কার পক্ষে আন্দোলন করছে হাটহাজারীর ছাত্ররা?

বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে ৫ দফা দাবিতে উত্তাল দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা।

ছাত্রদের আন্দোলনের ‍মুখে ইতিমধ্যে বুধবার রাতে ৫ দফা থেকে দুই দফা দাবি মেনে নিয়েছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি বাকি ৩ দফা আগামী শনিবার মাদরাসা পরিচালনার শূরা সদস্যদের বৈঠকের পর মেনে নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ছাত্রদের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা আহমদ শফীর পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীকে মাদরাসা থেকে বহিষ্কার করা। এই দাবিসহ দুইটি দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষনা দেন মাদরাসার শুরা সদস্য মাওলানা নোমান ফয়েজি।

তিনি বুধবার রাতে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, আল্লামা শফীর আহ্বানে ও সভাপতিত্বে তার কক্ষে অনুষ্ঠিত এক জরুরী বৈঠকে হাটহাজারী মাদরাসার সহকারী শিক্ষাপরিচালক মাওলানা আনাস মাদানীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জরুরিভিত্তিতে ডাকা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হাটহাজারীর শিক্ষক মাওলানা শেখ আহমদ, মাওলানা আহমদ দিদার, মাওলানা নোমান ফয়েজি, মাওলানা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, মাওলানা ওমর, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী প্রমূখ।

কেন হঠাৎ এই আন্দোলন

হঠাৎ কেন এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে এই বিষয়ে আন্দোলনরতদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া, হাটহাজারী মাদরাসা ও নানা সেক্টরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এই আন্দোলন।

আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া এক ছাত্র নাম না প্রকাশ করার শর্তে ইনসাফের সাথে আলাপকালে বলেন, উম্মুল মাদারিস হাটহাজারী মাদরাসায় দীর্ঘদিন যাবত একটি গ্রুপ অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ মুহতামিমকে সামনে রেখে নানান দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে হাটহাজারী মাদরাসার ইতিহাস ঐতিহ্য ধ্বংসের দারপ্রান্তে চলে এসেছে। বিশেষকরে শিক্ষাব্যবস্থায় এই পরিমান অনিয়ম ইতিপূর্বে কল্পনাও করা যায়নি। শতবর্ষী আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ক্ষমতাকে পূঁজি করে তার ছেলে মাওলানা আনাস মাদানী মাদরাসাতে অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এতে অতিষ্ঠ হয়ে ছাত্ররা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর এসেছে একটি পক্ষের হয়ে আরেকটি পক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দেওয়া এই ছাত্রনেতা বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই আমরা কোন বিশেষ পক্ষের লোক নই, আমরা হাটহাজারী মাদরাসার সাধারণ শিক্ষার্থী। যেভাবে কতিপয় মিডিয়ায় আমাদেরকে একটি পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিশেষকরে আমাদেরকে বলা হচ্ছে আমরা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষ হয়ে আল্লামা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছি, তা সম্পুর্ণ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা প্রচারনা। আমরা কাউকে মুহতামিম বানানোর জন্য আন্দোলন করছি না। আমাদের আন্দোলন হাটহাজারী মাদরাসার শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষা এবং একে অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে মুক্ত করা। আমাদের এখানে কোন পক্ষ বিপক্ষ নেই। হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্ররা আমাদের সাথে রয়েছেন। তাই এই আন্দোলনকে এক পক্ষের বিরুদ্ধে আরেক পক্ষের আন্দোলন বলা অযৌক্তিক ও অপপ্রচার।

তাহলে কেন আপনারা আল্লামা শফি ও তার পুত্রকে মাদরাসা থেকে অব্যাহতির দাবি জানাচ্ছেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আল্লামা শাহ আহমদ শফী আমাদের মাথার মুকুট। তিনি দীর্ঘদিন যাবত হাটহাজারী মাদরাসাসহ সারাদেশের ইসলামপন্থীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে বর্তমানে তিনি বয়োবৃদ্ধ এবং গুরুতর অসুস্থ। এই অবস্থায় তিনি মাদরাসার মুহতামিমের দায়িত্ব পালনে অক্ষম। তার এই অক্ষমতাকে পূঁজিকরে তারপুত্র মাওলানা আনাস মাদানী মাদরাসাতে অনিয়ম দুর্নীতি ও অপশাসনের রাজত্ব কায়েম করেছে। এমতাবস্থায় উম্মুল মাদারিস থেকে আল্লমা আহমদ শফীকে মুহাতামিমের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং মাওলানা আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করা ছাড়া উক্তরণের বিকল্প কোন রাস্তা খোলা নাই।

আল্লামা শফীর পরিবর্তে আপনারা কাকে মুহতামিম করতে চাচ্ছেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে এই ছাত্রনেতা বলেন, মুহতামিম নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব হাটহাজারী মাদরাসার শুরা কর্তৃপক্ষের। আমরা কাউকে মুহতামিম বানানোর জন্যে দাবি জানাচ্ছি না। বিজ্ঞ কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবেন কাকে মুহতামিমের দায়িত্ব দেওয়া যায়। আমরা শূরা কমিটির উপর পুনঃআস্থা রাখতে চাই।

শূরা সদস্যদের মধ্যে কয়েকজনের বিষয়ে আপনাদের তো আপত্তি আছে?

হ্যাঁ। বিতর্কিত আনাস মাদানিকে যেমন আমরা মাদরাসায় দেখতে চাই না তেমনি বিতর্কিত শূরা সদস্যদেরও আমরা কমিটিতে দেখতে চাই না। হাটহাজারী মাদরাসার শূরা কমিটি হতে হবে দেশের সর্বজন স্বীকৃত বিজ্ঞ আলেমদের সমন্বয়ে। ইতিপূর্বে আনাস মাদানী তার বাবা আল্লামা শফীর ক্ষমতাকে পূঁজি করে যেসব লোকদের শূরা সদস্য বানিয়েছে, তাদেরকে শূরা থেকে বের করে দিতে হবে।