর্যন্ত–কিন্তু আমাদেরকে দুই ঘণ্টা-তিন ঘণ্টার; আমি ফজরে যাইয়া বলি দিতাম: যাও, এখন তোমরা নিজ-নিজ স্বগ্রামে চলি যাও। এ দুই-তিন ঘণ্টার সময় আমাদেরকে দেয় নাই। এই ধরনের হামলা, বর্বরতা আমাদের উপর করা হয়েছে। আল্লাহর শোকর আমরা না-কাম (ব্যর্থ) না। নবী আ.-এর সামনে সত্তর জন সাহাবাকে; বড়বড় সাহাবা; হুজুরের চাচাও ছিল–হামযা, তাঁদেরকে হত্যা করেছে কাফেরেরা। তারপর বিজয় লাভ করেছে। আমাদেরও এইটা ঐ ধরনের, ইনশা আল্লাহ ইসলাম যিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কে বাদ। সেই জন্য আমি দোয়া কইত্তেছি, আপনাদের জন্য, প্রবাসীদের জন্য দোয়া কইত্তেছি। আর যাঁরা শহীদ হইয়া গেছে, তাঁদের জন্য, তাঁদের আব্বা-আম্মাদের জন্য দোয়া কইত্তেছি। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের শাহাদাতকে কবুল করেন; এই প্রবাসীরা: যারা নাকি আইজকে এদের জন্য জানমাল কোরবান কইত্তেছে, তাঁদের জন্য ইনশা আল্লাহ দোয়া কইত্তেছি। আশা করি আপনারা সামনে এ ধরনের ডাক যদি শোনেন, দ্বীনের ডাক যদি শোনেন, ঈমানের ডাক, তাহলে আপনারা আগের চেয়েও বেশি ঝাঁপাইয়া পড়বেন। আমার কাছে পইত্তেক দিন পাঁচ গাড়ি-সাত গাড়ি-এক গাড়ি শুধু মানুষ আইসতেছে; মানুষ আইসতেছে; মানুষ আইসতেছে: হুযুর কর্মসূচী দেন, হুযুর কর্মসূচী দেন! এক জন মানুষ: তাঁর ছেলে শহীদ হইছে, এখানে দাঁড়াইয়া বইলতেছে: হুযুর আমার কাছে যদি আরও কয়েকটা ছেলে থাইক তো, এরা যদি শহীদ হইত, আমি আল্লাহর শোকর আদায় কইত্তাম। আল্লাহ আমার ছেলেকে কবূল কইরছে, আমি এক জন শহীদের বাপ হইছি। সেই জন্য ভায়েরা, হাদীসের মধ্যে আছে: যারা শহীদ হবে তাঁরা এমন কষ্ট পাবে যেমন একটা পিঁপড়া তাদেরকে কষ্ট দেয়, কামড়াইতেছে–ঐ ধরনের কষ্ট পাবে……………………………”

এবার বলুন, শাপলার দায় আমীরে হেফাজত কাদের উপর চাপিয়েছেন? এখন ওনার পক্ষ থেকে যদি আবার মাদরাসার শুরায় মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর উপর শাপলার দায় চাপানোর চেষ্টা চালানো হয়, তবে কোন বিচারের মানদণ্ডে রায় দেয়া উচিৎ–সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার পাঠকদের।

এরপর আসে, ২০১৮ সালের ৪ঠা নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিকর্কিত ও প্রবলভাবে সমালোচিত শোকরানা মাহফিলের কথা। নিন্দিত বেশ কিছু বিষয়ের সাথে উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন সামরিক সচিব প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের বিতর্কিত মন্তব্য: সেদিন শাপলায় কোন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি; যা হয়েছে তা অপপ্রচার। সেদিন তো মঞ্চে আমীরে হেফাজত মাওলানা আহমদ শফী সাহেবসহ বেশ কয়েকজন বরেণ্য কওমী আলিম উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তো সামরিক সচিবের এমন জঘন্য মিথ্যাচারের কোন প্রতিবাদ করেননি। এ নীরবতা প্রমাণ করে: মঞ্চে উপস্থিত কওমী আলিমরা স্বীকার করেন, ২০১৩ সালের ৫ই মে রাতে শাপলা-চত্বরে কোন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি; যা শোনা গেছে—সব অপপ্রচার মাত্র। অথচ শাপলা পরবর্তীকালে আমরা দেখি: আল্লামা আহমদ শফী সাহেব ‘শাপলা গণহত্যা’র বিচার চেয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন করতে হয়, যেখানে কেউ হতাহত হয়নি সেখানে আবার শাপলার হত্যাকাণ্ডের দায় হযরত বাবুনগরীর উপর আসে কেমন করে? বিষয়গুলো কি পরস্পর বিরোধী নয়?

