তালেবানদের উত্থানের পটভূমি (পর্ব-দুই)

শের মুহাম্মাদ


আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসনের পটভূমি কীভাবে তৈরি হয়েছে, প্রথম পর্বে সে ব্যাপারে কিঞ্চিৎ আলোচনা হয়েছিলো। তবে সেখানে কোনো পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণ হাজির করা হয়নি। এই পর্বে তার সুলুক সন্ধানের চেষ্টা করছি।

আফগানিস্তানের ব্যাপারে দুই পরাশক্তির (সোভিয়েত-মার্কিন) মূল শঙ্কা কী ? এটি বড় সওয়াল। পাকিস্তানের মশহুর বুদ্ধিজীবী জাভেদ ইকবাল আফগান থেকে এসে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, “যে অবস্থা দেখে এসেছি, আরো দুই-চারটি মুসলিম দেশে একই অবস্থা হলে সারা দুনিয়া মুসলমানদের হয়ে যাবে।’’  -এ বক্তব্য তিনি যখন দিয়েছেন, তখন তালেবানের শাসন চলছে। এ ছিলো তালেবানের শাসন সম্বন্ধে সেক্যুলার চিন্তার একজন ‘রওশন খেয়াল’ মানুষের উপলব্ধি ।

ইসলাম সম্বন্ধে পশ্চিমা দুনিয়া , সে সাথে প্যাগানদের এমন শঙ্কার কথা বহু আগে  আল্লামা ইকবালও বলেছিলেন, “হো না যায়ে শারয়ে পয়গাম্বার আশ্-কারা কাহেঁ।” অর্থাৎ বিশুদ্ধ পয়গম্বরি মেজাজ পৃথিবীর কোনো স্থানে থিতু হতে দেওয়া চলবে না!

আফগান সম্বন্ধে পশ্চিমাদের শঙ্কার আসল জায়গা এটিই।

আফগানিস্তানের সংস্পর্শে এসে আরেকটি বিষয় সবাই বুঝেছে,  এখানে ইসলামের প্রতি মানুষের প্রবল জযবা, যে জযবা মিটে যাবার মত নয়। পশ্চিমের জন্য এটাও বড় আতঙ্কের কথা। পৃথিবীতে আধিপত্য ধরে রাখতে চাইলে এ জযবাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে!

আফগান প্রসঙ্গে বিখ্যাত মিশরীয় দার্শনিক সাকিব আরসালানের এক মন্তব্য আছে। তিনি বলেছেন , এখানে দুটি পাহাড়সারি আছে। একটি দক্ষিণপূর্ব দিকে চলে যাওয়া হিমালয় পর্বতমালা। অন্যটি হিন্দুকুশের পাহাড়সারি যা দক্ষিণ পশ্চিমের দিকে গেছে। এ দুই পর্বতসারির মাঝে যে ট্রায়াঙ্গেল তৈরী হয়েছে, এ ট্রায়াঙ্গেলে যে জনবসতি বাস করে, যদি সারা দুনিয়াতে ইসলামের স্পন্দন থেমে যায়, তবুও এ জনপদে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হবে না।

ভৌগলিক দিক থেকে খোরাসানের এ অঞ্চলের গুরুত্ব আশা করি সবাই উপলব্ধি করেছেন । ঠিক এ কারণে খোরাসানের জনপদে একটি মজবুত ঘাঁটি গড়ার খাহেশ বিশ্ব শক্তিগুলোর সবসময় ছিলো।

এ খাহেশ থেকেই আগে থেকে লুকিয়ে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র সদস্যরা  ১৯৭৯ সালের ২৭ ডিসেম্বরে আফগান সৈন্যদের ইউনিফর্ম গায়ে দিয়ে দেশটিতে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলো। তারা তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট হাফিজুল্লাহ আমিনকে হত্যা করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই কাবুল রেডিও স্টেশন থেকে একটি সংবাদ প্রচার হতে লাগলোঃ  কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বাবরাক কারমাল নতুন আফগানিস্তানের নেতা হচ্ছেন আর তাকে সহযোগিতা করবে রাশিয়া।

