ভেন্টিলেশনে থাকা রোগীকে বের করে দেয়ার অভিযোগ ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের লাইফ সাপোর্ট থেকে এক রোগীকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

তবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেছেন, ‘আমরা কাউকে বের করে দেইনি।’

লাইফ সাপোর্টে থাকা এক রোগীকে স্থানান্তর করতে গিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে অনিয়মের এই অভিযোগ তুলেছেন ডা. খালিদ মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি। তার অভিযোগ, হাসপাতালটিতে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তার মা।

খালিদ মাহমুদ অভিযোগে বলেন, ইউনাইটেড হাসপাতালে তার মা চিকিৎসাধীন থাকার সময় কোভিড-১৯ পজিটিভ হওয়ার কারণে ভেন্টিলেশনে থাকার পরও তাকে বের করে দেওয়া হয়।

কোভিড আক্রান্ত হওয়ার কারণে যখন তাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তখন আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে ডা. খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘ইউনাইটেড হাসপাতালের মতো একটা জায়গায় আম্মাকে ট্রান্সফারের জন্য ভেন্টিলেটরসহ একটা অ্যাম্বুলেন্স পাবো না, সেটা আসলে আমরা মেনে নিতে পারি নাই।’

বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করতে হয়েছে জানিয়ে ওই ভুক্তভোগী বলেন, যে অ্যাম্বুলেন্সটি তারা পেয়েছিলেন সেটিও অজ্ঞান একজন রোগীর, যার ভেন্টিলেটর দরকার, তার জন্য অপ্রতুল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তার মা মেশিনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন উল্লেখ করে ডা. খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘তারা ওইটা খুলে আমাদের কোনো অ্যাম্বুলেন্স দিলো না।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতালের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, ‘রোগীকে ইনকিউবেটেড অবস্থায় বা কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যে লাগানোর গলায় যে টিউব লাগানো হয় সেটিসহ আম্বুব্যাগের সাহায্যে (যে যন্ত্র দিয়ে হাতে পাম্প করে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া যায়) রোগীকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা একটি প্রচলিত ব্যবস্থা।

কোভিডের সংক্রমণ না থাকলেও আইসিইউ বা ভেন্টিলেটরে থাকা রোগীদের এভাবে স্থানান্তর করা হয় বলে জানান হাসপাতালের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান।

এ বিষয়ে বেসরকারি একটি হাসপাতালের মালিক এবং চিকিৎসক ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, লাইফ সাপোর্টে থাকা কোনো রোগীকে স্থানান্তর করতে হলে তাকে অবশ্যই আইসিইউ সুবিধা রয়েছে এমন অ্যাম্বুলেন্স যেখানে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা রয়েছে বা ভেন্টিলেটর বসানো যাবে এমন সুবিধা সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সে করে পরিবহন করতে হবে। কারণ ভেন্টিলেটর খুলে ফেললে রোগী শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবে না।

তবে স্থানান্তরের আগে রোগীর ফুসফুসের অবস্থাটাও ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিতে হবে। ভেন্টিলেটর খুলে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে রোগীকে কতক্ষণ ভেন্টিলেটর ছাড়া রাখা সম্ভব। যদি দেখা যায় যে, আধ ঘণ্টাও রাখা সম্ভব তবে সে সময়টাকেই কাজে লাগাতে হবে’ যোগ করেন ডা. লেনিন চৌধুরী।

নিজের মাকে স্থানান্তর এবং মৃত্যু নিয়ে ডা খালিদ মাহমুদ ও তার ভাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছেন। যেখানে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়া জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, তারা ফেসবুকের পোস্ট দেখেছেন কিন্তু এ বিষয়ে রোগীর পক্ষের কেউ হাসপাতালে কোনো ধরনের অভিযোগ করেনি। তাহলে হয়তো হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাদেরকে বুঝিয়ে বলা হতো।

ডা. খালিদ মাহমুদ জানান, গত ৪ এপ্রিল তার মাকে গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়। এরপর জ্বর, কাশি ও গলাব্যথা দেখা দিলে বাড়িতেই তার চিকিৎসা করানো হয়। তিনিসহ তাদের পরিবারের তিনজন চিকিৎসক উপস্থিত থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেন তারা।

