পাটের মতো চামড়া শিল্পকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ : রিজভী

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার গত বছরের মতো আওয়ামী লীগের চামড়া সিন্ডিকেটের স্বার্থরক্ষায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, নানা অজুহাতে এ বছর চামড়ার দাম কমানো হয়েছে গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ। এ বছর ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম হবে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর ২৮ থেকে ৩২ টাকা। গতবছর ঢাকায় এই দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে গতবছর গরুর চামড়ার দাম ছিল ৩৫-৪০ টাকা, যা এবারে প্রায় ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টন থেকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব অভিযোগ করেন।

রিজভী বলেন, ছাগলের চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩-১৫ টাকা। গতবছর এই দাম ছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা। গতবছরের তুলনায় ছাগলের চামড়ার দাম কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। গতবছর কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি না করে লক্ষাধিক পিস চামড়া ধ্বংস করেছিলেন অনেকে। যার বেশিরভাগ মাটিচাপা কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। চামড়ার মূল্য না থাকায় স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে দেশের চামড়ার বাজার। দামে ধস নামায় প্রায় হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। পাশাপাশি এই টাকা থেকে বঞ্চিত হয় গরিব ও এতিম জনগোষ্ঠী।

তিনি বলেন, করোনার কারণে চামড়া নিয়ে এবারো সেই সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। লুটপাটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোতে চরম অর্থ সংকট চলছে। এ কারণে এবারও ট্যানারি মালিকরা ব্যাংক থেকে কোনো টাকা পাবে কি না, শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যেভাবে পাট শিল্প ধ্বংস করা হয়েছে, ঠিক সেই পথেই ধ্বংস করা হচ্ছে বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্প। চামড়া শিল্প ধ্বংস হলে গরিব, দুঃখী ও এতিমদের হক নষ্ট হয়। সরকারের ভেতরের একটি মহল সিন্ডিকেট করে কওমি মাদ্রাসা এবং চামড়া শিল্পকে ধ্বংস করে নিজেরা ফায়দা লুটতে চায়।

বক্তব্যের শুরুতেই রিজভী শনিবার পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনার সঙ্গে ভয়াবহ বন্যার কারণে দিশেহারা দেশের ৩১টি জেলার অর্ধকোটির বেশি মানুষ। ঘরে ঘরে নিরন্ন অভুক্ত মানুষের হাহাকার। বানভাসি মানুষের ঘরে নেই ঈদের আনন্দ। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে বানভাসিদের ঈদ। করোনার কষাঘাত আর সর্বগ্রাসী বন্যার করাল গ্রাসে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে মানুষকে। বানভাসিদের ঈদের আনন্দ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। করোনা এবং বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষকে বাঁচাতে সরকারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বলে মন্তব্য করেন এই বিএনপি নেতা।

রিজভী বলেন, সরকারের মন্ত্রী-নেতারা করোনা মোকাবেলার মতো বন্যা মোকাবেলায় ‘কথা মালার’ মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন। বাংলাদেশের সরকার মিথ্যা চেঁচামেচির মডেল। জনগণের এই চরম দুর্দিনেও সরকার চরমভাবে ব্যর্থ। তাদের সফলতা শুধু মিথ্যাচারে। করোনার ভয়াবহ থাবা আর বন্যায় পানিবন্দি দুর্গত অসহায় মানুষের হাহাকার ও কান্না শোনার কেউ নেই। আজ বানের পানিতে একাকার লাখো মানুষের চোখের পানি। করোনা ও বন্যায় মৃত্যু আর নিরন্ন মানুষের মিছিলে সরকারের তথাকথিত উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়েছে। অধিকাংশেরই ঘরে খাবার নেই, হাতে নগদ টাকা নেই, কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই, অনেকেই আশ্রয়হীন হয়ে স্থানীয় স্কুল-কলেজে, পানির ভেতর নাক উঁচিয়ে থাকা রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়েছে। হাঁস-মুরগি আর গবাদি পশু নিয়ে তারা পড়েছেন মহাবিপদে।

তিনি বলেন, এবারকার বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে কৃষকের ফসলহানি, সহায়সম্পত্তি সমূহ বিপদের ঝুঁকি ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্গত মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার ও জ্বালানির সংকটে ভুগছে। ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বানভাসি মানুষের কাছে এখনও কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। সরকারি ত্রাণ তৎপরতা এখনো অনেকটাই প্রচারসর্বস্ব ফাঁপা আওয়াজ। শাসকগোষ্ঠী একেবারেই উদাসীন।

রিজভী বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো চলমান বন্যার যে চাহিদা সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাতে দেখা গেছে, বন্যাকবলিত ৮০ শতাংশ মানুষের নিয়মিত খাবার পাচ্ছে না। খাদ্যদ্রব্য থাকলেও ৯৩ শতাংশ মানুষ তা রান্না করতে গিয়ে মহাসংকটের আবর্তে পড়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বন্যায় ৩১ জেলার ৫০ লাখ ৪৪ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে ১০ লাখ ৪০ হাজার পরিবার। সরকারের তথ্যবিবরণীতে দাবি করা হয়েছে, বন্যাকবলিত ৩১টি জেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে মানবিক সহায়তা হিসেবে এ পর্যন্ত সাত হাজার ১৪৭ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রমাণ মিলছে না। খবরের কাগজে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে বগুড়ার সারিয়াকান্দিসহ উত্তরাঞ্চলে বন্যাকবলিত মানুষের পাতে ভাতের বদলে শুধু পাট শাক। আক্ষরিক অর্থেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার অবিকল চিত্র আজ বন্যাকবলিত প্রতিটি জনপদেই দেখা যাচ্ছে- ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিঁদ মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?

তিনি বলেন, গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) পক্ষ থেকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে এ বছর চলমান বন্যা ১৯৮৮ সালের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।কিন্তু এই নিশুতি সরকার তা আজও কানে তোলেনি। তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই।

রিজভী বলেন, আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে মনে করি এই ভয়াবহ অবস্থা মোকাবেলা করা আওয়ামী লীগের ভঙ্গুর আর দুর্নীতিবাজ প্রশাসন দিয়ে সম্ভব না। এই জন্য প্রয়োজনে জাতীয়ভাবে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। একগুয়েমি বাদ দিয়ে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শেয়ার করুণ
  •