এসময় রাশিয়ার ত্রিশ হাজার সৈন্য আফগানিস্তানে অনুপ্রবেশ করে। প্লান ছিল কয়েক মাসের ভিতর আফগানের নিয়ন্ত্রন নিয়ে তারপর চলে যাবে। কিন্তু সে যাওয়া আর হলোনা।

দীর্ঘ নয় বছর দুই মাস পর সোভিয়েত আর্মির শেষ ডিভিশন যখন আমু দরিয়ার ব্রীজ পার হয়ে রাশিয়ায় ফেরৎ যাচ্ছিলো, ততদিনে বিশ্বের দ্বিতীয় পরাশক্তি আফগানের পাহাড়ে এমনই আঘাত খেয়েছে যে, অন্তিম শয্যায় কাতরাচ্ছিলো।

বহিঃশত্রুর চাপিয়ে দেওয়া সে লড়াই আফগানিস্তানে আজো বন্ধ হয়নি। দীর্ঘ ৪১ বছরের এই লড়াইয়ে লক্ষ লক্ষ আফগানি নিহত হয়েছে। যুদ্ধাহত মানুষের সংখ্যা অগণিত। খরচ হয়েছে কোটি কোটি ডলার। কিন্তু প্রশ্ন হল, এ যুদ্ধের হেতু কী? রাশিয়া কেন আফগানিস্তানে আক্রমণ করলো ? আপাতত সংক্ষেপে এটাই বিশ্লেষণ করা হবে।

এক :
১৯৭৮ সালের এপ্রিলে নুর মুহাম্মাদ তারাকির নেতৃত্বে যে অভ্যুত্থান হয়, যার ফলাফলে সাবেক প্রসিডেন্ট দাউদ খান সপরিবারে নিহত হলেন এবং নূর মুহাম্মাদ তারাকি ক্ষমতা দখল করলেন। আফগানিস্তানে এ অভ্যুত্থান “ছাওর ইনকিলাব” নামে প্রসিদ্ধ। (ছাওর আফগানিস্তানের আঞ্চলিক ক্যালেন্ডারে একটি মাসের নাম।)

ক্ষমতায় আসার পরপরই রাশিয়ার কমিউনিস্টদের আদলে আফগানিস্তানে ব্যাপক পরিবর্তনের কাজ শুরু করেন নূর মুহাম্মাদ তারাকি। কমিউনিস্টদের ধ্যান ধারণা একই সাথে ইসলাম এবং আফগানদের গোত্রীয় রীতি উভয়েরই বিরোধী ছিল। জোর করে কমিউনিজম গেলানোর চেষ্টা তারাকীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

এ অবস্থায় প্রতিটি মসজিদের মিম্বর থেকে রাশিয়ার মদদপুষ্ট তারাকীর সরকারের বিরুদ্ধে আফগান আলেমগণ জিহাদের আহ্বান জানান। ফলে দ্রুতই সারা দেশে সশস্ত্র বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এবং সারা দেশের অধিকাংশ অঞ্চল সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক সোভিয়েতের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এ বিদ্রোহে গোপনে সহযোগিতা করতে থাকেন। কারণ, রাশিয়া হল পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারতের মিত্র। শত্রুর মিত্র শত্রু- এ নীতিতে পাকিস্তান রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

এ সময় গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের হিজবে ইসলামিকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই গোপনে সামরিক সহযোগিতা করতো, এমন অভিযোগ আছে। হেকমতিয়ার জামায়াতে ইসলামির ভাবধারা লালন করতেন। যা হোক,  শেষ পর্যন্ত এ বিদ্রোহ কমিউনিজমের সাথে ইসলামের ঘোরতর লড়াইয়ে পরিণত হয়।

দুই :
রাশিয়ার জন্য দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। কারণ ইসলামপন্থীদের হাতে তারাকীর পতন হলে সোভিয়েত ইউনিয়নের দূর্বলতা প্রকাশ পেত। আফগানে  রাশিয়ার মদদপুষ্ট তারাকি সরকারের পতন হলে ফলত; দক্ষিণ ইয়েমেন, এঙ্গোলা, ইথিওপিয়া ইত্যাদি যে অঞ্চলগুলোয় দূর্বল কমিউনিস্ট ধারার সরকার ছিলো, তাদেরও পতনের আশঙ্কা তৈরী হত।

