আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন : তালেবানদের উত্থানের পটভূমি (পর্ব-এক)

শের মুহাম্মাদ


১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর। আফগানিস্তানের রাজধানী শহর কাবুলের রাস্তায় তিনফুট উঁচু বরফ জমেছে। এই গলিত বরফ মাড়িয়ে রাশিয়ার আগ্রাসী ট্যাংকগুলো কাবুলে প্রবেশ করে।

এর ঠিক উনিশ দিন আগে ৫ ডিসেম্বর আফগানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী হাফিজুল্লাহ আমিন রাশিয়ার সাথে একটি মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির অজুহাতেই পরবর্তীতে আফগানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেড়ে রাশিয়া খোদ হাফিজুল্লাহর বিরুদ্ধে দেশটিতে সমরাভিযান পরিচালনা করে। এবং ২৭ ডিসেম্বর রুশ সৈন্যরা স্বঘোষিত নতুন প্রেসিডেন্ট হাফিজউল্লাহ আমিনকে তার বাসভবনে নৃশংসভাবে হত্যা করে। আফগানের রাজনৈতিক ট্রাজেডির যাত্রা বহু আগে শুরু হলেও এখান থেকেই নাটকীয়তার চিত্রে মোড় নেয়। এই নাটকীয়তার  আগে আফগানের অতীত থেকে ঘুরে আসা যাক।

১৯৩৩ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জহির শাহ্। তিনি বাদশাহ নাদির শাহর পুত্র। সে সময়ে তার সরকারের প্রধানমন্ত্রী দাউদ খান (১৯৫৩-১৯৬৩) ছিলেন সম্পর্কে রাজা জহির শাহর কাজিন এবং শ্যালক।

জহির শাহ ছিলেন চিন্তাচেতনায় কমিউনিস্ট। তার রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ১৯৬৫তে কমিউনিস্ট ভাবধারায় গঠিত হয় পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান (PDPA)। আফগানে রাশিয়ার সমর আগ্রাসনের পটভূমি রচনায় এ সংগঠনের স্বার্থপরতার ভূমিকা রয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালীন পিডিপিএর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নুর মুহাম্মাদ তারাকি। আর হাফিজুল্লাহ আমিন এবং তার সরকারের রাশিয়ায় নিযুক্ত আফগানের রাষ্ট্রদূত বারবাক কারমাল ছিলেন এ পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পরবর্তীতে আফগানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই তিন চরিত্রের নাটকীয় ভূমিকা লক্ষণীয়।

প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় ১৯৬৭ সালে পিডিটিএ দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি নুর মুহাম্মাদ তারাকীর নেতৃত্বাধীন খালক পার্টি। এরা ছিল সোভিয়েতপন্থী এবং অধিকাংশ পশতু জনগোষ্ঠীর। অপরটি বারবাক কারমালের নেতৃত্বে পারচাম। পারচামকে আফগান জাতীয়তাবাদী ধারার মনে করা হত।

বারবাক কারমাল ছিলেন কট্টর কমিউনিস্ট ভাবধারার। অনেকেই তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সদস্য সন্দেহ করত। কার্ল মার্কস ও লেনিন- এই দুইজনের নাম মিলিয়ে তাকে কারমাল ডাকা হত।

রাজনৈতিক পেক্ষাপটে আফগানিস্তান অস্থিতিশীল হয়ে উঠে ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই। রাজা জহির শাহ যখন অবকাশ যাপন করছিলেন, সে সুযোগে (পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী) দাউদ খান বিমান বাহিনী ও সেনা বাহিনীর সমর্থন নিয়ে জহির শাহর বিরূদ্ধে অভ্যুত্থান করেন। কয়েক ঘন্টার রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে জহির শাহর পতন হয়। ক্যুয়ের নায়ক দাউদ খান হন স্বঘোষিত নতুন প্রেসিডেন্ট। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত  তার শাসনামলের পুরো সময়জুড়েই তিনি রাশিয়ার বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করেছেন।

দাউদ খান ক্ষমতা দখলের পর রাজতন্ত্র বিলোপ করে দেন। আফগানিস্তানের মতো দ্বিধা বিভক্ত রক্ষণশীল সমাজে রাজতন্ত্র ছিল ঐক্যের প্রতিক। সমালোচকেরা বলেন, এটাকে বিলুপ্ত করে দাউদ খান নিজের সমস্যা আরো বাড়িয়ে তোলেন। তার আমলে দেশটিতে সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টদের প্রভাব বাড়তে থাকে। এদিকে বারবাক কারমালের নেতৃত্বাধীন পারচাম পার্টি দাউদকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছিল। ফলে দাউদ খান পারচামের সদস্যদের অতিরিক্ত সুবিধা-সুযোগ দিতে থাকেন। ফলে সৃষ্টি হয় সোভিয়েতপন্থী খালক পার্টির সাথে সরকারের দূরত্ব।

দাউদ খানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে আফগানিস্তানে রাশিয়ার প্রভাব ক্রমে হ্রাস পাচ্ছিলো। এসব কারণে রাশিয়া তার ব্যাপারে রুষ্ঠ হয়ে ওঠে।  নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবার দাউদ খানকে সড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে তারা। এসময় ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রাশিয়ার সহযোগী হয় খালক পার্টি।

১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল আফগান সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানে দাউদ খান সপরিবারে নিহত হন। এ অভ্যুত্থানে নুর মুহাম্মাদ তারাকী ও হাফিজুল্লাহ আমিনের সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট তথা খালক পার্টির সমর্থন ছিল। দাউদ খানের ‍মৃত্যুর পর দেশটি সর্বতোভাবে রাশিয়ার আধিপত্যে চলে যায়।

