জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা পরিস্থিতিতে কাজ করছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় মার্চ মাসের শুরতেই ছাতক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো:গোলাম কবিরের আহ্বান সাড়া দিয়ে জাউয়া বাজার ইউনিয়নের ১৩ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রায় তিন মাস ধরে মাঠে কাজ করছেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনাদানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) দেওয়া হয়েছে।

করোনা পরিস্থিতিতির প্রেক্ষিতে দেশের সর্বত্র নানারকমের সংকট ঊদ্ভূত হয়। প্রথমত, নতুন ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। তদুপরি ছিল আগাম বন্যার আশঙ্কা। সেজন্য স্বেচ্ছাসেবকরা কৃষকদের ধান কেটে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতে সাহায্য করা। এলাকায় সামাজিক দূরত্ব, হোম কোয়ারেন্টিন ও লকডাউন নিশ্চিতকল্পে নিরলস কাজ করা। করোনা আক্রান্ত রোগীর ঘরে ঔষধ পৌছে দেওয়া, হাসপাতাল ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ, রোগীদের হাসপাতালে পাঠানো, করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফন কাজে অংশগ্রহণ ইত্যাদি। তাছাড়া নিয়মিত হাটে-বাজারে ঘুরে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং বন্যার্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ, সরকারী-বেসরকারী ত্রাণ বিতরণে সহায়তা করা।

ঊপরি-ঊক্ত কাজ করতে গিয়ে তিন জন স্বেচ্ছাসেবক করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে তারা সুস্থ হয়ে ঊঠেছেন। শুধু তাই নয়, এখন তারা প্লাজমা দেওয়ার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছেন। ঊপরন্ত্ত, তাদের পরিবারের ৬ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন।

জাউয়া বাজার ইঊনিয়নে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন, জহিরুল ইসলাম শাওন। তিনি তার সাম্প্রতিক কাজের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে আমাদের বলেন ‘দুনিয়াতে দৈহিক অর্থে আমরা কেঊ-ই চিরদিন বেঁচে থাকব না। আমরা এই মাটির সন্তান। শতশত বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মাটিতে শুয়ে আছেন। এই মাটির লোকজনই আমাদের আপনজন। এই কঠিন মহামারীকালে এলাকার দলমত শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্যে কাজ করতে পারছি, সেজন্যে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। আমরা সেবা ও ভালবাসা দিয়ে ‘মানব জীবনের মর্যাদা রক্ষায়’ সচেষ্ট আছি। এলাকার মানুষকে করোনার কবল থেকে রক্ষা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব মোরাদ হোসেন সহ এলাকার সবাই আমাদেরকে এ মর্মে সহযোগিতা করেছেন।

স্বেচ্ছাসেবক মোস্তাক আহমদ পীর জানান, ‘এলাকায় করোনা সংক্রান্ত যেকোনও প্রয়োজনে মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অবশ্য এলাকায় করোনা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে একধরনের ভয়ের আবহ তৈরি হয়েছিল। আমরা তখন ভয়কে জয় করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এগিয়ে গেছি। সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় করোনার প্রকোপ মোকাবেলায় সাহস যুগিয়েছি। সংক্রমণ যাতে বৃদ্ধি না পায় সে লক্ষ্যে বিভিন্ন ঊদ্যোগ গ্রহণ করেছি। স্বেচ্ছাসেবক হিশেবে নিজেরা প্রায়শই ডাঃ মোজাহারুল ইসলাম স্যারের নেতৃত্বে রোগীর বাড়িতে গিয়ে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহে অংশগ্রহণ করেছি।’

‘অনেক মানুষ, করোনা আক্রান্ত রোগীকে চরম অবহেলা করে। অহেতুক ভয় পায়। কাছে যেতে চায় না। এত দিন আমরা জানতাম, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। কিন্তু কালকরোনা যেন আমাদের সমাজটাকে রাতারাতি পাল্টে দিয়েছে।এই রোগে শারীরিক যন্ত্রনার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণা কোনো অংশে কম নয়।কারন, শুধু আক্রান্ত ব্যক্তি নন, তার পরিবারের লোকজনও একইরকম যন্ত্রণা ভোগ করেন।আমরা তাদের বাড়িতে ঔষধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পৌছে দেই। তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখি।’

প্রথম থেকেই আমরা স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক, স্বাস্হ্যকর্মী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।আমাদের টিম মেট হলেন ছাতক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: গোলাম কবির মহোদয়। তিনি-ই আমাদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আছেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া, আমাদেরকে সার্বক্ষনিক সহযোগিতা করেছেন ২০ শয্যাবিশিষ্ট কৈতক হাসপাতালের (ছাতকের) আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোজাহারুল ইসলাম স্যার।’