নিউ ইয়র্কে একজন প্যারামেডিকের ডায়েরি: 'এখন প্রতিদিনই ৯/১১ এর মতো'

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম । আন্তর্জাতিক ডেস্ক


যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে একজন প্যারামেডিক হিসেবে কাজ করেন অ্যান্থনি আলমোজেরা। সেকারণে প্রতিদিনই তাকে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যেতে হয়। ১৭ বছর ধরে আছেন এই পেশায় কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এখন যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেটা তিনি কখনো দেখেননি।
এই রাজ্যে যতো মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে সেটা পৃথিবীর যে কোনো দেশের আক্রান্তের সংখ্যার চাইতেও বেশি।
অ্যান্থনি এখন দিনে ১৬ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। কোভিড-নাইনটিন রোগীদের জীবন রক্ষার পাশাপাশি তিনি তার সহকর্মীদেরকেও সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন।
বিবিসির কাছে তিনি গত রবিবারের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, এই দিনটি ছিল তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন একটি দিন। রবিবারের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি যা বলেছেন:
আগের দিনের তুলনায় আমার বেশ ভালোই ঘুম হয়েছে। টানা পাঁচ ঘণ্টার ঘুম। ঘুম থেকে ওঠে গোসল করতে করতে খবরে শুনলাম যে কোভিড-নাইনটিন রোগীর সংখ্যা আরো বেড়েছে।
আমাকে ব্রুকলিনের সানসেট পার্কে সকাল ছটা থেকে কাজ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আজ আমি ১৬ ঘণ্টা কাজ করবো।
আমি ইউনিফর্ম পরে নিলাম। কাজের রেডিওটাও নিলাম সাথে। যেসব যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করি প্রথমে সেগুলো জীবাণুমুক্ত করতে শুরু করি। আমাদের কাছে যতো রেডিও, চাবি, ট্রাক, ব্যাগ এবং আরো যেসব সতকর্তামূলক পোশাক আছে সেগুলো ভালো করে মুছতে হয়। কারণ এই ভাইরাসটি সব জায়গাতেই বেঁচে থাকতে পারে। কোন কিছুই আর নিরাপদ নয়- এমনকি আমাদের সহকর্মীরাও।
যুদ্ধক্ষেত্রে বুলেট দেখা যায়, জানতে পারেন কে আপনার শত্রু। কিন্তু এই যুদ্ধ এক অদৃশ্য বুলেটের সাথে। যার সাথেই আপনি সংস্পর্শে আসছেন, সে-ই একটি বুলেট হয়ে আপনার জীবন কেড়ে নিতে পারে।
সকাল ৬টা বেজে ২ মিনিটে আমি কাজ শুরু করি। এর মধ্যে বেগেল শপ থেকে কিছু একটা খেয়ে নিলাম। সকাল সাতটার দিক থেকে রেডিওটা ব্যস্ত হয়ে গেল। মধ্যরাতের পর থেকে আমরা দেড় হাজারের মতো কল পেয়েছি। আমাকে একটা কাজ দেওয়া হলো- একজনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।
একজন লেফটেনেন্ট হিসেবে আমার কাজ হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসার জন্য মেডিক ও টেকনিশিয়ানদের সহযোগিতা করা এবং তাদের যেসব জিনিস প্রয়োজন সেগুলো সরবরাহ করা। কিন্তু আমাদের কাছে এখন তো আর বেশি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই কারণ বেশিরভাগ দিনই সাড়ে ছ’হাজারের মতো কল আসছে।
নিউ ইয়র্কের জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত। দিনে গড়ে চার হাজারের মতো কল আসে। হিটওয়েভের মতো খুব বেশি গরম পড়লে কিম্বা হারিকেন আঘাত হানলে এর চেয়ে বেশি কল পাওয়া যায়। এর আগে সবচেয়ে ব্যস্ত দিনটি ছিল ৯/১১। সেদিন আমরা ৬,৪০০ কল পেয়েছিলাম। কিন্তু তাদের সবাই তো আর রোগী ছিল না। কিন্তু এখন প্রতিদিনই ৯/১১ এর মতো কল আসছে।
আমরা দেখলাম সবচেয়ে বেশি কল এসেছে ২০শে মার্চ থেকে। ২২ তারিখের মধ্যে এটা যেন একটা বোমায় পরিণত হলো। কিন্তু এর জন্যে আমাদের সেবা ব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল না।
বর্তমানে এই জরুরি স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার ২০ শতাংশ লোকবল অসুস্থ থাকার কারণে কাজ করতে পারছে না। আমাদের অনেক সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকে আইসিইউতে আছেন। তাদের মধ্যে দু’জনকে ভেন্টিলেটর দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়াও সাতশোরও বেশি কর্মী আছেন করোনাভাইররাসের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় যাদেরকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
যার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তার বাড়িতে পৌঁছে আমি মাস্ক, গাউন ও গ্লাভস পরে নিলাম।
ওই লোকটির পরিবার থেকে বলা হলো যে গত পাঁচদিন ধরে তার জ্বর ও কাশি ছিল। তাকে সিপিআর দেওয়া শুরু হলো। তিনি যাতে নিঃশ্বাস নিতে পারেন সেজন্য চিকিৎসকরা তার গলার ভেতর দিয়ে একটি টিউব ঢুকিয়ে দিলেন। তার আইভি শুরু হয়ে গেল।
তাকে বাঁচানোর জন্যে আমরা আধ ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করলাম। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হলো। দলের সদস্যরা সবাই ঠিক আছে এটা নিশ্চিত করে ট্রাকে ফিরে আসার পর সবকিছু আবার জীবাণুমুক্ত করলাম।
এর ২০ মিনিট পর আরেকটি কল এলো। আরো একজনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। একই উপসর্গ, একই প্রক্রিয়া এবং একই ফল হলো। ভাইরাসটি ফুসফুসে আক্রমণ করে, ফলে শরীরের সিস্টেম চালু রাখার জন্য যথেষ্ট অক্সিজেন পাওয়া যায় না। তখন শরীর অচল হয়ে যেতে শুরু করে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ তখন আর কাজ করতে পারে না।


-বিবিসি বাংলা

Previous post চট্টগ্রামে পুলিশ কনস্টেবল করোনায় আক্রান্ত
Next post এবার ইউপি সদস্যের গুদামে পাওয়া গেছে লুকিয়ে রাখা ১৫৮ বস্তা সরকারি চাল