বিলে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় অনাবাদী হয়ে আছে প্রায় তিনশ হেক্টর কৃষি জমি। বিলে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে কচুরিপানা আটকে প্রায় চার হাজার কৃষকের জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফরদাবাদ ও রূপসদী ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে থাকা বাড়িয়াদহ বিলটি স্থানীয় ফরদাবাদ-রূপসদী ধীবর সমবায় সমিতির নামে তিন বছরের জন্য ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। সমিতির সদস্য পিছন দাসের নামে নেয়া ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে বিলটি সাব ইজারা দেয়া হয়। তারপর ওই সাব ইজারাদাররা মাছ চাষের জন্য বাঁশ ও জাল দিয়ে বাঁধ দেন বিলে। আর এই বাঁধের কারণে কচুরিপানা আটকে কৃষকদের প্রায় তিনশ হেক্টর ফসলি জমি অনাবাদী হয়ে পড়েছে বলে কৃষকদের অভিযোগ।

মাছ চাষের জন্য অবৈধভাবে বিলের প্রায় চার কিলোমিটার অংশজুড়ে বাঁশ ও জাল দিয়ে বাঁধ দিয়েছেন সাব ইজারাদাররা। এই বাঁধের ভেতরেই মাছ চাষ করা হচ্ছে। বাঁধ দেয়া এলাকার মধ্যেও অনেক কৃষকের জমি রয়েছে।

এছাড়া বাঁধের কারণে বিলের আশপাশের প্রায় তিনশ হেক্টর জমিতে কচুরিপানা ভরে গেছে। এতে করে কৃষকরা তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না। বাঁধ দেয়ার আগে বিলে বিভিন্ন নৌযান চললেও এখন আর কোনো নৌযাচান চলাচল করতে পারছে না। আর সরকারের জাল যার, জলা তার নীতিও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন সুজন জানান, প্রতি হেক্টর জমিতে ছয় মেট্রিক টনেরও বেশি ধান উৎপাদন হয়। সেই হিসেবে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়া তিনশ হেক্টর জমিতে প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।

তিনি বলেন, ‘মাছ চাষের জন্য অবৈধভাবে দেয়া বাঁধের কারণে জমিতে কচুরিপানা আটকে কৃষকের ধানি জমি যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বিলে পানির প্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে। এই জমির ওপর চার হাজার কৃষক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে। সেজন্য দ্রুত বাঁধটি অপসারণ করে জমিগুলোকে চাষের উপযোগী করে তোলা প্রয়োজন।’

ক্ষতিগ্রস্ত আবদুল জলিল জানান, এক কাণি জমি (৩০ শতাংশ) থেকে কচুরিপানা সরাতে প্রায় ৫-৭ হাজার টাকা খরচ লাগে। কিন্তু এই টাকা খরচ করে কচুরিপানা সরানোর সক্ষমতা নেই অধিকাংশ কৃষকের। জমিতে চাষাবাদ না করতে পেরে কোনো কোনো কৃষক বিলে মাছ ধরতে গেলে তাদের বাঁধা দেন ইজারাদাররা।

রূপসদী গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাত্তার মিয়া জানান, বাড়িয়াদহ বিলের পাশে তার আড়াই কাণি কৃষি জমি রয়েছে। প্রতি মৌসুমে এই জমি থেকে প্রায় ৫০ মণের মতো ধান গোলায় তুলেন তিনি। কিন্তু বিলে বাঁধ দেয়ার কারণে তার সব জমি এখন কচুরিপানার নিচে। আর তাই মৌসুমে ধান চাষ করতে পারেননি তিনি। এবারের মৌসুমেও চাষ করা হয়নি।

ফরদাবাদ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মামুন মিয়া বলেন, ‘আমার ১৫ কাণি জমিতে প্রায় ৩০০ মণ ধান উৎপাদন হয়। শুধু বিলের এই বাঁধের কারণে কচুরিপানা আটকে জমি এখন চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যদি বাঁধ না দিতো তাহলে কচুরিপানা আমাদের জমিতে থাকতো না। এখন আমাদের কৃষকদের মরার মতো অবস্থা।’

আরেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল হান্নান জানান, ‘মাছ চাষ করে তারা, আর ক্ষতি হয় আমাদের। তারা আমাদের এই ক্ষতি দেখে না। এই অবৈধ বাঁধের কারণে সব জমিতে কচুরিপানা ভরে গেছে। আমাদের দাবি এই বাঁধ ভেঙে দিয়ে জমিগুলো চাষের উপযোগী করে দেয়া হোক।’

মূল ইজারাদার ও ফরদাবাদ-রূপসদী ধীবর সমবায় সমিতির সদস্য পিছন দাস বলেন, ‘জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা আমরা পরিষ্কার করে দেবো।’

ফরদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম জানান, ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে ধীবর সৎস্যজীবী সমবায় সমিতি স্থানীয় কিছু পেশী শক্তি সম্পন্ন লোকজনের কাছে সাব লিজ দিয়েছে। আর এতেই দেখা দিয়েছে বিপত্তি। তারা কারো কোনো কথা শুনে না। পেশী শক্তির কাছে নিরূপায় প্রান্তিক কৃষকরা। ভয়ে তারা কিছু বলতে পারছেন না। দ্রুত বাঁধটি ভেঙে দেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তিনি।

সাব ইজারাদারদের পেশী শক্তির কাছে নিরুপায় কৃষকরা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। এখন দ্রুতই সাব ইজারারাদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

এ ব্যাপারে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সারোয়ার বলেন, ‘আমরা ইজারা নেয়া মৎস্যজীবী সমিতিকে সময় দিয়েছি, নির্দিষ্ট ওই সময়ের মধ্যে বাঁধটি অপসারণ করার পাশপাশি কৃষি জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কার করার জন্য বলা হয়েছে। যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাঁধটি অপসারণ এবং কচুরিপানা পরিষ্কার না করা হয় তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’