পাকিস্তান-বাংলাদেশ পুনর্মিলন?

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা সম্প্রতি টেলিফোনে কথা বলেছেন। দুই দেশের মধ্যে বিরল এই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ফলে তাদের হিমশীতল সম্পর্কে বরফ গলবে বলে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে প্রকাশিত সরকারি হ্যান্ডআউটে বলা হয়েছে যে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান। আপাত দৃষ্টিতে দুই নেতার মতবিনিময় সাধারণ ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ২০০৯ সাল থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক অব্যাহতভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছি। ফলে এই টেলিফোন সংলাপ দৃশ্যমানের চেয়ে অনেক বেশি ঘটনা।

অনেক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উত্তেজনাকর রয়েছে। দুই দেশ এখনো ১৯৭১ সালের তিক্ত স্মৃতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারেনি।

কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকার ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের জন্য বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার বিচার ও ফাঁসি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি ঘটে।

দুই দেশের সম্পর্ক আরো অবনতি ঘটে ২০১৬ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিচারের নিন্দা জানিয়ে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাসে।

এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশ সরকার ২০ মাস ধরে পাকিস্তান হাই কমিশনারের নিয়োগ অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদ ঢাকায় হাই কমিশনার হিসেবে ইমরান আহম্মদ সিদ্দিকীকে নিয়োগ করার নতুন প্রস্তাব দেয়। তার নাম গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন করেন। জানুয়ারিতে সিদ্দিকী ঢাকায় পাকিস্তানি মিশনে যোগদানের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলার আশাবাদের সৃষ্টি হয়।

সিদ্দিকী এরপর থেকে বাংলাদেশের সাথে গোলযোগপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃগঠনে নীরবে কাজ করতে থাকেন। ১ জুলাই তিনি ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। উভয় পক্ষ এই বৈঠককে সৌজন্য সাক্ষাতকার হিসেবে অভিহিত করলেও বাস্তবে তা এর চেয়ে অনেক বড় কিছু ছিল।

ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে পাকিস্তানি দূতের বৈঠক সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়। এতে দাবি করা হয়, ভারতের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের সুযোগটি গ্রহণ করছে ইসলামাবাদ।

নয়া দিল্লী ও ঢাকার সাথে অনেক সমস্যা আছে এবং ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর তা আরো বাড়ে। বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিপুল প্রভাব রয়েছে এবং পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের অবিশ্বাসের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে ভারত।

মোদি সরকার গত বছর বিতর্কিত মুসলিম বিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাস করলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। আইনটির ফলে বাংলাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই চীন অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ঢাকা ইতোমধ্যেই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হয়েছে। এই সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে চীন ও ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনায় নীরব ছিল।


পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে তাদের সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করার ভালো সুযোগ দেবে। তবে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোন সংযোগ তাদের সম্পর্কে বিরাজমান অনেক জটিলতার মধ্যে সামান্য পদক্ষেপ মাত্র।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ও এক্সপ্রেস ট্রিবিউন