আফগানিস্তানে সে সময় তিনটি রাজনৈতিক দল ছিল, যাদেরকে গণনা করা যায়। পিডিপিএর বিভক্ত দুটি শাখা- খালক পার্টি ও পারচাম পার্টি এবং তিন নম্বরে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টির ডীন প্রফেসর বুরহানুদ্দীন রব্বানী, গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ার, আহমাদ শাহ মাসউদ, দীন মুহাম্মাদ, কাজী আমিন প্রমুখের কমিউনিস্ট বিরোধী ইসলামপন্থী ছাত্র আন্দোলন। এ ইসলামপন্থী নেতারা পরবর্তীতে পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিশর প্রভৃতি মার্কিন বলয়ের দেশগুলোর সমর্থন লাভ করে। ইসলামপন্থী ছাত্রজনতা ও সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টদের মধ্যেকার সংঘাত এ সময়ে রক্তক্ষয়ী রূপ ধারন করে।

দাউদ খানের পরে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন নূর মুহাম্মাদ তারাকী। তিনি এতো সোভিয়েতপন্থী ছিলেন যে, দেশটির সামরিক বাহিনীতেও রুশ পরিদর্শক ও উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। নূর মুহাম্মাদের আমলে রাশিয়ার আধিপত্য এতই বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে, কেজিবির সদস্যরা কাবুলের রাস্তায় প্রকাশ্যে ঘোরা ফেরা করত।

এ সময় কাবুলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত অপহৃত হন এবং পরে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার জন্য আমেরিকা কাবুলে অবস্থানরত রাশিয়ার কেজিবি সদস্যদের দায়ী করে। এতে আফগান বিষয়ে সোভিয়েত-মার্কিন বিরোধ আরো তিক্ত হয়ে যায়।

নুর মুহাম্মাদ তারাকী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হাফিজউল্লাহ আমিন ( ২৭ মার্চ ১৯৭৯ – ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৯) ব্যাপারে মস্কো সন্তুষ্ট ছিলো না। তারা প্রেসিডেন্ট নূর মুহাম্মাদ তারাকিকে সংকেত দিচ্ছিলো হাফিজউল্লাহকে বরখাস্তের জন্য। আর গোয়েন্দা মারফত এ ব্যাপারে আগেই জেনে যান হাফিজউল্লাহ নিজে।

এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর,১৯৭৯। রাষ্ট্রপতির বাসভবন আক্রমন করে নুর মুহাম্মাদ তারাকীকে হত্যা করে হাফিজুল্লাহর অনুসারীরা। এরপর আফগানের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও পিডিপিএর সাধারণ সম্পাদকের পদ একায় অধিকার করে নেন তিনি।

নূর মুহাম্মাদ তারাকীর হত্যা রাশিয়া মেনে নিতে পারেনি। এ প্রেক্ষিতে হত্যার তিন মাস পর ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে রাশিয়া। ২৪ ডিসেম্বর কাবুল দখল করে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হাফিজুল্লাহ আমিনকে হত্যা করে রুশ বাহিনী। এবার মস্কোয় নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত বারবাক কারমালকে এনে দেশটির ক্ষমতায় বসিয়ে দেয় তারা।

রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিপুল সংখ্যক আফগান শরণার্থী পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহন করে। ফলে এটা পাকিস্তানের জন্যও মাথা ব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাশিয়ার আতঙ্কে তখন সবার থরো থরো অবস্থা। আফগানের জাতীয় নেতারা কে কিভাবে রাশিয়াকে তুষ্ট করবে সেই ফন্দি ফিকিরে ব্যস্ত।

ওই পরিস্থিতিতে বুরহানুদ্দীন রব্বানী, গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ার, আহমাদ শাহ মাসউদ, দীন মুহাম্মাদ, কাজী আমিন প্রমুখ ইসলামপন্থীরা সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই প্রতিরোধ আন্দোলন পরবর্তীতে কমিউনিস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের সর্বস্তরের জনতার পবিত্র জিহাদে রূপান্তর হয়।

কাবুল দখলে নেয়ার চারদিন পর ২৮ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট লিওনার্দো ব্রেজনেভকে ফোন করেন। তিনি আফগানিস্তান থেকে রাশিয়ান সৈন্য প্রত্যাহার এবং পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া আফগান শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আহবান জানান।

প্রতি উত্তরে ব্রেজনেভ বলেন, “আফগানিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক মৈত্রী চুক্তির আওতায় বিদ্যমান রাজনৈতিক অরাজকতাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে রাশিয়া দেশটিতে প্রবেশ করেছে। সুতরাং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চুক্তির অধীনে দ্বিপাক্ষিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহনের প্রেক্ষিতে তৃতীয় পক্ষের (আমেরিকা) উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।”

এ ধরণের অপমানজনক উত্তর পেয়ে কার্টার খুব বিচলিত হয়ে পড়েন। ফলে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতিরোধে ইসলামপন্থীরা যে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিল, পরবর্তীতে আমেরিকা তার পক্ষে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সময় মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তানসহ মার্কিন ব্লকের অন্যান্য দেশগুলোও স্বাধীনতাকামী আফগান মুজাহিদদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ আফগানীদের প্রতিরোধ থেমে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন থেকে পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব- কেউ রক্ষা পাবে না। নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরেই দেশগুলো আফগান গেরিলা মুজাহিদদের সমর্থন করতে তৎপর হয়ে উঠে। দেওবন্দী ধারার আফগান আলেমদের দশ বছরব্যাপী সোভিয়েত বিরোধী জিহাদ এভাবেই ধারাবাহিক গতি পেয়ে যায়।

 চলবে 

তালেবানদের উত্থানের পটভূমি (পর্ব-দুই)

তালেবানদের উত্থানের পটভূমি (পর্ব-তিন)

Leave a Reply