কিন্তু কয়েকদিন পর অবস্থা আরও খারাপ হলে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হলে উত্তরার একটি হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে গেলেও করোনাভাইরাসের পরীক্ষা না করানোর কারণে ভর্তি নেওয়া হয় না। পরে গত ১১ এপ্রিল কোভিড চিকিৎসা দেওয়া হয় এমন একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

সেদিনই নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর এর প্রতিনিধিদল। পরের দিন পরীক্ষার ফলে জানানো হয় যে তার মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নেই। এই ফল পাওয়ার পর ১২ এপ্রিল রাতে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সার্টিফিকেট দেখিয়ে ভর্তি করানো হয়। পরে তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়।

কিন্তু এর একদিন পর অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে জানানো হয় যে, তার মায়ের মধ্যে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রয়েছে এবং তাকে বিল পরিশোধ করে নিয়ে যেতে বলা হয়। হাসপাতালের পক্ষ থেকে আইইডিসিআর এর মাধ্যমে ওই পরীক্ষা করানোর কথা জানানো হয়।

হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের বিষয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, রোগীকে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা দেয় এমন হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেই। কারণ ইউনাইটেড হাসপাতালে কোভিড রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয় না। আর তাই অন্যান্য রোগীদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ফট করে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস খুলে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমরা কিন্তু ওভাবে দেইনি। আমরা নিয়ম মেনেই করেছি।’রোগীকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেই এলাকা জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, একই ব্যক্তি যার মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের রয়েছে, ২-৩ দিনের ব্যবধানে তার পরীক্ষা করানো হলে একবার নেগেটিভ এবং একবার পজেটিভ আসতে পারে কিনা এমন প্রশ্নে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর বলেন, এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

তিনি বলেন, পরীক্ষায় পজিটিভ বা নেগেটিভ আসার বিষয়টা নির্ভর করে ওই ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহের সময় তার শরীরে কি পরিমাণ করোনাভাইরাস রয়েছে তার ওপর। সে ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, প্রথমবার নমুনা সংগ্রহের সময় তার শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি কম থাকলে নেগেটিভ আসতে পারে। আর পরেরবার ভাইরাসের সংখ্যা বেশি থাকলে পজিটিভ আসতে পারে।

এ ছাড়া যারা নমুনা সংগ্রহ করছেন তাদের প্রশিক্ষণ, নমুনা সংরক্ষণের উপায়, ব্যবস্থা এবং ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদের দক্ষতার ওপরও বিষয়টি নির্ভর করতে পারে বলে জানান আইইডিসিআরের এই কর্মকর্তা।

ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার জানান, তাদের হাসপাতাল সেন্ট্রাল এসি বা কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে ৮০ ভাগ বায়ু হাসপাতালের মধ্যেই রিসার্কুলেটর হয়। যার কারণে কোনো কোভিড রোগী থাকলে বাকি রোগীদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

নিজেদের উদ্যোগেই তারা ওই রোগীর কোভিড পরীক্ষার পর পজিটিভ পাওয়ার পরেই তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান ডা. সাগুফা আনোয়ার।

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলমগীর বলেন, যদিও করোনাভাইরাস হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, তবে সেন্ট্রাল এসি বা কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো ভবনে একই বাতাস রিসার্কুলেট করা হলে তার মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি একটি রেস্তোরায় সেন্ট্রাল এসি থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার অভাব বলে অভিযোগ তোলেন ডা খালিদ মাহমুদ।

তিনি বলেন, ইউনাইটেড হসপিটাল যদি একটু মানবিকতার কথা চিন্তা করে, রোগীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে একটু ভেন্টিলেটর দিতো বা অন্য কোথাও থেকে জোগাড় করে দিতো। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাপনার মধ্যে না গিয়ে একটা রোগীর ভেন্টিলেশন খুলে ছেড়ে দেওয়া, গেট থেকে বিদায় দিয়ে দেওয়া, এটা জাতিগতভাবে লজ্জার ব্যাপার।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. এনামুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার হয়েছে।

নিয়মানুযায়ী করোনাভাইরাস আক্রান্ত হলে তাকে করোনা হাসপাতালে শিফট করতে হবে। না হলে তার মাধ্যমে অন্য রোগীদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান ডা. এনামুর রহমান।