দুই: এবার আসুন, মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে জামায়াতসংশ্লিষ্টতা নিয়ে আহমদ শফী সাহেবের পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীর অভিযোগ নিয়ে। ফাঁস হওয়া এক অডিও রেকর্ড থেকে মূলত এ অভিযোগ সামনে আসে। সেখানে মাওলানা আনাস মাদানীকে স্পষ্ট বলতে শোনা যায়, বাবুনগরী জামায়াতের সাথে মিলে কাজ করছেন। এরপর থেকে কওমী প্রাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মাওলানা আনাস মাদানীর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কেউকেউ মনে করতে পারেন, অভিযোগটির পেছনে আনাস সাহেবের ব্যক্তিগত ধারণা কাজ করেছে। আসলে তা নয়। লক্ষ করবেন, বর্তমান রাষ্ট্রশক্তির আমলে বিরোধীদের ঘায়েল করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার হলো—জামায়াতের তকমা লাগিয়ে দেয়া। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত এ তকমা থেকে রেহাই পাননি। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ সে দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রশক্তি এতে জড়িত বলে আন্দাজ করা যায়। কারণ, সবাই জানেন, জনাব বাবুনগরী পোষ না মানা এক মর্দে মুজাহিদ আলিমে দ্বীন। সন্দেহ নেই, তাঁর এ আপোষহীন নীতির কারণে পোষমানা শ্রেণীটি যথেষ্ট সমস্যায় পড়েছে; পড়েছে মাখনে ভাগ না পাবার আশঙ্কায়। যেহেতু এরা রাষ্ট্রশক্তির পদলেহী শ্রেণী তাই রাষ্ট্রশক্তিও তাদের স্বার্থরক্ষায় পোষ না মানা মানুষগুলোকে জব্দ করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। এখানেও ঘটেছে সেই কিস্সা। স্বীকৃতি আনতে যেখানে শোকরানাপন্থীদেরকে গণভবনে ধর্ণা দিতে হয়, শোকরানার নামে সংবর্ধনা দিতে হয় এবং ‘কওমী জননী’র মতো অবমাননাকর উপাধির আশ্রয় নিতে হয়, সেখানে সরকারের সচিব বাবুনগরীর কামরায় এসে পাসপোর্ট ফেরৎ দিয়ে পোষ না মানা মানুষটির কাছে নতস্বীকার করতে জাতি দেখে, তখন কি আর গৃহপালিত শ্রেণীটির ঘুম আসে? অতএব, আপোষহীন এ মানুষটিকে বাগে আনতে বা জব্দ করতে জামায়াতের তকমা লাগিয়ে দেয়ার চেয়ে মোক্ষম দাওয়াই আর কী হতে পারে? মাওলানা আনাস মাদানীর এ অভিযোগ একান্তই তার নয়, এর পেছনে আছে রাষ্ট্রশক্তির গোপন হাওয়া। আমরা আশির দশক থেকে দেখে আসছি, মাওলানা মওদূদী সাহেবের আকীদা আর রাজনীতির বিরুদ্ধে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর অদম্য সংগ্রাম: বক্তৃতায়, মুনাযারার আয়োজন করে, দরসে—সবখানেই মওদূদী সাহেবের চিন্তা-চেতনা, যা সর্বস্বীকৃত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহর নীতির পরিপিন্থী, সে-সবের বিরুদ্ধে তিনি মুখে ও কলমে জিহাদ করেছেন, আজও করে চলেছেন। আর সেই বাবুনগরী হযরতকেই দেয়া হলো জামায়াতসংশ্লিষ্টতার তকমা। বাহ, কী চমৎকার! প্রতিশোধের না জানি আরও কতো যে ধরন আছে। আমার মনে হয়, আইনের স্বার্থে হযরত বাবুনগরীর উচিৎ হবে, আনাস মাদানীর বরাবরে একটি উকিল নোটিস জারি করা। এটা ভবিষ্যতে কাজে আসবে।

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর আরেক অপরাধ হলো, তিনি শাপলার গোপন ভাগ-ভাটোয়ারায় শরীক হননি এবং শাপলা পরবর্তী কোন প্রকার “কুচ ল্যাকে আও তো কুচ ল্যাকে যাও”ধর্মী লেনদেনে জড়িয়েও পড়েননি। এখন তো আর কে কোথায় কতো টাকা গুনেছে, কতো টাকা পকেটস্থ করেছে—সে খবর অজানা নয়। লালখান বাজার মাদরাসার পরিচালক মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী তো এক বৈঠকে বলেই দিয়েছেন: ৫ ই মে জোহরের পর ঢাকার দিগন্ত টেলিভিশন অফিসে তিন ব্যক্তি টাকার বস্তা নিয়ে মাশগুল ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে নামগুলো জেনে নেয়া যেতে পারে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ফটিকছড়িতেও এমন একজন আছেন, যিনি আনাস মাদানীর ঘনিষ্ট বলে খ্যাত–হযরত বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন, শাপলার ভাগ পেয়েছেন ১৫ লক্ষ টাকা এক কিস্তিতে। বাকি কিস্তিগুলোর কথা আল্লাহ মালুম। আসলে হযরত বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উক্ত অভিযোগ এনে আনাস সাহেবরা কিন্তু জামায়াতকেই শক্তি যোগাচ্ছেন। কারণ, অনেকেই ভাবতে পারেন, এমন আপোষহীন মর্দে মুজাহিদ যদি জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট হন তবে তো জামায়াতই সত্যপন্থী। এখন বলুন, লাভটা হলো কার?

পরিশেষে বলবো, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বের চেয়ে রাজনৈতিক গুরুত্বটাই মূখ্য। সরকার কিন্তু বিলক্ষণ জানে, হযরত বাবুনগরী জামায়াত থেকে কতো যোজন-যোজন দূরে। কিন্তু তাঁকে তো দমাতে হবে, না হয় আপোষের দড়িতে বাঁধতে হবে। তাই, এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ। কওমী ছাত্রদেরকে সজাগ থাকতে হবে যেন পেছনের দরোজা দিয়ে এমন করে শত্রুশক্তি আমাদের আপোষহীন নেতৃবৃন্দকে কলঙ্কিত করবার দুঃসাহস দেখাতে না পারে। মনে রাখতে হবে, সাপের বিষদাঁত প্রথম দিনেই ভেঙ্গে দিতে না পারলে সেই সাপ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহু হা-ফিয।

About |

Check Also

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও টেন মিনিট স্কুল

মারজান চৌধুরী | নির্বাহী সম্পাদক : ইনসাফ