Breaking News

ফতোয়া রক্ষার ঈমানী দাবিতে উলামায়ে কেরামের ঐতিহাসিক আন্দোলন

মাওলানা এহসানুল হক | শিক্ষক : জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া


২০০১ এর ২রা ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ। সেই মহাসমাবেশে আমারও শরিক থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। বড় ভাই আমাকেও নিয়ে গেছিলেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের প্রায় সকলেই ছিলেন এক মঞ্চে। প্রধান অতিথি ছিলেন শাইখুল হাদীস রহ. আর সভাপতিত্ব করছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.। মঞ্চের কাছেকাছি মাটিতে বিছানো চাটাই এর উপর বসে ছিলাম। বিমুগ্ধ নয়নে দেখছিলাম বাংলার সিংহ পুরুষদের হুংকার। শ্লোগানে শ্লোগানে কেঁপে উঠছিল চারদিক।

মহাসমাবেশ থেকে ৩রা ফেব্রুয়ারি হরতাল ঘোষণা করা হয়েছিল। আমরা তখন অনেক ছোট। সবে মাত্র কিতাব বিভাগে ভর্তি হয়েছি। পরের দিন শনিবার সকালে মাদরাসায় যেতে হবে। আবু সাঈদ নামে রাহমানিয়ার আরেকটা ছাত্র আমাদেরই এলাকায় থাকতো। পরদিন সকালে আমরা দুজন রওনা হলাম। বাসা থেকে বের হয়ে দেখি রাস্তা পুরা ফাঁকা। মানুষজন নাই। রিকশাও নাই। হাঁটতে হাঁটতে ছাপড়া মসজিদ পযর্ন্ত গিয়ে দেখি হরতালের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। খুশিই লাগলো। আমরা দুইজন মিছিলের পিছনে পিছনে হাঁটছি।

আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখি তুলকালাম কাÐ। চর্তুদিকে পুলিশ আর পুলিশ। আমরা দুইজন আর মিছিলের পিছনে না গিয়ে যানবাহনের অপেক্ষায় বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালাম। মিছিলটি এগিয়ে গেল ইডেন কলেজের দিকে। কিছুদূর যেতেই বিনা উস্কানিতে শুরু হলো পুলিশের লাঠিচার্জ। এক একজন ছাত্রকে চারজন পুলিশ মিলে পেটাচ্ছিল। তখন কী করবো বুঝে পাচ্ছি না। পুলিশ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো একজন দাঁড়ি টুপিওয়ালা পেয়ে তাকেও পেটানো শুরু করলো। আমি দেখলাম এরপরই আমার পালা। দ্রæত পিছু হটতে লাগলাম।

ভয়ে আতংকে আমরা বাসায় ফিরে এলেও অন্যসব দিনের মত শাইখুল হাদীস রহ. রওনা হলেন মুহাম্মদপুরের দিকে। এই হরতালের মধ্যেও তিনি বুখারির দরস দেবেন। বের হয়ে দেখেন রাস্তায় কোন যানবাহন নেই। সাথে ছিলেন মাহফুজ মামা। শায়েখ বললেন, ‘গাড়ি তো চলে না। চল আজিমপুর থেকে সাইন্সল্যাবরেটরি, সেখান থেকে মুহাম্মাদপুর, এভাবে ভেঙে ভেঙে রিকশায় করে যাই।’ এভাবেই মাদরাসায় পৌঁছলেন। মাদরাসা বলতে তখন শায়েখ রাহমানিয়ার বাইরে। নূর মসজিদে বুখারি শরিফের সবক পড়ালেন।

মুহাম্মাদপুর শিয়া মসজিদ এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল শুরু হলো। শাইখুল হাদীস রহ. তখনও কিছু ছাত্রসহ মসজিদে বসে আছেন। অল্প কিছুক্ষণ মিছিল চলার পরেই বেধে গেলো গণ্ডগোল, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, এরপর শুরু হলো পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের সাথে মাদরাসা ছাত্রদের তুমুল সংঘর্ষ। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ বুট জুতা নিয়েই মসজিদের ভিতরে ঢুকে পড়লো। কাঁদানে গ্যাসের ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে গেল নূর মসজিদ। মসজিদের এক কোণে তখনও হজরত শাইখুল হাদীস রহ. বসে আছেন।

মুহাম্মাদপুরের এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সংবাদ বাসায় এলো। মসজিদে কারো কাছে মোবাইল না থাকায় যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। তাই মসজিদের ভিতরের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। যে কোন মুহুূর্তে গ্রেফতার হবেন শায়েখ এমন শংকায় সবাই অস্থির। এমন পরিস্থিতিতেও ছাত্ররা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে প্রাণের চেয়ে প্রিয় উস্তাদ হজরত শায়েখকে নিরাপদে মসজিদ থেকে বের করার ব্যবস্থা করলেন।

এরপরের ইতিহাস সবার জানা। পুলিশ হত্যা মামলা দায়ের করল। সাজানো মামলায় এক নম্বর আসামি করা হলো আশি বছরের অশতিপর বৃদ্ধ শাইখুল হাদীস রহ. কে। সারাদেশের আলেম উলামাদের বিরুদ্ধে শুরু হলো চিরুনি অভিযান। এরই মধ্যে গ্রেফতার হলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.। পরদিন ৪ ফেব্রুয়ারি রংপুরে চারদলীয় জোটের মহাসমাবেশ। থেকে আসার পথে শাইখুল হাদীসকে গ্রেফতার করেন।

শাইখুল হাদীস ও মুফতি আমিনী গ্রেফতারের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠলো ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ। সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হলো বিবাড়িয়ায়। তাউহীদি জনতা সারা জেলায় অবরোধ সৃষ্টি করে ফেললো। উপরে ফেললো রেল লাইন। শুরু হলো পুলিশ, বি.ডি.আর এর সাথে ভয়াবহ সংঘর্ষ। সংঘর্ষের এক পযার্য়ে বিডিয়ারের গুলিতে শাহাদাত বরণ করলেন তাজুল, সাইফুলসহ ছয়জন।

তখন উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আগ্রাসী ভূমিকায় ছিলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিম। তার সেই ভূমিকার সামনে স্বাস্থমন্ত্রী হিসেবে তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ আছে সেগুলো কিছুই না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই পদটাকে তিনি বির্তকিত করে ফেলেছিলেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। রাজনীতির ময়দানে, আন্দোলন সংগ্রামে যে কারণেই হোক তাকে যখন হারানো যায়নি তখন করোনা ভাইরাসে মৃত্যু বরণের পর এভাবে আনন্দ প্রকাশ আমার কাছে অর্থহীন। রাজনীতির ময়দানে তাকে হারাতে পারলেই বেশি খুশি হতাম। তবে হ্যা, কর্মজীবনে যত পাপ সে করে গেছে তার ফল এখন সে নিশ্চয়ই ভোগ করবে। রাতের ম্যাকানিজম বা কোন ইঞ্জিনিয়ারিং সেখানে চলবে না। সেই বিচারের ভার আল্লাহর হাতে। তিনিই উত্তম বিচার করবেন।

সোনালী অতীতের গল্প-৩

About |

Check Also

মুসলমানদের দেশে ইসলাম বিদ্বেষী কথা বলার দুঃসাহস দেখাবেন না: ভিপি নুর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, এমনকি গণমাধ্যমেও বোরকা-হিজাব-নিকাব পরিহিত মা ও পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত ছেলের ক্রিকেট খেলার একটি …