পাকিস্তানের জন্য হুমকি হতে রাফালের বহু বছর লাগবে

এটা বেশ স্পষ্ট যে, সু-৩০এমকেআই ও টুইট-ইঞ্জিন মিগ-১৯ ভারতীয় বিমান বাহিনীর (আইএএফ) চাহিদা মেটাতে না পারার কারণেই আধুনিক ও উন্নত মাল্টিরোল ফাইটার রাফাল কেনা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বিভিন্ন মহড়ায় দৃশ্যমান ডগফাইটে রাশিয়ান ফাইটারগুলোর দক্ষতা দেখা গেছে তবে সম্ভবত এগুলোর দুর্বলতা নেটওয়ার্ক ইলেক্ট্রনিক, বিয়ন্ড ভিজুয়াল রেঞ্জ (বিভিআর) যুদ্ধের ক্ষেত্রে। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি এফ-১৬-এর লড়াইয়ে এটা দেখা গেছে। একজোড়া সু৩০ ডেটালিংক স্থাপনা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা পরস্পরকে সহায়তা করতে পারেনি। বহুল আলোচিত এন০১১এম ‘বারস’ এয়ারবোর্ন ইনটারসেপ্টর রাডারের সামর্থ নিয়েও সন্দেহ করা হচ্ছে। কারণ ২৭ ফেব্রুয়ারি পিএএফের দুই ডজন ফাইটার ওড়াওড়ি করলেও টহলরত কোন সু-৩০, একটিও রাডার গাইডেড আর-৭৭ বিভিআর মিসাইল ছুঁড়তে পারেনি। রাশিয়ান বিমানের এসব দুর্বলতা আইএএফ জানে। আর সে কারণেই তারা সেই ২০১২ সাল থেকে সু-৩০ বাদ দিয়ে পশ্চিমা মাল্টি-রোল কমব্যট এয়ারক্রাফট সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

তাদের পছন্দের সঙ্গে রাফাল মিলে যায়। দূরপাল্লা, টিকে থাকা ও ভার বহনের ক্ষমতার ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ইঞ্জিনের এফ-১৬এ ও জেএফ-১৭ রাফালের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। একেকটি রাফালের দাম পড়েছে ১২০ মিলিয়ন ডলার। আর পূর্ণ লজিস্টিক সাপোর্ট ও অস্ত্রসহ এর দাম পড়বে দ্বিগুণ। এক রাফালের দামে পিএএফ চারটি জেএফ-১৭ ব্লক-থ্রি কিনতে পারে। এতে ভারতীয় রাফালের অতিরিক্ত অস্ত্র বহনের ক্ষমতা বাতিল হয়ে যায়। নির্মাতার দাবি অনুযায়ী রাফালের মেটেওর মিসাইলের পাল্লা ১০০+ কিলোমিটার। তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছিলেন, রাফাল থাকলে ২৭ ফেব্রুয়ারি দেখতে হতো না।

তবে মনে হয় মোদিকে তার এয়ার স্টাফরা জেএফের আসন্ন পিএল-১৫ বিভিআর মিসাইল সম্পর্কে ব্রিফ করেনি। এসব মিসাইল নতুন এইএসএ রাডার-গাইডেড। এগুলো রামজেট-চালিত মেটেওরের চেয়ে অনেকদূর যেতে পারে। সে কারণে ২০১৫ সালে ফ্লাইট গ্লোবাল ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাতকারে মার্কিন বিমান বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল হার্বার্ট কার্লিসলে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে চীনের পিএল-১৫ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলকে হারানোর বিষয়টি আমেরিকার অত্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। জঙ্গিবিমানের কাছে পিএল-১৫ ও মেটেওর মিসাইল থাকলে সেগুলো ক্লোজ কমব্যাটে যাওয়ার আগে স্বাভাবিকভাবেই দূর পাল্লার বিভিআর কমব্যাটে লিপ্ত হবে।

এবার আসা যাক রাফাল, এফ-১৬ ও জেএফ-১৫-এর ক্লোজ কমব্যাটের ক্ষমতার কথায়।

তিনটি এয়ারক্রাফটেরই থ্রাস্ট-টু-ওয়েট রেশিও ১:১। এগুলো সমানতালে উপরে ওঠা ও গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু মোড় ঘোরার ক্ষেত্রে অ্যাসপেক্ট রেশিও ও ডানায় অস্ত্রের ওজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার। জেএফ-১৭ ও এফ-১৬এ জঙ্গিবিমানের অ্যাসপেক্ট রেশিও অনেক ভালো, ৩.৭ প্রতিটির। অন্যদিকে রাফালের ২.৬। ভালো অ্যাসপেক্ট রেশিও বিমানের এরোডিনামিক এফিশিয়েন্সি বাড়িয়ে দেয়। ডানায় ভার বহনের ক্ষেত্রে রাফাল কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে। এখানে বিবেচনা করা হয় বিমানের প্রতি ইউনিট এরিয়াকে কতটা ভার বহন করতে হচ্ছে। রাফালের যেখানে ৬৪ পাউন্ড/বর্গফুট, সেখানে জেএফ-১৭ ও এফ-১৬এ-এর ৭৭ পাউন্ড/বর্গফুট। ডানায় ভার কম থাকলে বিমানের মোড় ঘোরার ক্ষমতা বেশি হয়। ফলে অ্যাসপেক্ট রেশিও ও ডানার ভার—এই দুইয়ের বিবেচনায় তিনটি বিমানের ক্ষমতাই প্রায় এক।

ভারতীয় বিমান বাহিনীতে রাফালের অন্তর্ভুক্তি ফলাও করে মিডিয়ায় এমনভাবে দেখানো হচ্ছে যে এখনই ভারত আকাশে রাজত্ব করে বেড়াবে। এটা মনে রাখতে হবে যে পূর্ণ অভিযানিক সামর্থ্য অর্জন করতে রাফালের অন্তত দুই বছর লাগবে।

অন্যদিকে ৩৭ বছর ধরে এফ-১৬ ওড়াচ্ছে পিএএফ। ভারতের বিরুদ্ধে অপারেশন ‘সুইফ রিটর্টে’র মতো উত্তপ্ত পরিবেশেও তাদের বিমান ওড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারা এসব অপারেশনে প্রায় অর্ধ ডজন শত্রু বিমান ঘায়েল করেছে। এক দশকের বেশি সময় আগে জেএফ-১৭ পুরোপুরি অপারেশনাল হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এসব ফাইটার বদলে ফেলা হবে। যুদ্ধে পারদর্শী এসব জঙ্গিবিমান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পুরোপুরি মিশে গেছে। এই দক্ষতা রাতারাতি অর্জন করা যায় না। তাই রাফাল পাকিস্তানের জন্য সত্যিকারের হুমকি হতে অনেক বছর লাগবে।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর ক্ষমতা রাফাল তাৎক্ষণিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে বলে যে কথা বলা হয় ডাহা অতিরঞ্জিত। তবে এটাও পাকিস্তানের হালকাভাবে দেখা উচিত নয়। কারণ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের কথা প্রমাণ করার জন্য পাতানো অভিযান পরিচালনা করতে রাফাল ব্যবহার করতে পারেন।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ও পাকিস্তান পলিটিকো