তিন :
ঠিক এ বৎসর (১৯৭৯) ইরানে শিয়া বিপ্লব সফল হয়। এটি বিশ্বব্যাপী ইসলামী বিপ্লব হিসেবে পরিচিতি পায়। এদিকে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলে উপজাতিদের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক সেখানে ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করবেন বলে ওয়াদা করেন।

এমন পটভূমিতে আফগানিস্তানে ইসলামপন্থীরা সফল হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরী হতো। কারণ, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলকৃত মুসলিম দেশগুলো স্বাধীনতার দাবিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো।

আরেকটি বিষয় হল, মার্কিন বলয়ের দেশগুলো দ্বারা রাশিয়া তার পশ্চিম সীমান্তে বেষ্টিত ছিলো। এদিকে উত্তর সীমান্তেও চীনের সাথে তার ঝামেলা চলে। এমতাবস্থায় আফগানে ইসলামপন্থীদের উত্থানের ফলে মুসলিম অধ্যুষিত দক্ষিণের সীমান্ত দেশগুলোও অরক্ষিত হয়ে পড়ুক, সে পথ যেকোনো প্রকারেই হোক বন্ধ করতে চেয়েছিল রাশিয়া।

চার :
রাশিয়া দুটি কারণে হাফিজুল্লাহকে সড়িয়ে দিতে চাচ্ছিলো। প্রথমতঃ তিনি রাশিয়ার বিশ্বাসভাজন নুর মুহাম্মাদ তারাকিকে হত্যা করেন। দ্বিতীয়তঃ রাশিয়ার বলয় থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য হাফিজুল্লাহ গোপনে আমেরিকার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। আফগানে রাশিয়ার হামলার মাত্র একমাস পূর্বে (১৯৭৯,নভেম্বর) মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্চার ব্লাডের সাথে গোপনে হাফিজুল্লাহ সাক্ষাত করেন।

তিনি বলেন, আফগানিস্তান এখন নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে সাজাতে চায়। তারা রাশিয়ার জোয়াল আর টানতে চান না। আমেরিকায় এক সময় বসবাসের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, “আমেরিকাকে তিনি ভালোবাসেন।”

কেজিবি মারফত হাফিজুল্লাহর এমন তৎপরতা জানার পর আর অপেক্ষা করা সমীচিন মনে করেনি রাশিয়া।

পাঁচ :
তবে আফগানিস্তানে সোভিয়েতের আক্রমণের পিছনে সব থেকে বড় এবং আসল কারণ ছিল তাদের দুনিয়াকে শাসন করার আহ্লাদ। পৃথিবীতে যখনই কোনো মতাদর্শ– শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাশা নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়েছে, তখন ইসলামই তাদের আধিপত্যবাদের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। ইতিহাসের সকল পরতে যখনই কোনো পরাশক্তি মানুষকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অপচেষ্টা করেছে, তাকে সর্বপ্রথম ইসলামের সাথেই লড়াই করতে হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন জানতো তাদের অভিলাস বাস্তবায়ন করতে চাইলে ইসলামের সাথে শক্তি পরীক্ষায় জিততে হবে। সে মানসেই রাশিয়া আফগানে আসে।

আল্লামা ইকবাল ঠিকই বলেছেন, “হো না যায়ে আশ্-কারা শারয়ে পায়গাম্বর কাহিঁ।”
ইসলামের বিশুদ্ধ জযবা কোনো ভূমিতে সতেজ হয়ে ওঠা সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য বরাবরই আতঙ্কের কারণ। এ আতঙ্ক থেকেই পরাশক্তিরা বারবার খোরাসানের ভূমিতে হামলে পড়েছে।

 চলবে 

তালেবানদের উত্থানের পটভূমি (পর্ব-এক)

তালেবানদের উত্থানের পটভূমি (পর্ব-তিন)